৫৭৪ কোটি টাকা ব্যয় হলেও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায় প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে দেশের ৩৫টি বধ্যভূমি। একাত্তরের চেতনা বিকাশে এসব স্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রশাসনিক অবহেলায় কোনো কোনোটি এখন রিকশার গ্যারেজ কিংবা টেম্পো স্ট্যান্ড হিসাবে ব্যবহার হচ্ছে। কোনো কোনো বধ্যভূমির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে স্যুয়ারেজ লাইন!
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত এই বধ্যভূমিগুলোর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন। এগুলোকে মুক্তিযুদ্ধ চর্চা কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলা সম্ভব হলে মূল উদ্দেশ্য পূরণ হবে। এমনকি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবেও এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এজন্য প্রয়োজন সমন্বিত নীতিমালা ও সঠিক বাস্তবায়ন।
১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এদেশের নিরীহ বাঙালিদের নির্মমভাবে বধ্যভূমিতে নিয়ে হত্যা করে। তাদের স্মৃতিসমূহ অম্লান করে রাখার জন্য এবং মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস পরবর্তী প্রজন্মকে জানানোর জন্য বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণ করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এ লক্ষ্যে ‘১৯৭১ এ মহান মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী কর্তৃক গণহত্যার জন্য ব্যবহূত বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্প গ্রহণ করে সরকার। এটি বাস্তবায়ন করে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়। এ প্রকল্পের আওতায় সারাদেশে ৩৫টি বধ্যভূমি চিহ্নিত করা হয়। ২০০২ সালের জুলাই থেকে ২০০৮ সালের জুলাই মেয়াদে ৫৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়।
কিন্তু প্রকল্পভুক্ত কয়েকটি বধ্যভূমি সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, এগুলো অনেকটাই অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। বেশিরভাগ বধ্যভূমিতে কোনো নাম ফলক নেই। নেই নিরাপত্তা বেষ্টনী বা সীমানা প্রাচীর। নোংরা ও ময়লা আবর্জনায় পরিপূর্ণ এবং অনেকটা পরিত্যক্ত স্থানের মত অবহেলায় পড়ে আছে। বেশিরভাগ বধ্যভূমিই সন্ধ্যার পরে মাদকসেবীদের আড্ডায় পরিণত হয়। কিশোরগঞ্জে অবস্থিত বধ্যভূমিটিতে সুয়্যারেজ লাইন সংযুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। বগুড়ার বধ্যভূমির স্মৃতিস্তম্ভ এলাকাটি বর্তমানে রিকশা এবং টেম্পোর গ্যারেজ হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। সেখানে ময়লা আবর্জনার স্তূপ। স্মৃতিস্তম্ভের টাইলস খসে পড়ছে। সন্ধ্যা হলেই মাদকসেবীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয় এই স্মৃতিস্তম্ভ। স্থানীয় তরুণ প্রজন্মও বধ্যভূমির ইতিহাস সম্পর্কে খুব বেশি জানে না। কেবলমাত্র দুই-একটি স্থানে স্থানীয় প্রশাসন ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নিজস্ব উদ্যোগে বিভিন্ন জাতীয় দিবস পালন করা হয়।
কিশোরগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা ছফির উদ্দিন আক্ষেপ করে বলেন, ‘স্তম্ভ নির্মাণ করার চেয়ে না করাই ভালো ছিল। স্যুয়ারেজের ময়লা উপচে পড়ছে বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভে। পাঞ্জাবিদের নির্মমতার শিকার হয়েছিল যারা, তাদের প্রতি এটি অসম্মান।