ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন
হারিয়ে যাচ্ছে একে একে আমার ভালোলাগার শিল্পীগণ। কেন জানি না, যতই দিন যাচ্ছে এই তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। দুরন্ত কৈশোর ও টগবগে যৌবনের দিনগুলো মুখরিত ছিল যাদের গানে, তাদের অন্যতম একজন ছিলেন শাহনাজ রহমতুল্লাহ।
শাহনাজের অসাধারণ গায়কী, আমেজ ভরা গলার কারুকাজ, বাংলা গানে যোগ করেছিল এক নতুন মাত্রা। এ জন্য সংগীত জগতে ব্যতিক্রমী আসনে সমাসীন হয়েছিলেন তিনি। সংগীতপ্রিয় মানুষের ভালোবাসা আর ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন।
১৯৫২ সালে ঢাকার এক শিল্পী পরিবারে শাহনাজ রহমতুল্লাহর জন্ম। মায়ের কাছেই তাঁর সংগীতের হাতে খড়ি। বড়ভাই প্রখ্যাত সুরকার ও সংগীত পরিচালক আনোয়ার পারভেজ আর আরেক ভাই হলেন জনপ্রিয় নায়ক ও গায়ক জাফর ইকবাল। খুব কম বয়সেই তিনি শিল্পী হিসেবে খ্যাতি পান। জাতশিল্পীদের ক্ষেত্রে মনে হয়ে এমনই হয়।
মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি ‘নতুন সুর’ চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দেন। এত কম বয়সে বাংলাদেশের সংগীত জগতে কেউ প্লে-ব্যাক করেছেন কিনা আমার জানা নেই। জীবন্ত কিংবদন্তি রুনা লায়লা ১২ বছর বয়সে একটি শিশুশিল্পীর চরিত্রের জন্য প্লে-ব্যাক করেন। কিন্তু এত অল্প বয়সেও শাহনাজের গলার পরিপক্বতায় মুগ্ধ হয়ে সংগীত পরিচালক নায়িকার জন্যই প্লে-ব্যাক করান তাঁকে দিয়ে।
গজলসম্রাট মেহেদী হাসানের শিষ্য হয়ে সরাসরি তালিম নেবার মতো ভাগ্য হয় ক’জনের? শাহনাজ রহমতুল্লাহ ছিলেন সেই বিরল দলের একজন। তাঁর গায়কীতে ছিল গজল ও ধু্রপদ সংগীতের মায়াবী ছোঁয়া। আরো কিছুু দাও না দুঃখ আমায়, মানিক সেতো মানিক নয়-এর মতো গানে তাঁর গলার রেওয়াজী ঢং লক্ষণীয়। ব্যতিক্রমী গায়কীর জাদুতে প্রচলিত ধারার আধুনিক বাংলাগানও শাহনাজের কণ্ঠে কালজয়ী হয়ে গেছে। এটিই তাঁকে জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছে।
২০১৪ সালে সংগীতশিল্পী হিসাবে ৫০ বছর পূর্ণ করেন শাহনাজ রহমতুল্লাহ। পাঁচ দশকের সংগীত জীবনে তাঁর সাফল্য ছিল আকাশ ছোঁয়া। ২০০৫ সালে বিবিসির জরিপে সর্বকালের সেরা ২০টি গানের তালিকায় শাজনাজের গাওয়া চার-চারটি গান স্থান পায়। গানগুলো হলো— ‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে’, ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’, ‘একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়’ আর ‘এক তারা তুই দেশের কথা’। দুই বাংলায় কোনো শিল্পীর গাওয়া এতগুলো গান কালজয়ী গানের তালিকায় ঠাঁই পায়নি। বাঙালি শ্রোতাদের কাছে তিনি যে কতটা জনপ্রিয় এটাই তাঁর অকাট্য নিদর্শন।
দেশাত্মবোধক গানের অপ্রতিদ্বন্দ্বী কণ্ঠশিল্পী হলেন শাহনাজ। দেশাত্মবোধক গানকে নতুন মাত্রা দিয়েছেন তিনি। বহু জনপ্রিয় দেশাত্মবোধক গান কেবল একটি বিশেষ দিনে বাজতে দেখা যায়। কিন্তু শাহনাজের গাওয়া দেশাত্মবোধক গানগুলো অন্য ধারার জনপ্রিয় গানগুলোকে ডিঙিয়ে মানুষের হূদয়ে চিরতরে ঠাঁই করে নিয়েছে। ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’, ‘এক তারা তুই দেশের কথা’, ‘আমায় যদি প্রশ্ন করে’-এর মতো গান সব ধরনের গানের জলসায়, সব বয়সের শিল্পীদের কণ্ঠে শোনা যায়।
শাহনাজের গাওয়া জনপ্রিয় গানের তালিকা অনেক দীর্ঘ। তবে অন্য সব গান বাদ দিলেও তাঁর কণ্ঠের ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’, শুধু এই একটি গানের জন্য তিনি বাঙালির হূদয়ে অমর হয়ে থাকবেন। মুুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রের সূচনাসংগীত হিসেবে পরিবেশিত হতো এই গানটি। মুক্তিযোদ্ধা ও দেশবাসীকে উদ্দীপ্ত করতে এই গানটির ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। রবি ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা’ যদি বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসাবে মনোনীত না হতো, তাহলে ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ গানটিই হতে পারত আমাদের জাতীয় সংগীত।
১৯৯২ সালে একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ গান গেয়ে তিনি পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার ও সন্মাননা। সংগীত জীবনের ৫০ পূর্তির পর গান থেকে বিদায় নেন শাহনাজ রহমতউল্লাহ। তবে মাঝেমধ্যে ঘরোয়া জলসায় ভক্তদের পীড়াপীড়িতে হারমোনিয়াম নিয়ে বসতেন তিনি। নিয়মিত গান করা ছেড়ে দিলেও তাঁর গায়কী ও কণ্ঠের ধার এতটুকু কমেছে বলে কখনো মনে হয়নি।
তুমি ছিলে সবই ছিল, তুমি নেই কিছু নাই। হঠাত্ করে যেন দৃষ্টির সীমানার ওপারে হারিয়ে গেলেন গানের পাখি শাহনাজ। তাঁর চলে যাওয়াটা আমার মতো লক্ষ কোটি ভক্তের হূদয়ে কষ্টের ফসল বুনছে। শাহনাজ রহমতউল্লাহ হলেন একজন কালজয়ী কণ্ঠশিল্পী, তিনি চলে গেলেও তাঁর গান আমাদের মন বাতায়নে ভালোলাগার সুবাস ছড়াবে অনন্তকাল ধরে।
n লেখক : সংগীতশিল্পী, গীতিকার ও প্রকৌশলী