আমি এখনো বুঝতে পারছি না তিনি আছেন নাকি নেই। তিনি সবসময় কবিতার মধ্যে থাকতেন। মৃত্যুর মুখোমুখি থেকেও তিনি লিখে গেছেন। মৃত্যুর আগে অনেকটা ঘোরের মধ্যে ছিলেন। হাসপাতালের বেডে মাত্র ১৭ দিনে ‘হ্যামলেট’ অনুবাদ করেছিলেন। ইউনাইটেড হাসপাতালে যেয়ে শেষ গল্পটা লিখে আমাকে উত্সর্গ করেছিলেন’ সৈয়দ শামসুল হক স্মরণ সভায় স্মৃতিচারণ করতে এসে কবির সহধর্মিণী আনোয়ারা সৈয়দ হক বলছিলেন এভাবেই। তিনি বলেন, কখনোই ভাবিনি তিনি থাকবেন না আর আমাকে তার স্মৃতিচারণ করতে হবে। তাঁর জীবনীশক্তি আমার চেয়ে বেশি ছিল। নতুন একটা সিরিজ শুরু করেছিলেন ‘ভাবনার ডানা’ নামে। শেষদিকে তিনি যখন আর লিখতে পারছিলেন না তখন অনুলিখন করাতেন। শেষ যোদ্ধা নামে একটি নাটক লিখছিলেন। অনেক কবিতা, গল্প, লিখতে চেয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরী চত্বরে উন্মুক্ত মঞ্চে গতকাল জাতীয় কবিতা পরিষদ সৈয়দ শামসুল হক স্মরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সৈয়দ শামসুল হক ছিলেন জাতীয় কবিতা পরিষদের অন্যতম প্রাণপুরুষ।
প্রকৃতি গুমোট। গতকাল সারাদিনই থেমে থেমে বৃষ্টি ঝরছে। প্রকৃতিও যেন প্রিয় মানুষটির জন্য শোক করছে। লাইব্রেরী চত্বরের রেইন্ট্রি তলায় এই প্রাঙ্গণে গত কয়েক দশক ধরে প্রতিবছর কবিতা উত্সবে অংশ নিয়েছেন সৈয়দ হক। তাঁর স্মৃতিগন্ধমাখা সেই স্থানে সৈয়দ শামসুল হকের কবিতার উচ্চারণে, ঘনিষ্ঠজনদের স্মৃতিচারণায় ফিরে ফিরে এলেন সব্যসাচী।
সৈয়দ হকের স্ত্রীর কথা, স্মৃতিচারণা পুরো চত্বরের বাতাস ভারি করে তুলেছিল। এরপরে কবির ছেলে ও মেয়েও স্মরণ করলেন তাদের পিতাকে। মেয়ে বিদিতা সৈয়দ হক বলেন, আমার শোক দুই ভাগে। একটা হচ্ছে লেখকের জন্য, যিনি খুব বড় মাপের লেখক ছিলেন। আরেকটি দিক হচ্ছে বাবার প্রতি শোক। যে বাবা আমাকে জীবন চিনিয়েছেন, যাকে আমি আর কখনো দেখব না। এই কষ্ট আমি কাটাতে পারছি না। তিনি রবার্ট ফ্রস্টের কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে বলতেন, যে রাস্তায় কেউ যেতে চায় না, তুমি সেই রাস্তায় বুক উঁচিয়ে হেঁটে যাবে।
ছেলে দ্বিতীয় সৈয়দ হক বলেন, ‘এ বড় দারুণ বাজি তারে কই বড় বাজিকর’- আমার বাবাই যেন সেই বড় বাজিকর। যার লেখা মানুষের মনে ছড়িয়ে দিয়েছেন বাজিকরের মত। যিনি বাংলা সাহিত্যের ভূগোল বদলে দিয়েছেন। তার জীবনটাই যেন এক মহাকাব্য। আজকের এ আয়োজন দেখে ভালো লাগছে। সবুজ প্রকৃতির মাঝে সবুজ ব্যাকড্রপ মন ভালো করে দিয়েছে। সবখানে কালো রং দিয়ে আব্বার ছবি। ভালো লাগে না। জীবন বহমান। বাবা বেঁচে থাকবেন তার লেখায়।
গতকাল এ স্মরণ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি মুহাম্মদ সামাদ। স্মৃতিচারণে অংশ নেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, কবি ও স্থপতি রবিউল হুসাইন, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ, কবি রবীন্দ্র গোপ, ছড়াকার আসলাম সানী, কথাসাহিত্যিক ও মনোবিজ্ঞানী মোহিত কামাল, গণসঙ্গীত শিল্পী ফকির আলমগীর, রাজনীতিক সুভাষ সিংহ রায়, জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি ওসমান গনি, লেখক আহমেদ মাযহার, অন্যপ্রকাশের অন্যতম প্রকাশক মাজহারুল ইসলাম প্রমুখ।
স্বাগত বক্তব্য রাখেন কবিতা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক তারিক সুজাত। জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান। শুরুটা ছিল রবীন্দ্রসঙ্গীত দিয়ে। শিল্পী লিলি ইসলাম গেয়ে শোনান ‘তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে’।
রামেন্দু মজুমদার বলেন, আমরা আশ্রয়হীন হয়ে গেলাম। সংশয়ে, বেদনায়, আনন্দে যাঁর কাছে যাওয়া যেত, আশার বাণী শোনা যেত সেই মানুষটিকে আর পাব না। বড় মাপের লেখক ছিলেন সৈয়দ হক। রচনাশৈলী, বাক্যগঠন প্রক্রিয়া, নতুন নতুন শব্দ গঠন দিয়ে নিজস্ব গদ্য ভাষার জন্ম দিয়েছেন। বাংলা সাহিত্যে তিনি অমর হয়ে থাকবেন।
কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি মুহাম্মদ সামাদ বলেন, সৃজনশীল সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরে পুরোধা ব্যক্তিত্ব বুদ্ধদেব বসু এবং সৈয়দ শামসুল হক। তিনি সাহিত্যের শিক্ষকও বটে।
সৈয়দ শামসুল হককে নিবেদন করে স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন কবিকুল। স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন আমিনুর রহমান সুলতান, শিল্পী বুলবুল মহলানবীশ, কবি আসাদ মান্নান, রেজাউদ্দিন স্ট্যালিন, দিলারা হাফিজ, জাহিদুল হক প্রমুখ।
ইত্তেফাক/এএন