১০ টাকার চাল বিক্রিতে অনিয়মের অভিযোগ

দেশের বিভিন্ন স্থানে হতদরিদ্রদের জন্য সরকার ঘোষিত ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রিতে কার্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ ও সচ্ছল পরিবারকে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
 
নন্দীগ্রামে চাল বিক্রিতে স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণ
 
বগুড়ার নন্দীগ্রামে ১০ টাকার চাল নিয়ে স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ ও সচ্ছল পরিবারকে কার্ড দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সারাদেশের মতো নন্দীগ্রাম উপজেলায় সাত হাজার ৫২৮ পরিবারকে হতদরিদ্রের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ১০ টাকা কেজি দরের চাল দেওয়া হচ্ছে।
 
অভিযোগ পাওয়া যায়, উপজেলা ভাটগ্রাম ইউনিয়নের বর্তমান ইউপি সদস্য আব্দুস সালাম ও বুড়ইল ইউনিয়নের সোহাগী পাড়ার বৃত্তবান ডলি খাতুন ১০ টাকা কেজি দরের চালের কার্ড পেয়েছে। কিন্তু উপজেলার বুড়ইল ইউনিয়নের মুরাদপুর গ্রামে সরকারিভাবে গড়ে ওঠা গুচ্ছ গ্রামের ভিক্ষুক বাহের আলী,  খুকি রানী, সেলি রানী, জরিনা বেওয়া, প্রতিবন্ধী রোকেয়াসহ মুরাদপুর গুচ্ছ গ্রামের ৫০টি পরিবার ১০ টাকা কেজি দরে চালের কার্ড পাননি। সরকারের চাল যাচ্ছে বৃত্তবানদের ঘরে।
 
খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় নেই গুচ্ছ গ্রামের ৫০টি ভূমিহীন পরিবার। কাজের অভাবে এই গুচ্ছ গ্রামের প্রায় দুইশ জন মানুষের দিন কাটে অনাহারে। মাথা গোঁজার ঠাঁই মিললেও ভালো নেই এই মুরাদপুর গুচ্ছ গ্রামের মানুষরা। কোনো মতে খেয়ে-পরে টিকে আছে তারা।
 
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সরকারিভাবে এই ৫০টি পরিবারকে টিন দ্বারা ঘর তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। পুরুষরা দিনমজুর আর মহিলারা গ্রামের বৃত্তবানদের বাড়িতে ঝি-এর কাজ করে জীবন-যাপন করে।
 
গুচ্ছ গ্রামের সভানেত্রী জামফুলি জানান, সরকারের একান্ত সহযোগিতায় আমাদের মত বাস্তুহারা মানুষের মাথা গোঁজার মত ঠাঁই পেলেও আমরা সরকারের পক্ষ থেকে আসা বিনামূল্যের অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাদের অভিযোগ চেয়ারম্যার ও স্থানীয় ইউপি সদস্য আমাদের কোনো খোঁজ-খবর রাখে না। গ্রামের অনেক বৃত্তবানদের নামে ১০ টাকা কেজি দরে চালের কার্ড করে দিলেও আমাদের নামে কার্ড করা হয়নি। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা কার্ডের জন্য তাদের নিকট গেলে বলে পরে দেওয়া হবে। আর কত দিন পরে আমাদের দেওয়া হবে ১০ টাকা কেজি দরে চালের কার্ড। বিষয়টি নিয়ে হতদরিদ্রদের মাঝে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
 
বুড়ইল ইউপি চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মাদ বলেন, মেম্বাররা তালিকা করেছেন। কার্ডে কিছুটা গড়মিল থাকতেও পারে। আগামীতে প্রকৃত দরিদ্রদেরই এই চাল দেওয়া হবে।
 
ইউপি সদস্য খয়বর আলী জানান, আমার ওয়ার্ডে পাঁচশ জনেরও বেশি গরিব মানুষ। কার্ড পেয়েছি মাত্র একশ। এ জন্য আমি ভোটার তালিকা দেখে কার্ড তৈরি করেছি। বাকিদের পরে দেওয়া হবে। বৃত্তবানদের কার্ড দেওয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন ভুলে তাদের নামে কার্ড হয়েছে।
 
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোসা. শরীফুন্নেসা জানান, দারিদ্র্য বিমোচনে বর্তমান সরকারের একটা মহতি পদক্ষেপ। এ ক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
 
