রাজধানীর অনেক এলাকাতেই পানির কষ্ট আছে। পানির দাবিতে কলসি, বালতি আর পাতিল নিয়ে মিছিলও হয়! এসব পুরনো কথা। তবে মজার বিষয়, রাজধানীর বংশাল এলাকার বাসিন্দাদের পানির জন্য হাহাকার নেই। কেননা তাদের আছে বংশাল পুকুর। এটি জনতার পুকুর হিসেবেও পরিচিত।
এই পুকুরের স্বচ্ছ জল দেখে মুগ্ধ হতে হয়। পুকুরের চারপাশে সবুজের সমারোহ। গাছের ছায়ায় নৈসর্গিক এক সৌন্দর্য। নগরবাসীর মন ভালো করে দেয়ার মতো এক পুকুর। ১৭৬ বছরের পুরনো এই পুকুর ইতিহাসের সাক্ষী।
পুকুরটির আয়তন ছয় বিঘা। ১৮৪০ সালের দিকে এটি খনন করা হয়। এলাকাবাসীর পানি সমস্যা সমাধানে বংশালের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও জমিদার হাজী বদরুদ্দীন ভুট্টো এটি খনন করেন। প্রায় ৪০০ ফুট লম্বা ও ২৫০ ফুট চওড়া এ পুকুরটির গভীরতা প্রায় ২০ ফুট। পুকুরটির চারদিকে পাকা বেষ্টনী ও রাস্তা।
রাস্তার পাশ ধরে পুকুরের চারদিকে সারিবদ্ধভাবে লাগানো আছে নারিকেল গাছসহ অন্যান্য গাছ। গাছ ও স্বচ্ছ পানির কারণে পুকুরের চারদিকেই বিরাজ করছে ঠাণ্ডা আমেজ। এই পুকুরের রয়েছে দুইটি বাঁধানো ঘাট। এখানে বসানো হয়েছে টোল ব্যবস্থা। প্রতিবার গোসলের জন্য প্রত্যেককে দিতে হয় তিন টাকা।
এই পুকুরের ধারে রয়েছে ব্যায়ামের ব্যবস্থাও। পরিবেশ নিয়ে কাজ করছেন সাইফুল আলম শোভন। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ব্যায়াম, বিনোদন, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ সবই সম্ভব মাত্র তিন টাকায়। এটি কেবল বংশাল পঞ্চায়েত কমিটির পুকরেই সম্ভব।
তিনি বলেন, এই পুকুর এখন হাজার হাজার মানুষের বিনোদনের স্থান। দল বেঁধে যুবক, শিশু-কিশোর-বৃদ্ধরা সেখানে গিয়ে প্রাণ জুড়ায়। সন্ধ্যায় পুকুরের পাড় ঘিরে চলে আড্ডা। আশপাশের বাড়িগুলোও তৈরি করা হয়েছে পুকুরের দিকে মুখ করে। যেন সবাই এই পুকুরের শীতল ছোঁয়া চায়!
ভুট্টো হাজীর বংশধরদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিদিন প্রায় আড়াই থেকে তিন হাজার লোক এই পুকুরে গোসল করছে। পুরনো ঢাকার ঐতিহ্যের পঞ্চায়েত কমিটির মাধ্যমে এই পুকুরটি রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়।
এই ভুট্টো হাজীই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে শিল্প আন্দোলন, সমাজসেবা, জনহিতকর কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অনেক কীর্তি রেখে গেছেন। চামড়ার ব্যবসা করে অঢেল সম্পদের মালিক হলেও তার বেশিরভাগই ব্যয় করেছেন জনহিতকর কাজে। এক সময় ঢাকায় চামড়া ব্যবসার নিয়ন্ত্রক ছিলেন। ঢাকার নবাব খাজা আলীমুল্লাহ ও খাজা আব্দুল গনির চামড়ার ব্যবসা কিনে নিয়েছিলেন। তখন তার অংশীদার ছিলেন ইংরেজ ব্যবসায়ী লেজারস। তার সঙ্গে ভুট্টো হাজী পাট ব্যবসাও করেছেন।
মুহাম্মদ আব্দুর রহমানের লেখা ‘মর্দি মুজাহিদ হাজী বদরুদ্দনী’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, নবাব আব্দুল গনি বাংলার লাটকে বুড়িগঙ্গায় এক জাহাজে সংবর্ধনা দেয়ার সময় ভুট্টো হাজী মেহমান হিসেবে সেখানে যান। নদীর তীরেই বাকল্যান্ড বাঁধের জন্য টাকা তোলা হলে ভুট্টো হাজী ১০ হাজার টাকা দান করেন। তখন বড়লাট মুগ্ধ হয়ে তার সম্পর্কে জানতে চান। জানতে পারেন, এই ভুট্টো হাজীই ইংরেজবিরোধী আন্দোলনে জড়িত এবং তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা আছে। কিন্তু তার ব্যবহার ও দানশীলতায় মুগ্ধ হয়ে বড়লাট সব অভিযোগ তুলে নেন!