‘ঐশীর’ সবই ছিল অবৈধ

বরিশালের বানারীপাড়ায় সন্ধ্যা নদীতে বুধবার নিমজ্জিত যাত্রীবাহী লঞ্চ ঐশীকে গতকাল বৃহস্পতিবার উদ্ধার করা হয়েছে। বিআইডব্লিউটিএ’র উদ্ধারকারী জাহাজ নির্ভীক সকাল আটটায় উদ্ধার অভিযান শুরু করে। মাত্র ৩৫ মিনিটেই ছোট্ট ট্রলারের সমান লঞ্চটিকে ৫০ ফুট পানির তলদেশ থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসা হয়।  লঞ্চের ভিতরে পাওয়া যায় নিথর  চার শিশুর লাশ। সকাল নয়টায় উদ্ধার অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। কিন্ত তখনও নিখোজ ছিল ১০ জনের বেশি যাত্রী। নিখোঁজ যাত্রী ও নিহতদের পরিবার -পরিজন তখনও  বিলাপ করেছিলো। স্বজনহারাদের গগন বিদারী কান্নায় সন্ধ্যা নদীর দু’তীরের বাতাস ভারি হয়ে উঠে। গতকাল সন্ধ্যায় মারিয়া নামের ৪ বছরের আরো এক শিশুর লাশ ভেসে উঠে। সর্ববেশ তথ্য অনুযায়ী এ নিয়ে ১৯ জনের লাশ উদ্ধার হলো। যদিও বেসরকারি হিসাবে নিহতের সংখ্যা ২৪ জন।  গতকাল ভোরে দুর্ঘটনা স্থলে যাওয়ার সময় সন্ধ্যা নদীর দুই তীরে দেখা গেছে শোকার্ত মানুষের আহাজারি। কেউ নিখোঁজ বাবা, মা ও সন্তানের জন্য চষে বেড়াচ্ছেন সন্ধ্যা নদীর এপার-ওপার। সকাল আটটায় অভিযান শুরু হলে স্বজনহারা মানুষ তাদের প্রিয়জনের খোঁজে অকুস্থলে ছুটে আসেন। ক্রেন দিয়ে নির্ভিক যখন লঞ্চটি পানির তলদেশ থেকে টেনে তোলে তখন চার শিশুর লাশ দেখে তাদের পরিবারের ও স্বজনদের গগন বিদারী কান্নায় সেখানের বাতাস ভারি হয়ে উঠে। যাদের স্বজনদের তখনও সন্ধান মেলেনি তারাও চিত্কার করে কাঁদতে থাকেন।  স্বজনহারা মানুষের  আহাজারিতে সন্ধ্যা নদীর তীরে হূদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। তাদের আর্তনাদ দেখে উপস্থিত অনেকেই অশ্রু সংবরণ করতে পারেননি। উদ্ধার অভিযান শেষে উদ্ধার হওয়া চার শিশু উজিরপুরের মশাং গ্রামের মাইসা (৫) ও রাফি (৮), বানারীপাড়ার জিরাকাঠি গ্রামের সাফওয়ান (৩) ও  রিয়াদের (৫) লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তখনও বাকী নিখোঁজদের স্বজনরা ট্রলার ও স্পিডবোট নিয়ে বানারীপাড়া, উজিরপুর, স্বরুপকাঠি, কাউখালী উপজেলার সন্ধ্যা নদী ও এর শাখা নদীতে অনুসন্ধান করে যাচ্ছিল।
 
উদ্ধার অভিযান শেষে বিআইডব্লিউটিএর উপ-পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান ইত্তেফাককে জানান- নিমজ্জিত ঐশি মুলত একটি ইঞ্জিন চালিত নৌকা (ট্রলার)। এটির কাঠামো পরিবর্তন করে লঞ্চে রুপ দেওয়া হয়েছে। এর সার্ভে সনদ কিংবা রুটপারমিট তো দূরের কথা যাত্রী পরিবহন বা নদীতে চলাচলের কোন অনুমতি নেই। সম্পূর্ণ অবৈধ নৌ-যান হিসাবে বে-আইনীভাবে ঐশি যাত্রী পরিবহন করে আসছিল। ছোট্ট ট্রলারের পর্যন্ত রেজিস্ট্রেশন থাকে। কিন্ত ঐশীর জন্য স্থানীয়ভাবে কোন দপ্তর থেকেই অনুমতি পর্যন্ত নেয়া হয়নি।
 
দুর্ঘটনার পর জেলা প্রশাসনের গঠিত ৯ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক জাকির হোসেন জানান- তারা ৭ দিনের মধ্যে এ ব্যাপারে প্রতিবেদন জমা দিবেন।
 
বুধবার বেলা ১২ টায় বানারীপাড়ার সৈয়দকাঠী এলাকায় লঞ্চটি প্রায় অর্ধ শত যাত্রী নিয়ে নিমজ্জিত হওয়ার পর বরিশাল ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিরা অনুসন্ধানে নামেন। বেলা তিনটায় ৫০ ফুট পানির নীচে নিমজ্জিত ঐশীকে সনাক্ত করা হয়। এর পর স্থানীয় ভাবে দু’টি বলগেট এর সাহায্যে রাত ৮টা পর্যন্ত লঞ্চটি উদ্ধারের চেষ্টা চলে। পরে অন্ধকারের কারণে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত  উদ্ধারকাজ বন্ধ রাখা হয়। রাতেই খুলনা থেকে নৌবাহিনী ল্যাফটেন্যান্ট আরিফুল ইসলাম এর নেতৃত্বে ১৪ সদস্যের ডুবুরি দল দুর্ঘটনাস্থলে আসে। তার আগে বিকাল পাঁচটায় বরিশাল থেকে অকুস্থলের উদ্দেশে রওয়ানা হয়ে যায় উদ্ধার কারী জলযান নির্ভিক। সাড়ে ১১ ঘন্টা পর ভোর সাড়ে ৪টায় নির্ভিক দুঘর্টনাস্থলে পৌছায়। সকাল আটটায় শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। জেলা প্রশাসন সকাল নয়টায় উদ্ধার অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করে জানায় নিহতদের পরিবারকে ১০ হাজার করে টাকা দেওয়া হয়েছে।
 
