‘ঘরবাড়ি আর স্কুল ডুবে যাওয়ায় আমরা লিখাপড়া করতি পারতিছিনে। আমরা আমাগের শিক্ষার সুযোগ চাই। আমাগের বাসস্থান ফিরে পাতি চাই।’ কুলটিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণির ছাত্রী রিতু সরকার মাইক হাতে এমন করেই শিক্ষা আর বাসস্থানের অধিকার ফিরে পাবার দাবি তুলে ধরে। ভবদহের জলাবদ্ধ অঞ্চলের কয়েক হাজার মানুষ গতকাল রবিবার যশোরের জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাওকালে সমাবেশের সময় কিশোরী রিতুও বক্তব্য রাখে।
রিতুর স্কুলের প্রায় শখানেক ছাত্রীও এসেছিল ঘেরাও কর্মসূচিতে। তাদেরই একজন ১০ম শ্রেণির ছাত্রী জয়শ্রী মন্ডল ইত্তেফাককে ক্ষোভের সাথে বলে, ‘সুন্দরবনেও জোয়ারের জল এসে ভাটায় ফিরে যায়। কিন্তু এখানে জল এসে দেড় মাসেও সরছে না। এভাবে পশুপাখিও বাঁচতে পারে না। আমাদের বাঁচতে হচ্ছে। এরে কী বাঁচা কয়?’ একই ক্লাসের ছাত্রী ব্রীতি মন্ডল বলে, ‘আমাগের দুই তলা স্কুলির একতলা আজও পানির মধ্যি রয়ছে। স্কুল একমাস বন্ধ ছিল। এখন খুললিও পানি ভাইঙ্গে আমরা স্কুলি আসতি পারতিছিনে।’ মোহনা বিশ্বাস বলে, ‘পঁচা পানি আমাগের গায় লাগএ ঘা-পাঁচড়া হচ্ছে। সাপ-ব্যাঙের সাথে আমরা একসাথে বাস করতিছি।’
ঘেরাও কর্মসূচিতে অংশ নিতে আসা মনিরামপুরের লখাইডাঙ্গা গ্রামের কবিতা দত্ত বলেন, ‘আমাগের ঘরের মধ্যি জল। ঢেউয়ের তোড়ে রাস্তাঘাটও ভাইঙ্গে গেছে। ঘরবাড়ি ছাইড়ে আমরা রাস্তায় গরু-ছাগল নিয়ে একসাথে বাস করতিছি। রান্নাবান্নাও ঠিকমতো করতি পরতিছিনে।’ সুজাতপুরের কৃষক চিত্তরঞ্জন মন্ডল বলেন, ‘জলে ল্যাট্রিন সব নষ্ট হইয়ে গেছে। সাদা পলিথিন দিয়ে ঘিরে ল্যাট্রিন বানাইছি। অতি কী আর লজ্জা নিবারন হয়?’
ভবদহের জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচিতে অংশ নেন অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলার জলাবদ্ধ মানুষ। ঘেরাও শেষে তারা পানি নিষ্কাশনসহ পাঁচ দফা দাবিতে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেন। বিগত বর্ষার পর এই তিন উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি এ কর্মসূচির আয়োজন করে। স্মারকলিপি প্রদানকালে উপস্থিত ছিলেন ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির নেতা অভয়নগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এনামুল হক বাবুল, অভয়নগর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মালেক মোল্লা প্রমুখ।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, গত দেড় মাস ধরে তিন উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। গত ৯ ও ২৪ আগস্ট প্রবল বর্ষণে নতুন করে কয়েকশ গ্রামে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে বাড়িঘর, মাছের ঘের, কৃষি জমি, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। গত ঈদুল আজহার নামাজ পড়তে হয়েছে রাস্তায়। আসন্ন দুর্গাপূজা আয়োজনেরও জায়গা নেই। সাপের কামড়ে অন্তত ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ আগস্ট একটি এস্কেভেটর দিয়ে ভবদহ স্লুইস গেট সংলগ্ন হরিহর নদের পলি অপসারণ কাজ শুরু হয়েছে। এছাড়া খুলনা-ঢাকা মহাসড়কের আমডাঙ্গা স্লুইস গেট (যার কপাটগুলো ত্রুটিযুক্ত) দিয়ে স্বল্প পরিমাণ পানি প্রবাহিত হচ্ছে।
স্মারকলিপিতে পাঁচ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে- ভবদহ স্লুইস গেট সংলগ্ন হরিহর নদী খননের জন্য দ্রুত আরও একটি এস্কেভেটর কাজে লাগাতে হবে। আমডাঙ্গা খালের স্লুইস গেটের কপাটগুলো ত্রুটিমুক্ত করতে হবে। মাঘী পূর্ণিমার আগেই বিল কপালিয়ায় টিআরএম চালু করতে হবে। আমডাঙ্গা খাল প্রশস্থকরণ ও গভীরতার মাধ্যমে পানি সরানোর ব্যবস্থা করতে হবে। জলাবদ্ধ এলাকাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সর্বাত্মক সাহায্য ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। পানি নামার পরপরই জলাবদ্ধ এলকার রাস্তাঘাট, শিক্ষপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান মেরামতের ব্যবস্থা করতে হবে।
ইত্তেফাক/এএন