মঙ্গলবার দিবাগত রাতের ঘটনা। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন বসির আহম্মেদ (৪০) ও তার স্ত্রী রেশমা বেগম (৩৫)। হঠাত্ই ঘরের ভেতর ঢুকে পড়লো যাত্রীবাহী একটি বাস। আর তাতে চাপা পড়ে মর্মান্তিকভাবে নিহত হন স্বামী-স্ত্রী। তবে একই ঘরের ভিন্ন চৌকিতে থাকায় বেঁচে যায় তাদের দুই শিশু সন্তান। রাজশাহী মহানগরীর বহরমপুর রেলক্রসিং এলাকায় মঙ্গলবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনাটি ঘটে। চালক নিয়ন্ত্রণ হারালে কেয়া পরিবহনের বাসটি রাস্তার পাশে অবস্থিত বসির আহম্মেদের বাসার দেয়াল ভেঙে শোবার ঘরে ঢুকে পড়ে। জীবনপ্রদ্বীপ নিভে যায় ঐ দম্পতির। যন্ত্রদানবের আঘাতে আহত হয়েছেন বসিরদের পাশের বাড়ির বাসিন্দা। রবিউল হোসেন দিপু (৩৫) ও তার স্ত্রী চম্পা (৩০)। তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের চিকিত্সক আরিফুল ইসলাম।
প্রতিবেশীরা জানান, বসিরের জন্মস্থান বরিশাল। প্রায় ২৫ বছর আগে তিনি রাজশাহীতে বিয়ে করে সরকারি এই জমিতে বাড়ি করেন। এরপর থেকে তারা এখানেই বসবাস করতেন। বশির ভ্যান চালাতেন। আর রেশমা গৃহকর্মীর কাজ করতেন। এলাকায় তারা খুবই ভালো মানুষ বলে পরিচিত ছিলেন। তাদের এই মর্মান্তিক মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। রেশমার বোন রোখসানা বেগম (৪০) জানান, বসিরের তিন ছেলে। ১৫ বছরের বড় ছেলে রাশিদুল ইসলাম হূদয় রঙ মিস্ত্রির সহযোগী হিসেবে কাজ করে। মেজ ছেলে আলিফ (৭) বাড়িতেই থাকে। আর ছোট ছেলে রাহাত (৫) কেবল স্কুলে যাচ্ছে। দুর্ঘটনার সময় হূদয় বাড়িতে ছিল না। আলিফ ও রাহাত ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেও বাবা-মা, ঘর-বাড়ি, হারিয়ে তারা আজ নিঃস্ব। দুর্ঘটনার সময় আলিফের নানি আমেনা বিবি (৭০) পাশের ঘরে থাকায় তিনিও বেঁচে গেছেন।
কেয়া পরিবহনের বাসটিতে চড়ে ঢাকায় যাচ্ছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার বাঘরাইল গ্রামের মামুন-অর-রশিদ (২৫)। তিনি বসেছিলেন চালকের পাশের আসনটিতেই। মামুন জানান, নাচোল থেকে বাসটি রাত ১০টায় ছাড়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস ছাড়ে রাত ১২টায়। ওই দুই ঘণ্টা পুষিয়ে নিতে রাজশাহীর গোদাগাড়ী আসার পর থেকে চালক বাসের গতি বাড়িয়ে দেয়। চালকের কিছুটা তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাবও ছিল। এ জন্য বাস যাত্রীরা তাকে কয়েকবার গতি কমিয়ে সাবধানে গাড়ি চালাতে বলেন। কিন্তু চালক কারও কথা কানে না তুলে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালাচ্ছিল। বহরমপুর এলাকায় রেলক্রসিংয়ে বাঁক নিতে গিয়ে চালক বাসের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। গাড়ির গতি এতো বেশি ছিল, প্রায় এক ফুট উঁচু কংক্রিটের ফুটপাত পেরিয়ে বাসটি সোজা বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ে। এতে বাসের সামনের দিকে থাকা ৬-৭ জন যাত্রী আহত হন।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) সংরক্ষিত কাউন্সিলর নাসিরা খানম জানান, রেলক্রসিংয়ের ওই বাঁকে মাঝে-মধ্যেই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। তিনি ওই বাস চালকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। পাশাপাশি নিহতদের তিন সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করেন তিনি। নগরীর রাজপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমান উল্লাহ জানান, নিহত স্বামী-স্ত্রীর লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। দুর্ঘটনার পর বাস চালক পালিয়েছে। তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। দুর্ঘটনা কবলিত বাসটিকে জব্দ করে থানায় নেওয়া হয়েছে।
ইত্তেফাক/এএন