রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে ট্যানারি স্থানান্তরে দৃশ্যমান ফল দেখা যাচ্ছে। প্লট বরাদ্দ পাওয়া ১৫৪টি ট্যানারির মধ্যে সেখানে কাজ শুরু করেছে সাত থেকে আটটি ট্যানারি। কোরবানির ঈদের আগে ৩০টি কারখানা সাভারে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ শুরু করার কথা জানিয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ বিসিক। সাভারে মালিকপক্ষের অবকাঠামো তৈরির কাজেও গতি এসেছে। ঈদের আগেই সবগুলো ট্যানারি সাভারে স্থানান্তরে এর আগে মালিকপক্ষ অঙ্গীকার করেছিলেন। এ নিয়ে মন্ত্রণালয়ের নানামুখী চেষ্টা সত্ত্বেও কাজ হয়নি। এখন আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত ট্যানারি সরাতে সময় বাড়ানোর জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করা হয়েছে। অবশ্য সেখানে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারসহ (সিইটিবি) কিছু কাজও সঠিক সময়ে শেষ করতে পারেনি প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ।
ট্যানারি মালিকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, হাজারীবাগ থেকে সবগুলো ট্যানারি সরাতে আরো অন্তত এক বছর সময় লেগে যেতে পারে। এদিকে সাভারে কার্যক্রম শুরু করা ট্যানারি মালিকরা সেখানে কঠিন বর্জ্য ফেলার জন্য ডাম্পিং ইয়ার্ড তৈরি না হওয়াসহ বেশকিছু সমস্যা মোকাবেলা করছেন। যদিও চামড়া শিল্প প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ বলছে, এগুলো বড় সমস্যা নয়। অচিরেই এসব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
ট্যানারি মালিকদের দুটি সংগঠন সবগুলো ট্যানারি স্থানান্তরে ফের সময় চেয়েছে। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়াতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ ফিনিশ্ড লেদার, লেদার গুড্স এন্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএলএলএফইএ)। এর মধ্যে ব্যাংক ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ, বিদ্যমান ব্যাংক ঋণের সুদের হার তিন বছরের জন্য মওকুফ করা, আগামী সাত বছরের জন্য ট্যানারিগুলোকে কর অবকাশ সুবিধা দেয়া, ট্যানারি এলাকায় গ্যাস-বিদ্যুত্ ও পানির সুবিধা নিশ্চিত করার দাবিও রয়েছে।
যদিও বিএফএলএলএফইএ’র সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী আবু তাহের ইত্তেফাককে বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যেও স্থানান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যাবে না। এটি বিশাল বিনিয়োগের বিষয়। মোট সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রয়োজন। ইতিমধ্যে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়ে গেছে। মেশিনারির জন্য ২ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। সারা দুনিয়ায় এত ট্যানারি একস্থানে স্থানান্তর হওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম।
ঈদে হাজারীবাগে চামড়া ঢুকতে না দেয়ার সিদ্ধান্ত রয়েছে মন্ত্রণালয়ের। এ প্রসঙ্গে আবু তাহের বলেন, এ বছর এ সুযোগ দিতে হবে। নইলে এ খাতের জন্য বিপদ হয়ে যাবে। তিনি বলেন, এসব ইস্যুতে কথা বলার জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চাই।
তবে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি না সরানোর জন্য মূলত মালিকপক্ষ দায়ী বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা। পরিবেশের ক্ষতি করায় তাদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করার দাবিও করেছেন তারা। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান ইত্তেফাককে বলেন, ঈদের আগে ট্যানারি সরাতে মালিকপক্ষই সময় চেয়েছে। অথচ এখন পর্যন্ত মাত্র ৬টি সেখানে গেছে। যে কোনোভাবে হাজারীবাগে ঈদে চামড়া তারা রাখবেই। এতে জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি হচ্ছে।
সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরের লক্ষ্যে মালিকপক্ষের সঙ্গে এ পর্যন্ত শিল্প মন্ত্রণালয়ের কয়েক ডজন বার বৈঠক হয়েছে। ট্যানারি স্থানান্তরে এ পর্যন্ত তাদের ২৯ দফা সময়ও দেয়া হয়েছে। সর্বশেষ গত মার্চে ট্যানারি সরাতে ৩১ মার্চ পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয় মন্ত্রণালয়। হাজারীবাগে চামড়ার প্রবেশ ঠেকাতে পুলিশি প্রহরাও বসানো হয়। হুমকি দেয়া হয় বিদ্যুত্ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার। পরবর্তীতে ট্যানারি মালিকদের সঙ্গে এক বৈঠকে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি ছাড়ার প্রক্রিয়া শেষ করতে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয় মন্ত্রণালয়। সেই সময়ও পেরিয়ে গেছে বহু আগে। সর্বশেষ গত জুলাইয়ে সুপ্রিম কোর্ট হাজারীবাগ ছাড়তে ব্যর্থ ট্যানারিগুলোকে প্রতিদিন ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা প্রদানের নির্দেশ দেয়। ট্যানারি ছাড়তে ব্যর্থ মালিকরা বর্তমানে জরিমানা গুণছেন। এরপর থেকেই মূলত সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরে তোড়জোড় শুরু হয়েছে মালিকপক্ষের।
