সৈয়দ শামসুল হক

পরাণের গহীন ভিতর যে জন

শিল্প ও সাহিত্যের প্রায় প্রত্যেকটি শাখা তার সুদখলে ছিল। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, গান কিংবা নাটকে তিনি ছিলেন অনুসরণীয় অগ্রজ। সব্যসাচী সৈয়দ শামসুল হকের এই মৃত্যুতে আমরা একজন সত্যিকারের অভিভাবক হারিয়ে ফেললাম।

 

সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে আমার পরিচয়ের সূত্র দুইটি। এক. তিনি দেশের একজন নামকরা লেখক। সেই শৈশবেই আমার নিজ জেলা শহর জয়পুরহাটের পাবলিক লাইব্রেরির বইয়ের সারিতে তাকে প্রথম আবিষ্কার করি। সেই ‘নীল দংশন’-এর প্রতিটি পৃষ্ঠা আমার এখনো মনে আছে। এর অনেকটা পরে ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে সেই বইয়ের লেখক হয়ে গেলেন ‘হক ভাই’। আমি তখন আবৃত্তি নিয়ে আছি। সংগঠনের পাশাপাশি ‘আবৃত্তিলোক’ নামের একটি মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করি। আমার যখন ত্রাহি অবস্থা, তখন তিনি ওই দুঃসময়ে আমাকে আড়াই লক্ষ টাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। আমি যেন সবকিছু সামলে নিতে পারি। আমি সামলে নিয়েছিলাম। তিনি কত বড় মনের একজন মানুষ ছিলেন, সেটা এই ছোট্ট পরিসরে বলা সম্ভব নয়। আমি তাঁর গুলশানের বাড়িতে অনেকবারই গিয়েছি। হয়তো একটা কবিতার জন্য, নয়তো নেহাত আড্ডার লোভে। তিনি যেরকম সুন্দর লিখতেন; কথাও বলতেন গুছিয়ে, স্পষ্ট।

 

একদিন তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তাঁর কোন ধরনের লেখা আমার ভালো লাগে? আমি একটু থেমে গিয়েছিলাম। ভিতরে ভিতরে একটু ঘেমেও গিয়েছিলাম। কারণ তার সব ধরনের লেখাই তো আমি পড়েছি, পড়েছি আর মুগ্ধ হয়েছি, কোনটা রেখে কোনটা বলব? একবার মনে হয়েছে তার কবিতাই তো সেরা—‘বৈশাখে রচিত পঙিক্তমালা’, ‘পরানের গহীন ভিতর’... আহা! ‘এ বড় দারুণ বাজি, তারে কই বড় বাজিকর/ যে তার রুমাল নাড়ে পরানের গহীন ভিতর।’ হঠাত্ করেই তার ছোট গল্পের কথা মনে হলো। বিশেষ করে তার ‘মানুষ’ গল্পটি। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অবিশ্বাস নিয়ে অনবদ্য এই লেখাটি আমি অনেকবার পড়েছি। ‘আমি তো মানুষ, তাই সে আমাকে বিশ্বাস করতে পারল না।’ গল্পের শেষ লাইনে আমাদের নীতি, নৈতিকতা, আদর্শের স্খলনের বিরুদ্ধে এক তীব্র হাহাকার। নিজেকে সাহসী করে তোলে।

 

হক ভাই আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। যেন আমার উত্তরটি জানা তার একান্ত প্রয়োজন। একবার মনে হলো উপন্যাস হিসেবে ‘নিষিদ্ধ লোবান’ তো অসাধারণ! ‘খেলারাম খেলে যা’ যখন পড়েছি, সত্যি কথা বলতে একটা ধাক্কা খেয়েছিলাম, কিন্তু ততদিনে সমাজের বাস্তব অনেক চিত্রই আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে, একজন ভাষাশিল্পী হিসেবে তো তিনি সমাজকেই বলবেন। তিনি অন্ধকার দেখিয়ে আলোর দিকে যেতে বলেছেন। নাকি তাঁর নাটক ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ সেরা? নাকি ‘নরুলদীনের সারাজীবন’, ‘ঈর্ষা’ ‘গণনায়ক’? হায়! কতকিছু মনে পড়ে যাচ্ছে। ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস, দম ফুরালেই ঠুস’ কিংবা ‘চাঁদের সাথে আমি দেব না তোমার তুলনা’র মতো কালজয়ী গান যিনি লিখেছেন, সেই মানুষটি আজ আমাকে জিজ্ঞেস করছেন তার কোন ধরনের লেখা আমার ভালো লাগে? যেকোনো একটিই বলতে হবে।

 

আমি বলেছিলাম, ‘হূত্ কলমের টানে।’ সঙ্গে সঙ্গে হক ভাই আমাকে দ্বিতীয় প্রশ্ন করলেন, ‘কেন?’ আমি বললাম, ‘হক ভাই, আমার কৈশোরে দৈনিক সংবাদের ওইদিনটি জন্য অপেক্ষা করতাম, সপ্তাহ ঘুরে কখন সেইদিনটি আসবে, পত্রিকা খুলে আপনার লেখাটি পাব।’

 

হক ভাই দ্বিতীয় দফায় কফির অর্ডার দিলেন। আমি একটু লজ্জিত হয়ে বললাম, ‘আপনার অন্য লেখাও...।’ আমাকে আর শেষ করতে দিলেন না। তিনি বললেন, ‘তুমি অন্য অনেকের চাইতে আলাদা। মুখস্থ মানুষ আমার পছন্দ না। আই লাইক ইউ।’

 

হক ভাই, আমিও আপনাকে অনেক পছন্দ করি। আপনার সঙ্গে আর কখনই দেখা হবে না, এটা ভেবে আমি কষ্ট পাচ্ছি, অনেক কষ্ট। পরাণের গহীন ভিতর থেকে আপনাকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

 

লেখক নাট্যকার ও নাট্যনির্মাতা