চাল বিক্রি ও কার্ড বিতরণে অনিয়ম! ইউপি সদস্যসহ ৫ জনকে আটক
 
জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলায় ১০ টাকা কেজি চাল বিতরণের সময় বিক্রির অভিযোগে চারজনকে ও স্বাবলম্বী ও সম্পদশালীদের মাঝে কার্ড বিতরণের অভিযোগে ইউপি সদস্যসহ মোট পাঁচজনকে আটক করেছে থানা পুলিশ।
 
পাঁচবিবি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আশরাফুল ইসলাম জানান, শুক্রবার সকাল থেকে স্থানীয় আটাপুর ইউনিয়ন পরিষদে হতদরিদ্রদের মাঝে ১০ টাকা মূল্যে চাল বিতরণ কর্মসূচি চলছিল। চাল বিক্রির অভিযোগে সেখান থেকে সকাল ১১টার দিকে চারজনকে আটক করে পুলিশ। আটককৃতরা হলো আটাপুর গ্রামের আমিনুল ইসলাম, জুয়েল হোসেন, আংড়া গ্রামের আমেনা বেগম ও বাজিতপুর গ্রামের সোহেল রানা। এ সময় বিক্রি করা ১২ মণ চালও উদ্ধার করা হয়। তবে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে চাল ক্রেতা পালিয়ে যাওয়ায় তাকে পুলিশ আটক করতে পারেনি।
 
অপরদিকে ১০ টাকা কেজি দরে চালের কার্ড ও চাল বিতরণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে উপজেলার আওলাই ইউপি সদস্য আব্দুল খালেককে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ভারাহুত নয়াপাড়া গ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
 
পাঁচবিবি উপজেলা নির্বাহী অফিসার নূরউদ্দিন আল ফারুক জানান, দরিদ্র জনসাধারণের জন্য কেজিপ্রতি ১০ টাকার চাল বিতরণের জন্য আওলাই ইউপি মেম্বার আব্দুল খালেক তালিকা চূড়ান্ত করেন। ওই তালিকা অনুযায়ী তিনি চাল গ্রহণের কার্ডও বিতরণ করেন। কার্ডধারীদের মধ্যে অনেকে স্বাবলম্বী ও সম্পদশালী। এমনকি নাশকতা মামলার আসামিও স্থান পায়। এতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ গেলে তদন্তে ইউপি মেম্বারের দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়টি ধরা পড়লে তার বিরুদ্ধে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক তৌহিদুর রহমান বাদী হয়ে থানায় মামলা করলে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। 
 
চেয়ারম্যানকে হুমকির প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন
 
জেলার পাঁচবিবি উপজেলার আওলাই ইউনিয়নে ১০ টাকা কেজি চালের তালিকায় শিক্ষক, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী ও বিত্তবানদের নাম রয়েছে। সাবেক চেয়ারম্যান একরামূল হক তাওহীদের তালিকা সংশোধনের জন্য আওলাই ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক মণ্ডল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে আবেদন জানান। এ ঘটনার প্রেক্ষিতে সাবেক চেয়ারম্যান একরামূর হক চৌধুরী তাওহীদের মেয়াদের তালিকায় শিক্ষক ও বিত্তবানদের নাম অন্তর্ভুক্ত করে সেই দায় বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক মন্ডলের কাঁধে চাপিয়ে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে হয়রানি ও হুমকি দেওয়ার প্রতিবাদে গত শুক্রবার সন্ধ্যায় ছাতিনালী বাজারে তার নিজ বাসভবনে সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করেন চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক মণ্ডল। তিনি বলেন, আমি গত ১৪ আগস্ট চেয়ারম্যানের দায়িত্বভার গ্রহণ করি। দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে ১০ টাকা কেজি চালের জন্য সাবেক চেয়ারম্যান এক হাজার লোকের তালিকা তৈরি করেন তড়িঘড়ি। সে তালিকার মধ্যে শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ নামই বিত্তবান ও চাকরিজীবীর রয়েছে।
 
পরে তাদের তালিকায় সামান্য কিছু সংশোধন করে খাদ্য নিয়ন্ত্রক বরাবর প্রেরণ করি। এরপরও অভিযোগ উঠলে সম্পূর্ণ তালিকা সংশোধনের জন্য গত ৫ অক্টোবর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নূরউদ্দিন আল ফারুকের বরাবর আবেদন করেছি এবং তিনি আমাকে সংশোধনের অনুমতি দিয়েছেন। ফলে বর্তমানে হুমকি-ধামকিতে আমি নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছি। সংবাদ সম্মেলনে এ সময় উপস্থিত ছিলেন ৪ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য, ছেকেন্দার আলী, সমাজসেবক আফজাল হোসেনসহ ইউনিয়নের অর্ধ শতাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি।
 

ইত্তেফাক/এএন