সরেজমিন সাভারের চামড়া শিল্পনগরী
ধলেশ্বরীর তীর ঘেঁষে গড়ে উঠা সাভারের হেমায়েতপুরে অবস্থিত চামড়া শিল্পনগরী সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, সেখানে চামড়া প্রক্রিয়াকরণের মত প্রাথমিক অবকাঠামো তৈরি করে ৮টি প্রতিষ্ঠান চামড়ার প্রাথমিক প্রক্রিয়াকরণের (ব্লু ওয়েস্ট) কাজ শুরু করেছে। রিলায়েন্স ট্যানারি, মারসন্স, প্রিন্স, অ্যাপেক্স, আজমির, মদিনা, আজমিরসহ আরো দুই-একটি ট্যানারি রয়েছে এ তালিকায়। এসব ট্যানারি সেখানে প্রাথমিক প্রক্রিয়াকরণের কাজ শেষে ক্রাশিং ও ফিনিশিংসহ বাকী কিছু কাজ হাজারীবাগে নিয়ে করতে হচ্ছে। আরো কিছু ট্যানারি ঈদ কেন্দ্রিক কার্যক্রম শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বাদবাকী ট্যানারিগুলোর অবকাঠামো তৈরির কাজ চলছে। এর মধ্যে কিছু ট্যানারি ৫-৬ তলাবিশিষ্ট অবকাঠামো তৈরিও করেছে। আবার কয়েকটি ট্যানারির অবকাঠামো তৈরির কাজ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে।
সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরকারী মালিকদের বেশ কিছু অভিযোগ রয়েছে। তারা বলেছেন, চামড়ার কঠিন বর্জ্য (সলিড ওয়েস্ট) প্রক্রিয়াকরণের জন্য এখনো সেখানে ডাম্পিং ইয়ার্ড তৈরি হয়নি। আগামী দুই কিংবা তিন মাসের মধ্যে সেটি হওয়ার নিশ্চয়তাও দিতে পারছে না প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ বিসিক। সেখানে স্থানান্তর হওয়া কারখানাগুলো পুরোদমে চামড়া প্রক্রিয়াকরণ শুরু করলে শিল্প এলাকার রাস্তাঘাট বর্জ্যে ভরে যেতে পারে। ট্যানারির কর্মীদের মতে, এ অবস্থা চলতে থাকলে সাভারেও ফের হাজারীবাগের মত পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
চামড়া শিল্পনগরী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, যারা ইতিমধ্যে সেখানে প্রক্রিয়াকরণের কাজ শুরু করেছেন, তারা এই বর্জ্য নিয়ে পড়েছেন মহাবিপদে। কিছু ট্যানারির ভেতরেই দিনের পর দিন এ বর্জ্য রাখতে হচ্ছে। আবার কেউ কেউ ট্যানারি এলাকার ভেতরেই এক পাশে খোলা জায়গায় এ বর্জ্য ফেলছেন। ফলে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো এলাকায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে আপাতত এ বর্জ্য সাভারে বলিয়ারপুরে ফেলার চিন্তা করা হচ্ছে বলে ইত্তেফাককে জানিয়েছেন চামড়া শিল্পনগরীর প্রকল্প পরিচালক আব্দুল কাইয়ুম। তিনি বলেন, স্থায়ী ডাম্পিং ইয়ার্ড তৈরির কার্যাদেশের অনুমোদন পাওয়া গেলে এক মাসের মধ্যে কাজ শুরু করা যাবে।
প্রকল্প এলাকা ঘুরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ক্ষতিকর রাসায়নিক ক্রোমিয়ামযুক্ত বর্জ্য পরিশোধনের যন্ত্রপাতি এখনো বসানো হয়নি। দুই ইঞ্চি ব্যসার্ধের পানির লাইন কারখানাগুলো পুরোদমে চালু হলে পর্যাপ্ত পানি দিতে পারবে না বলে আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা। রিলায়েন্স ট্যানারির মালিক ইসমাইল হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, দুই ইঞ্চি ব্যাসের পাইপের পানি দিয়ে ট্যানারির জন্য প্রয়োজনীয় পানি পাওয়া সম্ভব নয়। একটি ট্যানারিও এতে চলবে না। চার-পাঁচ ইঞ্চি না হলে উত্পাদনে সমস্যা হবে। তিনি জানান, এখনো গ্যাস সংযোগ পাওয়া যায়নি। এজন্য প্রাথমিক প্রক্রিয়াকরণের পরবর্তী ধাপ অর্থাত্ ক্রাশ্ড ও ফিনিশিং হাজারীবাগে নিয়ে করতে হচ্ছে।
প্রকল্প এলাকায় দায়িত্বরত বিসিকের উপ-ব্যবস্থাপক মুহাম্মদ মোস্তফা মজুমদার বলেন, সিইটিপিতে প্রাথমিক কিছু সমস্যা হলেও দ্রুত এটি ঠিক হয়ে যাবে। সিইটিপিকে পুরো মাত্রায় কার্যকর করতে যন্ত্রপাতি আনার জন্য একটি দল বর্তমানে চীনে রয়েছেন।
আর প্রকল্প পরিচালক আব্দুল কাইয়ুম বলেন, সিইটিপির দুটি মডিউল চালু করতে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ১২ হাজার ঘটফুট তরল বর্জ্য প্রয়োজন হবে। এ জন্য কমপক্ষে ৪৮টি ট্যানারিতে চামড়া প্রক্রিয়াকরণ করতে হবে।
ইত্তেফাক/এএন