জেলা প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী এ দুঘর্টনায় নিহতরা হচ্ছেন, বানারীপাড়ার মসজিদ বাড়ি স্কুল এ্যান্ড কলেজের ৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোঃ সাগর মীর (১৩), পূর্ব সৈয়দকাঠি গ্রামের রাবেয়া বেগম (৪৫), মসজিদবাড়ি গ্রামের মোজাম্মেল ওরফে মুজা মোল্লা (৬৫), জিরাকাঠি গ্রামের  রেহানা বেগম (৩৫), সাতবাড়িয়া গ্রামের ফিরোজা বেগম (৫৫), রাহিমা বেগম (৬০), সৈয়দকাঠি গ্রামের সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট মুক্তিযোদ্ধা আঃ রাজ্জাক, জিরাকাঠি গ্রামের মিলন ঘরামী (৩৫), কোহিনুর বেগম (৬৫), উজিরপুরের হারতা গ্রামের মাছ ব্যবসায়ী সুখদেব মল্লিক (৪৫), মশাং গ্রামের শান্ত (৮), নয়াকান্দি গ্রামের মোঃ জয়নাল হাওলাদার (৫৫), পূর্ব কেশবকাঠি গ্রামের নাফসি(৫), স্বরূপকাঠির আলকির হাট গ্রামের হিরা বেগম (২৫)।
 
এছাড়াও সৈয়দকাঠি ইউনিয়নের প্রবাসী মিলন ঘরামী ও তার শিশু পুত্র সাফওয়ানের  মৃতদেহ উদ্ধার হলেও তার স্ত্রী খুকু মনি (২২), বাইশারী সৈয়দ বজলুল হক বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের স্নাতক পরীক্ষার্থী মাইনুল ইসলাম রাজু, পূর্ব সৈয়দকাঠি  গ্রামের জাকির হাওলাদার (৪০), সাতবাড়িয়া গ্রামের আঃ মজিদ হাওলাদার(৬৫), বরগুনায় কর্মরত ফায়ার সার্ভিস কর্মী সাতবাড়িয়া গ্রামের রুহুল আমিন(৩০), স্বরূপকাঠির আলকির হাট গ্রামের সৈকত, হিদেল কাঠি গ্রামের অল্পনা (২৫), পূর্ব কেশবকাঠি গ্রামের দিদার (৮) ও হামিদা বেগম (৪০) সহ ১০/১২ জন যাত্রী এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। তদের প্রত্যেক পরিবার’র জন্য ৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে।
 
উল্লেখ্য, বুধবার সকাল সাড়ে দশটায় বানারীপাড়া লঞ্চ টার্মিনাল থেকে উজিরপুরের হাবিবপুরের উদ্দেশে ছেড়ে যায় অনুমোদন বিহীন ঐশি- প্লাস নামের লঞ্চটি। বানারীপাড়ার সৈয়দকাঠি ইউনিয়নের মসজিদ বাড়ি গ্রামের দাসেরহাট বাজারে টার্মিনাল বিহীন ভাঙন কবলিত তীরে বেলা সোয়া ১১ টার দিকে ভিড়তে গেলে মাটির বড় আকৃতির স্তুপ ভেঙ্গে লঞ্চটির সামনে পড়ে। এতে তৈরি হওয়া ঘূর্ণি স্রোতে লঞ্চটি মুর্হুতের মধ্যে  ডুবে যায়। ওই সময় বৃষ্টি হওয়ায় যাত্রীরা লঞ্চের ভিতরে জানালা আটকে থাকায় দুর্ঘটনার পরে তারা বাইরে বের হতে পারেননি। পাঁচ জন যাত্রী সাঁতার কেটে তীরে উঠতে পারলেও  শিশু ও নারী সহ ৩৫/৪০ জন যাত্রী নিখোঁজ হয়। বানারীপাড়ার ইতিহাসে এধরণের বড় দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনা এর আগে কখনও না হওয়ায় গোটা উপজেলায় শোকাবহ পরিবেশ বিরাজ করছে।
 
রাতে ৬ জনের লাশ উদ্ধার
 
বানারীপাড়া (বরিশাল) সংবাদদাতা গতকাল রাতে জানান, বানরীপাড়ার সৈয়দকাঠি ইউনিয়নের দাসের হাট বাজারে সন্ধ্যা নদীতে লঞ্চ ঐশি ডুবির ঘটনায় আরও ৬ যাত্রীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বানারীপাড়া ফেরী ঘাট সংলগ্ন  সন্ধ্যা নদীতে ভাসমান অবস্থায় উপজেলার সাতবাড়িয়া গ্রামের আলম মীরের মেয়ে মাফিয়া (৬) ও বাংলাবাজার এলাকা থেকে ভাসমান অবস্থায়  উজিরপুরের কেশবকাঠি গ্রামের খলিল হাওলাদারের স্ত্রী হামিদা বেগম (৪০)’র লাশ উদ্ধার করা হয়। এদিকে থানার উপ-পরিদর্শক জসিম উদ্দিন রাত সাড়ে ৮টার সময়  জানান এছাড়াও ৪ জনের লাশ ভাসতে থাকার খবর পেয়ে তা উদ্ধারে নদীতে ছিল থানা পুলিশ।
 
 

ইত্তেফাক/এএন