রফতানি পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণে প্রয়োজন জোরালো উদ্যোগ

 
গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রফতানি আয়ের ৩৪ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারের ২৮ বিলিয়ন অর্থাত্ প্রায় ৮৩ শতাংশই অর্জন তৈরি পোশাক শিল্প খাত থেকে এসেছে। বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অর্থাত্ ১৯৭৩-৭৮ সময়কালে জিডিপিতে রফতানি আয়ের অবদান ছিল গড়ে ৬ শতাংশের কাছাকাছি। এর মধ্যে শুধু কাঁচা পাট ও পাটজাত দ্রব্যের অবদান ছিল যথাক্রমে ৩২ ও ৫৪ শতাংশ, যা একত্রে ৮৬ শতাংশ। বাংলাদেশের রপ্তানি তালিকায় তখন তৈরি পোশাক অন্তর্ভুক্ত হয়নি। আশির দশকের শুরুতে রফতানিতে পোশাক শিল্প যুক্ত হয় এবং দিনে দিনে পোশাক শিল্প খাতের অবদান ও গুরুত্ব বাড়তে থাকে। ১৯৯০ সালেই রফতানিতে পোশাক শিল্পের অবদান ৫০ শতাংশ অতিক্রম করে এবং পাট খাতের অবদান ২২ শতাংশে নেমে আসে। গত এক দশক ধরে রফতানি খাতে তৈরি পোশাক খাতের অংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৫ শতাংশ এবং গত ৫ বছরে ৮০ শতাংশের ঊর্ধ্বে গিয়ে পৌঁছেছে তা। বর্তমানে পোশাক রফতানি সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে অনুন্নত বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই রফতানির তালিকায় প্রাথমিক পণ্যের বিপরীতে বাংলাদেশের রফতানি শিল্প পণ্যভিত্তিক। সত্তর দশকের রফতানি বাণিজ্যের সঙ্গে বর্তমানের রফতানির একটি জায়গায় মিল আছে তাহলো, তখনও একটি মাত্র পণ্য পাট ও  পাটজাত দ্রব্য রফতানির সিংহভাগ জোগান দিত এবং আজও শুধু তৈরি পোশাক খাত থেকেই রফতানির সিংহভাগ আয় হচ্ছে। পার্থক্য হলো, তখন রফতানি পণ্যের (পাটজাত দ্রব্যের) মূল্য সংযোজন ছিল প্রায় ৮৫ শতাংশ। অথচ আজ পোশাকের ওভেন ও নিটিংয়ের গড়ে ৫০ থেকে ৫৪ শতাংশ তাছাড়া সত্তর দশকে মোট রপ্তানির প্রায় ৪০ শতাংশই আসত কাঁচামাল থেকে, বিশেষ করে কাঁচা পাট থেকে। বর্তমানে প্রাথমিক পণ্য বা কাঁচামাল রফতানি থেকে আয় ৫ শতাংশেরও নিচে।
 
আমাদের রফতানি বাণিজ্যের সীমাবদ্ধতা প্রধানত দুটি। এর মধ্যে একটি হলো, এক পণ্য অর্থাত্ তৈরি পোশাক নির্ভরতা অন্যটি হলো, মাত্র কয়েকটি বাজারে কেন্দ্রীভূত। রফতানির প্রায় ৫৫ শতাংশ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ২৫ শতাংশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারকেন্দ্রিক। যদিও গত এক দশকে অপ্রচলিত বাজারে রফতানি বাড়ছে, এখনও এ খাতের অংশ ১৫ শতাংশের নিচে। তারপরও অপ্রচলিত বাজারে অর্থাত্ ইইউ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের রফতানি বৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক। তবে বাজার বহুমুখিকরণে কিছু অগ্রগতি ঘটলেও পণ্য বহুমুখিকরণে কোনো অগ্রগতি নেই। গত কয়েক বছরে একমাত্র পোশাক ছাড়া প্রচলিত গুরুত্বপূর্ণ পণ্য যেমন পাট, চামড়া, হিমায়িত খাদ্য, হোম টেক্সটাইল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। গার্মেন্টস শিল্পের বিকাশের গত দুই তিন দশকে দেশের ঐতিহ্যবাহী