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় সবগুলো স্মৃতিস্তম্ভেরই একই হাল। প্রকল্পের প্রভাব মূল্যায়ন সমীক্ষায়ও একই চিত্র উঠে এসেছে। প্রকল্প বাস্তবায়িত হওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী তার মূল্যায়ন করা হয়। এটি করে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। সেখানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে একই রকম তথ্য। আইএমইডি সূত্র জানায়, তাদের পর্যবেক্ষণেও প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বিভিন্ন অসঙ্গতির চিত্র পরিলক্ষিত হয়। বিশেষত বধ্যভূমির উপযুক্ত স্থান নির্বাচন না করা, দলীয় ঠিকাদার নির্বাচন, নির্মাণ সামগ্রীর গুণগত মান নিশ্চিত না করা, প্রকল্প কাজের পর্যাপ্ত তদারকি ও নজরদারির অভাব, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকল্পের সঙ্গে সংযুক্ত না করা, প্রকল্পের ত্রুটিপূর্ণ নকশা প্রণয়ন, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে প্রকল্পটি বুঝিয়ে না দেওয়াসহ বিভিন্ন অসঙ্গতি রয়েছে।
আইএমইডির প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জাতীয় এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে অবহেলা ছিল।
বিশষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের কোটি কোটি তরুণ ও যুবসমাজকে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করা সম্ভব। সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা বধ্যভূমিসমূহে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে প্রত্যেকটি স্থানকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি।
আইএমইডির প্রভাব মূল্যায়ন সমীক্ষার পরামর্শক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানউল্লাহ ইত্তেফাককে বলেন, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আরো আন্তরিক হওয়া প্রয়োজন ছিল।
অরক্ষিত বধ্যভূমিসমূহ: প্রকল্পে দেশের যে ৩৫ টি বধ্যভূমি চিহ্নিত করা হয়, সেগুলো হলো- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকার মিরপুরে শিয়ালবাড়ি, চট্টগ্রামের পাহাড়তলি, খুলনার চুকনগর, সিলেট ক্যাডেট কলেজ সংলগ্ন, হবিগঞ্জ, বরিশাল, কিশোরগঞ্জের দানাপাটুলি ইউনিয়নে দুলদিয়া ব্রিজ সংলগ্ন এলাকা, মানিকগঞ্জ বিআরডিবি এলাকা, দিনাজপুরের চকদুলু নারায়ণপুর, পঞ্চগড় সদরস্থ ১নং আমরখানা, মুন্সিগঞ্জ সদরে হরগঙ্গা ডিগ্রি কলেজ, ঝিনাইদহের বিষয়খালি বাজার শহীন গোলাম মোস্তফা উচ্চ বিদ্যালয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর স্টেশনের পশ্চিমে বিডিআর ক্যাম্পের সামনে গণকবর, কুমিল্লার রসুলপুর ফকিরহার রেল স্টেশনের পাশে, নীলফামারীর বোতলগাড়ী, মৌলভীবাজারের শমশের নগর, পিরোজপুরে সোহাগদল সরকারি কলেজ সংলগ্ন বড়পুকুরের দক্ষিণপাড় ও বরছাকাঠী এলাকা, যশোরের চাঁচড়া রায়পাড়া, কুড়িগ্রামের ঠাটমারি, রাজবাড়ী রেলওয়ে স্টেশন এলাকা, ফরিদপুরের নগরকান্দার কোদালা গ্রাম, নারায়ণগঞ্জ বন্দর এলাকার সিরাজউদ্দৌলাহ ক্লাব মাঠ, নওগাঁর সাপাহার পাহাড়পুকুর, নাটোর সদরের ফুলবাগান, বগুড়া সদরে রেল স্টেশনের পশ্চিম পাশ, পাবনার আটঘরিয়ার মাজপাড়া, শেরপুরের ঝিনাইগাতি, ময়মনসিংহ জেলা পরিষদ সংলগ্ন ডাকবাংলো, বাগেরহাট ডাক বাংলো, গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর গৃরিধারীপুর, ঠাকুরগাঁও সদরের সুখানপুকুর, জয়পুরহাট জেলার সদর উপজেলার পাগলা দেওয়ান গ্রাম, নরসিংদী সদরের গান্ধীর ঈদগাহ ও রংপুর সদরের কামাল কাছনা শ্মশান বধ্যভূমি।
শেরপুরে অচিহ্নিত অনেক বধ্যভূমি: শেরপুর প্রতিনিধি সুশীল মালাকার জানান, অবহেলা আর অবমূল্যায়নের কারণে শেরপুরের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত অবকাঠামোসমূহ ধ্বংসের পথে। সেই সঙ্গে বধ্যভূমিগুলো চিহ্নিতকরণ ও সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে। স্থানীয় সচেতন মহলের অভিমত মুক্তিযুদ্ধের এসব স্মৃতিচিহ্ন ও বধ্যভূমিগুলো অবিলম্বে সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ না করলে পরবর্তী প্রজন্মের অজানাই থেকে যাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস।
ইত্তেফাক/এএন