গুরুর জন্য শিষ্যের শুভ কামনা

 
দেশের কিংবদন্তী সুরকার-সংগীত পরিচালক আলম খান। গুরুতর অসুস্থ হয়ে রাজধানীর সমরিতা হাসপাতালে চিকিত্সাধীন আছেন। কিংবদন্তি এই শিল্পী যখন হাসপাতালে, তখন তারই শীষ্য এ্যান্ড্রু কিশোর আরও নতুন চারটির গান উপহার হিসেবে পান বরেণ্য গীতিকার সৈয়দ শামসুল হকের কাছ থেকে। চারটি গানই যেন আলম খান সুর-সংগীতায়োজন করেন তা বলে দিয়েছিলেন সৈয়দ শামসুল হক। আরও বিস্তারিত জানাচ্ছেন মিলান আফ্রিদী।
 
আলম খানের পূর্ণাঙ্গ সহযোগিতা না পেলে মফস্বলের সেই ছেলেটির আজকের এ্যান্ড্রু কিশোর হয়ে ওঠা হতো না। এ কথা অনায়াসে স্বীকার করেন এ্যান্ড্রু কিশোর নিজেও। বহুদিন গুরুর সুর-সংগীতে কোনো গান করার সুযোগ হয় না তার। কিন্তু যখন আলম খান হাসপাতালে, সেই মুহূর্তে তিনি আরেক কিংবদন্তি গীতিকার সৈয়দ শামসুল হকের কাছ থেকে নতুন চারটি গান উপহার হিসেবে পান। গান-চারটি যেন আলম খানকে দিয়ে করানো হয় তাও বলে দেওয়া হয়েছে।
 
এ্যান্ড্রু কিশোর বলেন, ‘জানি না এই চারটি গানের ভবিষ্যত্ কী হবে। তবে বিধাতার কাছে প্রার্থনা করি আলম ভাই যেন সুস্থ হয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসেন। শুধু আমি নই, সবাই যেন আলম ভাইয়ের সুর-সংগীতে আবারও গান করতে পারেন। আলম ভাই-হীন আমি নিজেকে কখনোই কল্পনা করিনি, করতে পারবও না।’
 
জীবন্ত কিংবদন্তী সুরকার ও সংগীত পরিচালক আলম খান ও তার শীষ্য প্লে-ব্যাক সম্রাট এ্যান্ড্রু কিশোরের মধ্যকার গুরু-শীষ্যের সম্পর্ক তিন যুগ পার হয়েছে। সম্পর্কের বিরাট এই সফরে দুজনই বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনকে করেছেন সমৃদ্ধ, অলংকৃত। একজন সুর করেছেন আর অন্যজন চ্যালেঞ্জ নিয়ে গেয়েছেন। আর তাতেই যেন ইতিহাস হয়ে গেছে একের পর এক গান। আলম খান ও এ্যান্ড্রু কিশোর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন যারা বিভিন্ন সময়ে গীতি কবিতা লিখেছেন। কারণ ভালো গীতি কবিতা না হলে হয়তো একটি ভালো গানেরও জন্ম হতো না।
 
আলম খান ইত্তেফাককে বলেছিলেন, ‘সুরকার মনের মাধুরী মিশিয়ে সুর করবেন, গীতিকবি তার শব্দ ভাণ্ডার থেকে গীতি কবিতা রচনা করবেন আর শিল্পী গাইবেন, এভাবেই একটি গান হয়ে ওঠে অনন্য। তাই সবসময়ই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি সেই বরেণ্য গীতিকবিদেরকেও। শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি আমার কাজ করা প্রত্যেক চলচ্চিত্রের প্রযোজক, পরিচালক ও শিল্পীদেরকেও।’
 
আলম খানের সুর-সংগীতায়োজনে চন্দন চৌধুরীর পরিচালনায় ‘কী জাদু করিলা’ চলচ্চিত্রে এ্যান্ড্রু কিশোর সর্বশেষ গান করলেও গুরু-শীষ্যের মধ্যে যোগাযোগ নিয়মিতই ছিল, আছে। ‘এক চোর যায় চলে পিছনে লেগেছে দারোগা’, ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস দম ফুরাইলে ঠুস’, ‘ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে’, ‘ভালোবেসে গেলাম শুধু’, ‘চাঁদের সাথে আমি দেবো না তোমার তুলনা’, ‘কারে বলে ভালোবাসা কারে বলে প্রেম’, ‘সবাই তো ভালোবাসা চায়’, ‘জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প’, ‘তুমি যেখানে আমি সেখানে’ এমন আরও অসংখ্য গানের সুর-সংগীতায়োজন করেছেন আলম খান এবং গেয়েছেন এ্যান্ড্রু কিশোর।
 
১৯৭৭ সালে শিবলী সাদিক পরিচালিত ‘মেইল ট্রেন’ চলচ্চিত্রে আলম খানের সুরে এ্যান্ড্রু কিশোর প্রথম গান করেন। এরপর বাদল রহমানের ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’ চলচ্চিত্রে ‘ধুম ধারাক্কা ধুম’ গানটি করেন। তবে আলম খানের সুরে এ জে মিন্টু পরিচালিত ‘প্রতিজ্ঞা’ চলচ্চিত্রের ‘এক চোর যায় চলে’ গানটি শ্রোতারা এ্যান্ড্রুর কণ্ঠে প্লে-ব্যাক হিসেবে প্রথম শোনেন।
 
এ্যান্ড্রু কিশোর প্রসঙ্গে আলম খানের ভাষ্য এমন, ‘একজন সত্ মানুষ, বড়কে শ্রদ্ধা করা, সম্মান দিয়ে কথা বলা, হিসাবী, অন্যায়ের প্রতিবাদী এসব গুণের সমন্বয়েই একজন এ্যান্ড্রু। আমি তাকে বাংলাদেশের একজন শ্রেষ্ঠ শিল্পী হিসেবেই মনে করি, যার কণ্ঠে সবধরনের গান সমানভাবেই প্রয়োগ করা যায়। যেকোনো ধরনের গান এ্যান্ড্রু কিশোর এত দরদ আর এত সহজেই গাইতে পারে যা অন্য কারো ক্ষেত্রে আমি কল্পনাও করতে পারি না। তাই এ্যান্ড্রুর বিকল্প এ্যান্ড্রু নিজেই।’
 
এ্যান্ড্রু কিশোর বলেন, ‘আমার জীবনাদর্শের নায়ক আলম ভাই। আমার গানের হাতেখড়ি ওস্তাদ আব্দুল আজিজ বাচ্চু স্যারের কাছে। তবে আমার প্রফেশনাল জীবনের ওস্তাদ আলম ভাই। আমার পথপ্রদর্শক তিনি, আমার জীবনে মা-বাবার পর যার অবদান অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, তিনি আলম ভাই।’
 
মোহাম্মদ মহিউদ্দিন পরিচালিত ‘বড় ভালো লোক ছিল’ চলচ্চিত্রে একসঙ্গে গুরু-শীষ্য প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। এ পর্যন্ত আলম খান সাতবার এবং এ্যান্ড্রু কিশোর আটবার একই পুরস্কার অর্জন করেছেন। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুয়েই সময় কাটছে আলম খানের। নিজের ব্যস্ততা থেকে সময় বের করে গুরুকে দেখতে যাচ্ছেন এ্যান্ড্রু কিশোর। কাজের কারণে আলম খান এবং এ্যান্ড্রু কিশোর দুটি নাম যেন হয়ে উঠেছে একে অন্যের পরিপূরক। আর তাই গুরুর এই অসুস্থতার সময়ে আগামী নিয়েও বেশ দুশ্চিন্তায় আছেন এ্যান্ড্রু কিশোর। তবে তার বিশ্বাস দ্রুত আলম খান সুস্থ হয়ে সবার মাঝে ফিরে আসবেন। আবার নতুন চারটি গান সুরে সুরে তার কণ্ঠে তুলে দিবেন। এ্যান্ড্রু আবার গেয়ে উঠবেন। সৈয়দ শামসুল হকের বিদেহী আত্মা সেই গান শুনে শান্তি পাবেন। আমরা সেই সময়ের অপেক্ষায়। অপেক্ষায় আলম খানের সুস্থ হয়ে আমাদের মাঝে ফেরার।
 
 
ইত্তেফাক/এএসএস