মুক্তিযুদ্ধ আমাদের হাজার বছরের ইতিহাসের গৌরবময় অধ্যায়। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্যদিয়ে অর্জিত হয়েছে বাংলার স্বাধীনতা। বিশ্বের মানচিত্রে জায়গা করে নিয়েছে ‘বাংলাদেশ’ নামের নতুন একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। হাজারো মুক্তিকামী মানুষের আত্মত্যাগ আর সম্মানের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে এই স্বাধীনতা। বাঙালি জাতি এ অর্জনকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে প্রতিনিয়ত। তবে এই অর্জন শুধু যে গৌরবের তা নয়, বেদনারও। যদিও মহান এই সংগ্রামের মধ্যদিয়ে আমরা পেলাম মুক্ত-স্বাধীন বাংলাদেশ আর এক মহানায়ককে। যিনি তাঁর প্রজ্ঞা, চিন্তা-চেতনা ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিয়ে বাঙালি জাতিকে তুলে আনলেন ‘শেকড় থেকে শিখরে’।
একাত্তরের মহান বিজয়কে স্মরণীয় করে রাখতে দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্মাণ করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিভাস্কর্য। তেমনি বঙ্গবন্ধুকে নিয়েও তৈরি হয়েছে নানা শিল্পকর্ম। তবে সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু ও বাংলার ইতিহাসকে কেন্দ্র করে পাবনার বেড়ায় নির্মিত ‘শেকড় থেকে শিখরে’ ভাস্কর্যটি অতীতের সব ভাস্কর্যের চেয়ে বৃহত্ ও ব্যতিক্রম। ১০ ফুট উচ্চতার কংক্রিটের স্তম্ভের উপর নির্মাণ করা হয়েছে ১৮ ফুট উচ্চতার স্টেইনলেস স্টিলের তৈরি বঙ্গবন্ধুর আবক্ষ ভাস্কর্য। বাংলাদেশে স্টেইনলেস স্টিলের তৈরি এটিই বঙ্গবন্ধুর সর্ববৃহত্ আবক্ষ ভাস্কর্য। এই আবক্ষ ভাস্কর্যের দু’পাশে রয়েছে তিনটি করে অতিরিক্ত স্তম্ভ। যাতে সিমেন্ট কেটে অঙ্কিত হয়েছে ’৭৫-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতির উত্থান-পতন এবং উন্নয়নের ধারা। এছাড়া এই ভাস্কর্যের আরো একটি ব্যতিক্রম বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে মূল ভাস্কর্যের একপাশে ২৬টি কলামের একটি সীমানা বেষ্টনি, যার প্রত্যেকটি কলামে টাইলসে এনগ্রেভিং করা হয়েছে বাংলার ইতিহাস। যেখানে সংক্ষিপ্ত আকারে লিপিবদ্ধ হয়েছে সিরাজউদ্দৌলা থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ’৭৫-এর জাতির জনকের পরিবারের ঘৃণ্যতম হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত সচিত্র ইতিহাস। এসব ছাড়াও সম্মুখ দেয়ালে এই ভাস্কর্যের উদ্যোক্তা পাবনা-২ আসনের সংসদ সদস্য খন্দকার আজিজুল হক আরজুর একটি ম্যুরাল পেইন্টিং স্থাপন করা হয়েছে। এই ভাস্কর্যটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো: ছাত্র-ছাত্রী তথা যে কোনো মানুষ ভাস্কর্যটি একবার প্রদক্ষিণ করলে বাংলার ইতিহাস সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাবে।
উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বারখ্যাত বেড়া উপজেলার নগরবাড়ি ঘাটের অদূরে নাটিয়াবাড়ি নামক স্থানে নগরবাড়ি-পাবনা মহাসড়ক সংলগ্ন ধোবাখোলা করোনেশন স্কুল এন্ড কলেজের প্রধান ফটকের পাশে স্থানীয় সংসদ সদস্য খন্দকার আজিজুল হক আরজু ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি ভাস্কর্য নির্মাণের উদ্যোগ নেন এবং তরুণ শিল্পী বিপ্লব দত্তকে নকশা তৈরির জন্য বলেন। শিল্পী বিপ্লব দত্ত প্রায় দেড় বছর নিরলস পরিশ্রমের পর নির্মাণ করেন বহুমাতৃক ও বৈচিত্র্যপূর্ণ এ ভাস্কর্যটি। এ প্রসঙ্গে স্থপতি বিপ্লব দত্ত বলেন, নতুন প্রজন্ম বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম দেখেনি। বই পড়ে, বড়দের কাছে গল্প শুনে মনের ভেতরে একটা আবছা ছবি তৈরি করেছে স্বাধীনতা নিয়ে। তাই বাংলার সঠিক ইতিহাস ও সংগ্রামের বিভিন্ন দিক বিশেষভাবে তুলে ধরাই এই ভাস্কর্যের মূল লক্ষ্য।
উদ্যোক্তা খন্দকার আজিজুল হক আরজু এমপি বলেন, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় সাম্প্রতিককালের ঘটনা হলেও এর পেছনে রয়েছে এক গৌরবময় দীর্ঘ ইতিহাস। ভাষা-সভ্যতা-সংস্কৃতি সর্বোপরি আমাদের জীবনমুখিতাই আমাদেরকে আপন পায়ে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করেছে, শেকড় থেকে শিখরে ওঠার প্রেরণা দিয়েছে। বাংলার মানুষের জন্মকথা, প্রাচীন, মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগের নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহ, বাঙালির শিক্ষা-সংস্কৃতি-শিল্পকলা-নানা ধর্মের বিকাশ ও বিস্তার, অসামপ্রদায়িক জীবনচর্চা, ঊনিশ শতকের হিন্দু-মুসলিম সমাজ সংস্কার, ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন, ভারত-পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম, ভাষার জন্য লড়াই, স্বায়ত্তশাসনের জন্য সংগ্রাম, গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় সবকিছুর ধারাবাহিক উপস্থিতি আছে এই শিল্পকর্মটিতে। তাই নতুন প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা দেবার জন্য এটি একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে নির্মাণ করা হয়েছে।
ইত্তেফাক/এএন