শিফারুল শেখ
২০১৮ সালে বিশ্বের শান্তির সূচকে দ্বিতীয় নম্বরে নিউজিল্যান্ড। কিন্তু গত ১৫ মার্চ সেই দেশটিতেই নেমে আসে অশান্তি। দু’টি মসজিদে প্রার্থনারত মুসলিমদের ওপর শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী জঙ্গির হামলায় ৫০ মুসল্লির প্রাণ যায়। এই প্রাণহানির ঘটনা যতটা না বিশ্বের নজর কেড়েছে তার চেয়ে বেশি নজর কেড়েছে এক শতাংশ মুসলিমের জন্য নিউজিল্যান্ডবাসীর সমবেদনা আর ভালোবাসা। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডেন যে নজির স্থাপন করেছেন তা প্রশংসিত হয়েছে পুরো বিশ্বে। ধর্মীয় হিংসা-বিদ্বেষ আর বর্ণবাদের এই যুগে তার মতো নেতা বিশ্বে কতটা প্রয়োজন তা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।
হামলা এবং সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত: মার্কিন মানবাধিকার কর্মী মার্টিন লুথার কিং বলেছিলেন, সত্যিকারের নেতারা ঐক্য খোঁজেন না, তারাই ঐক্য তৈরি করেন। নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আর্ডেন সেই কাজটিই করেছেন। মুসলিমদের ওপর হামলার কয়েক ঘণ্টা পরই বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে বন্দুক হামলাকে সন্ত্রাসী হামলা বলে বর্ণনা করেন। বহু মানুষ মনে করেন, শ্বেতাঙ্গ কোনো ব্যক্তির দ্বারা এ ধরনের হামলার ক্ষেত্রে (এমনকি সেটা যদি রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রভাবেও হয়ে থাকে) কর্তৃপক্ষ এ ধরনের শব্দ ব্যবহার করতে অনীহা বা অনিচ্ছুক মনোভাবের পরিচয় দিয়ে থাকেন। কিন্তু আর্ডেনের বিবৃতিতে সেই ধারণা মিথ্যা প্রমাণিত হয়। মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের শোক এবং ভীতির প্রতি তার স্বীকৃতি সেখানেই ফুরিয়ে যায়নি। ক্রাইস্টচার্চে ঘটনার শিকার পরিবারগুলোর স্বজনদের জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা ও সমবেদনা জানান। সেই সময় মাথায় কালো রঙের স্কার্ফ পরেন তিনি যা তাদের প্রতি শ্রদ্ধারই বহিঃপ্রকাশ। তিনি মানুষকে একতার বন্ধনে বেঁধে বলেছেন, তারা আমাদের। এর কয়েকদিন পর পার্লামেন্টে ভাষণ দিয়েছেন। কোরআন তেলাওয়াত করে অধিবেশন শুরু হয়েছে। আসসালামু আলাইকুম (তোমার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক) বলে ভাষণ শুরু করেছেন জেসিন্ডা। তিনি দেশের অস্ত্র আইনেও পরিবর্তন এনেছেন। প্রধানমন্ত্রী বিশ্ব থেকে বর্ণবাদ বিতাড়িত করার আহবান জানিয়েছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, এ বিষয়ে সীমানা নিয়ে ভাবলে হবে না। এরপর গত শুক্রবার ভিন্ন নিউজিল্যান্ডকে দেখা গেল। জুমার নামাজের আজান এবং নামাজ রাষ্ট্রীয় মিডিয়ায় সরাসরি সম্প্রচারে মুখরিত ছিল দেশ। ক্রাইস্টচার্চের পার্কে প্রায় ২৫ হাজার মানুষের সমাগম ঘটে যেখানে মুসলমান ছাড়া অন্যান্য ধর্মের লোকও আসেন। প্রধানমন্ত্রী আগের মতোই স্কার্ফ পরে আসেন। ওইদিন অন্যান্য ধর্মের সব নারীও মুসলিম নারীদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করে মাথায় স্কার্ফ পরেন। ভাষা, জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী ইসলামের শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা) এর বাণী উদ্ধৃত করে বলেন, দয়া, সমবেদনা, সহানুভূতি একই শরীরে থাকে। কোনো একটি অংশ জখম হলেই গোটা শরীরে যন্ত্রণা হয়। আমরাও এক। গোটা দেশ শোকার্ত। ঠিক দুপুর দেড়টা নাগাদ দুই মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। কেবল ক্রাইস্টচার্চের ওই সমবেতে নয়, পুরো নিউজিল্যান্ড যেন শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েছিল। ওই সময়টাতেই মসজিদে হত্যালীলা চালিয়েছিল জঙ্গি ব্রেন্টন টারান্ট। সহমর্মিতার মূল্যায়ন করেন আল নূর মসজিদের ইমাম ফাউদা। তার কথায়, যেভাবে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী এই ঘটনার নিন্দা করেছেন এবং শোকসন্তপ্তদের জন্য এগিয়ে এসেছেন তা গোটা বিশ্বে দৃষ্টান্ত।
আর্ডেন সম্পর্কে কিছু কথা: সুশীল অ্যারোন নিউ ইয়র্ক টাইমসে লিখেছেন, আর্ডেন ডানপন্থি শক্তিশালীদের ভিড়ে দৃঢ় প্রগতিশীল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে আসছেন যার ক্যারিয়ার গড়ে উঠেছে উদারতাহীন ও মুসলিম বিদ্বেষী আড়ম্বরের মধ্যে। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, বিভিন্ন ধর্মের মানুষ কিভাবে একসঙ্গে থাকা যায়।
১৯৮০ সালে জন্ম নেওয়া আর্ডেন বেড়ে ওঠেন মুরপাড়া নামে নিউজিল্যান্ডের মাউরি আদিবাসী অধ্যুষিত ছোট্ট শহরে। সেখানে শিশুদের পায়ে দেওয়ার মতো জুতা ছিল না, এমনকি দুপুরে তারা খাবারও পেত না। এই ঘটনাই তাকে রাজনীতিতে উদ্বুদ্ধ করে। উচ্চ মাধ্যমিক শেষে আর্ডেন পড়াশোনা করেন যোগাযোগ বিভাগে। এর আগে ১৭ বছর বয়সেই যুক্ত হন নিউজিল্যান্ডের লেবার পার্টির রাজনীতিতে। ২০০৮ সালে আর্ডেন লেবার পার্টির সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়েও ১৩ হাজার ভোটে হারলেও সংবিধানিক নিয়মে তিনি সংসদে যাওয়ার সুযোগ পান।
২০১৭ সালে লেবার পার্টির উপ-প্রধান নির্বাচিত হন আর্ডেন। নির্বাচনের মাত্র দুই মাস আগে দলটির প্রধান পদত্যাগ করলে সেই ভারও চাপে তার কাঁধে। তাকে নিয়ে এসময় দেশটিতে জনপ্রিয়তার যে ঢেউ ওঠে তা পরিচিত হয় ‘জেসিডামেনিয়া’ নামে। মাত্র দুই মাসের নেতৃত্বে অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবেই দলকে নির্বাচনে বিজয়ী করেন আর্ডেন। ২০১৭ সালে ৩৭ বছর বয়সে বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন।