নওগাঁর সরকারের ‘খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচির’ আওতায় হতদরিদ্রদের মাঝে ১০ টাকা কেজি চাল বিতরণে দলীয় নেতা-কর্মী ও চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, চেয়ারম্যান-মেম্বার ও অর্থবিত্তবানদের ঘরে যাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে হাজারো প্রকৃত হতদরিদ্ররা তাদের প্রাপ্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আবার যারা চাল পাচ্ছেন তাদেরকে ২-৩ কেজি করে ওজনে কম দেওয়া হচ্ছে। এ নিয়ে জেলার ১১টি উপজেলায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। এলাকাবাসীরা ঊধ্বর্তন কর্তৃপক্ষের কাছে নতুন করে তদন্তের মাধ্যমে তালিকা তৈরির দাবি জানিয়েছেন।
বদলগাছী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হুসাইন শওকত জানান, শুক্রবার বিকালে বদলগাছীতে চাল বিতরণ চলছিল। এ সময় তিনি উপজেলার পাহাড়পুর ইউনিয়নের দাড়িশন গ্রামের ডিলার ওবায়দুর রহমানের দোকানে যান। গিয়ে চাল কম দেওয়ার সত্যতা পাওয়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালতে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। এ ছাড়াও ঐ ডিলারের চাল ওজন দানকারী রুহুল আমিনকে ভ্রাম্যমাণ আদালতে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দিয়ে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।
বদলগাছী উপজেলা খাদ্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, সদর উপজেলার হতদরিদ্র পরিবারের ৯৯৪ জনের একটি তালিকা করে উপজেলা খাদ্য অফিসে দেওয়া হয়েছে। তালিকায় অধিকাংশ নাম রয়েছে চেয়ারম্যান-মেম্বার, ক্ষমতাসীন, দলীয় নেতাকর্মী, অর্থবৃত্তশালী, আত্মীয়-স্বজনের। আর যাদের নামে কার্ড দেওয়া হয়েছে এদের মধ্যে রয়েছেন অধিকাংশ সচ্ছল, পাকা বাড়ি, বয়স্ক ভাতা ও ভিজিডি প্রাপ্ত এবং চাকরিজীবী। এ ছাড়াও একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নামেও কার্ড দেওয়া হয়েছে। আবার অনেক হতদরিদ্র ব্যক্তির নাম তালিকায় থাকলেও স্বজনপ্রীতির কারণে তা কেটে দেওয়া হয়েছে অন্যজনকে।
এমন তালিকায় নাম রয়েছে আধাইপুর ইউপির ৭নং ওয়ার্ডের সত্যপাড়া গ্রামের রিংকোন হোসেনের যার পাকা বাড়ি ৮-১০ বিঘা জমি, একটি বড় মুদি দোকান ও একটি রাইসমিল রয়েছে। স্বজনপ্রীতির কারণে এই কার্ডটি দিয়েছেন ঐ ওয়ার্ডের মহিলা মেম্বার সাবিনা ইয়াসমিন । এ ছাড়াও তিনি তার আপন দেবর বেগুনজোয়ার গ্রামের উজ্জল হোসেনের নামে কার্ড দিয়েছেন অথচ তার দোতলা পাকা বাড়ি ও ৫-৭ বিঘা জমি আছে। আবার একই ওয়ার্ডের তিলাবদলী গ্রামের জাহেরা বিবি ও তছির উদ্দীনের নাম থাকলেও কার্ড পায়নি তারা।
উপজেলার মথুরাপুর ইউনিয়নের পশ্চিম দুর্গাপুর গ্রামের আব্দুল গফুর মণ্ডলের ছেলে গোবর চাঁপা বাজারের ব্যবসায়ী এবং বিলাসবহুল দ্বিতল ভবনের মালিক আমিনুর রহমান ওরফে পটুর নাম হতদরিদ্র খাদ্য বান্ধব কর্মসূচির ১০ টাকা কেজি চাল ক্রয়ের জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়। ওই ইউপির চৌকিদার হতদরিদ্রের তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের কার্ড বিতরণের সময় দ্বিতল ভবনের নাম প্রকাশ হয়ে পড়ে। পটু চাল উত্তোলন না করে তার এক ভাগিনাকে দিয়ে চাল উত্তোলন করেছেন। এভাবে হতদরিদ্র পরিবার ন্যায্যঅধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
আমিনুর রহমান ওরফে পটু জানান, কে বা কারা তার নাম তালিকাভুক্ত করেছেন সে জানে না বলে দাবি করেন।