অনেক শিল্প ধ্বংস হয়ে গেছে। দেশের কাঁচামালভিত্তিক এ সব পণ্যের মূল্য সংযোজন ছিল অনেক বেশি। বন্ধ হয়ে যাওয়া এসব কারখানার অধিকাংশই সরকারি এবং বৃহত্ শিল্পের অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে পাটশিল্প অন্যতম। বিশ্বে পরিবেশ সচেতনতার কারণে পাটের ব্যবহার বেড়েছে এবং পাটজাত পণ্যের বিরাট চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে বিশ্ববাজারে। বর্তমানে বাংলাদেশে আবার বন্ধ হয়ে যাওয়া পাটকলগুলো চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত প্রায় তিন দশকে পোশাক শিল্পের দ্রুত বিকাশ সত্ত্বেও ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পে শ্রমিকের অংশ এবং জিডিপিতে শিল্পের অবদান তেমন বাড়েনি। কেন না বন্ধ হয়ে যাওয়া অধিকাংশ শিল্পই শ্রমঘন এবং দেশি কাঁচামাল ভিত্তিক হওয়ার কারণে মূল্য সংযোজন ছিল বেশি।
 
দেশকে অর্থনৈতিকভাবে আরো সমৃদ্ধ এবং শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে রফতানি আয় বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু আমাদের রফতানি পণ্য কিছু আইটেমে সীমাবদ্ধ বয়ে গেছে এখনও। আর রফতানি বাজারও বিস্তৃত হচ্ছে না। একটা নির্ধারিত গণ্ডিতে আটকে আছে। সম্প্রতি রফতানি বাণিজ্য বিকাশের লক্ষ্যে নানামুখি কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের প্রতি জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি রফতানির নতুন বাজার খুঁজতে তাগিদ দিয়েছেন। তার এই আহ্বান যথার্থ। সীমিত পণ্যের ওপর দেশের রফতানি খাত নির্ভরশীল হওয়ায় আমাদের রফতানি আয় এর প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশা অনুযায়ী হচ্ছে না। ওদিকে আমাদের রফতানি বাজারও আগের চেয়ে খুব বেশি বিস্তৃত হতে পারেনি। রফতানির ক্ষেত্রে পণ্যের বহুমুখিকরণের বিষয়টি যেমন জরুরি তেমনি নতুন বাজারের সন্ধানও সমানভাবে জরুরি। আমাদের রফতানি তালিকায় নতুন-নতুন পণ্য সংযোজন করার যেমন সুযোগ ও চাহিদা রয়েছে তেমনিভাবে সে সবের বাজার প্রসারিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দিতে হবে। কোন্ দেশে কোন্ পণ্যের চাহিদা রয়েছে সে সব সন্ধান করা দরকার। আমাদের অনেক কৃষিপণ্যের বিশ্ববাজারে বিপুল চাহিদা রয়েছে। সে সব পণ্যের সনাক্তকরণের মাধ্যমে এর উত্পাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি রফতানির ক্ষেত্র বিস্তৃত করতে রফতানিকারক, ব্যবসায়ীদের দূরদর্শী কর্মতত্পরতা চালাতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের প্রণোদনাসহ অন্যান্য সহযোগিতা প্রদান করা প্রয়োজন। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার মানেই দেশের সমৃদ্ধি আর রফতানি বৃদ্ধি মানে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাওয়া। সময়ের সাথে সাথে ব্যবসা বাণিজ্যের ধরনও পাল্টে যাচ্ছে অনেক। রফতানি পণ্যের তালিকায় যে সব নতুন পণ্য যুক্ত হচ্ছে সে সব পণ্যের অবদান কীভাবে রফতানি বাণিজ্যে ব্যাপক করে তোলা যায় তেমন কার্যকর প্রচেষ্টা চালাতে হবে। অধিক মূল্য সংযোজিত পণ্য উত্পাদন ও দেশজ কাঁচামাল নির্ভর রফতানি পণ্য উত্পাদনে উদ্যোক্তাদের আরো বেশি মনোযোগী হতে হবে।
 
সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ কয়েকটি দেশে পণ্য রফতানি শুরু হলেও তা এখনও নগণ্য। রাশিয়া, লাতিন আমেরিকাসহ কয়েকটি দেশে বাংলাদেশি পণ্য রফতানির সম্ভাবনার কথা শোনা গেলেও উদ্যোগের ঘাটতির কারণে সেখান থেকে আশানুরূপ সাফল্য আসছে না। বর্তমান প্রেক্ষাপটে রফতানি পণ্যের বহমুখিকরণ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। কারণ পণ্যের বহুমুখিকরণ ছাড়া বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। বিশ্বের উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলো তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। এ অবস্থায় বিশ্ববাজারে চাহিদা সৃষ্টি ও অবস্থান সুসংহত করার  জন্য রফতানি পণ্যের বহুমুখিকরণের কোনো বিকল্প নেই। আর বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্যের প্রধান সমস্যা হলো, মাত্র চার-পাঁচটি পণ্য মোট রফতানির ৯০ শতাংশ অধিকার করে আছে। অন্যদিকে রফতানি বাজারও সংকুচিত। মাত্র চার পাঁচটি দেশেই সিংহভাগ রফতানি হয়। এ অবস্থায় আমাদের প্রচলিত পণ্য থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অপ্রচলিত নতুন নতুন পণ্যের বাজার সৃষ্টি করতে পারলে একদিকে রফতানি আয় বাড়বে, অন্যদিকে দেশীয় শিল্পের বিকাশ  ঘটবে। এতে কর্মসংস্থানও বাড়বে। যা গোটা অর্থনীতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার করবে। তৈরি পোশাকের বাইরে অন্যান্য পণ্য যেমন জুতা, ফুটওয়্যার, হোম টেক্সটাইল, সিরামিকস প্রভৃতির অপার সম্ভাবনা রয়েছে। বহুমুখিকরণের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো, পণ্যের আন্তর্জাতিক মান ও কমপ্লায়েন্স অর্জন করা। মান ও খরচের বিবেচনায় প্রতিযোগিতামূলক না হলে বিশ্ববাজারে টিকে থাকা দুরূহ হয়ে পড়বে। রফতানি বহুমুখিকরণকে একক বা বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে শিল্পনীতি, আমদানি নীতি, আর্থিক নীতি ও অন্যান্য নীতির সামঞ্জস্য থাকতে হবে। সঠিকভাবে নীতি সহায়তা ও গৃহীত পদক্ষেপগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশে রফতানি পণ্যের বহুমুখিকরণ সম্ভব এবং এর মাধ্যমে দেশে শিল্পের আরো বিকাশ ঘটবে। শুধু তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতি নির্ভরশীলতা আমাদের রফতানি বাণিজ্যকে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ করে রেখেছে। আন্তর্জাতিক নানা পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রভাবে মাঝে মাঝে তৈরি পোশাক ক্রেতারা যে ধরনের অযাচিত চাপ প্রয়োগ করে অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে তা গোটা অর্থনীতিতে হুমকি ডেকে আনে। এ ক্ষেত্রে আরো বেশি সংখ্যক পণ্য রফতানি ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্ত থাকলে সেই হুমকি এবং ঝুঁকি অনেকটাই কমে যাবে। এ নিয়ে সরকার এবং রফতানিকারকদেরও দুশ্চিন্তা দূর হবে।