মথুরাপুর ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান জানান, যে ব্যক্তি তার নাম তালিকাভুক্ত করেছে জানতে পারলে তার ব্যবস্থা আমি নিজেই করতাম।
এ ছাড়া বিলাশবাড়ি ইউপির ১নং ওয়ার্ডের মেম্বার হলুদ বিহার গ্রামের দেলোয়ার হোসেন দুলুর বাবা গিয়াস উদ্দিন এবং মা জাহেরা দুজনের নামেই কার্ড দিয়েছেন তিনি। গিয়াস উদ্দিনের বয়স্ক ভাতার কার্ড রয়েছে। আবার একই গ্রামের আদমের রয়েছে ইটের পাকা বাড়ি এবং জমির পরিমাণ প্রায় ছয় বিঘা। মুক্তিযোদ্ধা আজিজারের তিন ছেলে চাকরি করেন। দলীয় নীতিতে কার্ড পেয়েছেন রিপন। তার ইটের বাড়ি এবং জমি রয়েছে প্রায় ১২ বিঘার মতো। কোলা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ফিরোজ আলম এবং দ্বীপগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক জিয়া। আরেক সচ্ছল পরিবার এবং ছেলে সেনাবাহিনীতে চাকরি করেন।
কাশিমালা গ্রামের বেগম, সানজিদা, উজ্জল, রাসেল, কিনা, আলাউদ্দিন, রশিদ, ফজলুর সচ্ছল পরিবার, অনেকের ইটের বাড়ি আছে এবং চাকরি করেন। এরা কার্ড পেয়েছে দলীয় নেতা-কর্মীদের স্বজনপ্রীতিতে। দুধকুড়ি গ্রামের মানিক হোসেন ও নুরুজ্জামান সচ্ছল পরিবার এবং ইটের বাড়ি আছে। এ ছাড়াও তালিকায় রয়েছে একাধিক নাম ও ভুয়া নাম। আর ভুয়া নামের কার্ডের ব্যক্তিদের এলাকাবাসী চেনেনও না। তালিকায় যাদের একাধিক নাম রয়েছে তারা দুবার চাল নিয়েছেন। আবার যাদের ভুয়া নামে আছে তাদের কার্ড নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, সদস্য ও দলীয় নেতা-কর্মীরা চাল উত্তোলন করে আত্মসাত্ করছেন।
হলুদ বিহার গ্রামের হতদরিদ্র লুত্ফর রহমান জানান, জোড়াতালি দেওয়া টিনের ছাপড়ার ঘরে থাকি। প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি ও ছোট মেয়েকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়িয়েছি। অন্যের বাড়িতে দিনমজুরির কাজ না করলে দিন চলে না। অথচ আমার মতো অনেকেই ১০ টাকা কেজি দরে চালের কার্ড না দিয়ে যারা চেয়ারম্যান ও মেম্বারের পিছনে কাজ করেছেন তাদের কার্ড করে দেওয়া হয়েছে।
বিলাশবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান কেটু বলেন, আমি বিরোধী দলের চেয়ারম্যান। দায়িত্ব গ্রহণ করার পর ১ হাজার জনের একটি তালিকা পেয়েছি। যেটা আগের চেয়ারম্যান তৈরি করেছিলেন। সেখানে তাদের দলীয় নেতা-কর্মীদের নাম রয়েছে। কার্ড দেওয়ার নামে তারা অনেকের কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়েছেন বলে শুনেছি। তারা অনুরোধ করায় তালিকায় স্বাক্ষর করেছি। তবে তালিকা থেকে অধিকাংশ প্রকৃত হতদরিদ্র বাদ পড়েছেন।
রাণীনগর উপজেলার মধ্য রাজাপুর গ্রামের নিঃস্ব বিলকিস বেগম। দেবর/ভাশুরের জায়গায় ছোট এক মেয়েকে নিয়ে বসবাস করছেন। খেয়ে না খেয়ে কোনো রকমে দিন চলছে তার। হতদরিদ্রদের তালিকায় স্থান হলেও স্থান পায়নি এই হতদরিদ্রের কার্ড।
মেম্বার সাইফুল ইসলাম জানান, বর্তমানে বিলকিসের মতো এতিম এবং অসহায় মানুষ রাণীনগর উপজেলার মধ্যে দ্বিতীয়টি নেই। তার পরেও তার নাম তালিকায় না আসা দুঃখজনক ঘটনা।
উপজেলার একডালা ইউনিয়নে চাল ডিলার আব্দুল মালেককে চাল কম দেওয়ার অভিযোগে গত শনিবার দুপুরে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
নিয়ামতপুরেও শ্রীমন্তপুরে ইউপির রামকুড়া গ্রামের ডিলার মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রিতে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জেলা প্রশাসক ড. আমিনুর রহমান জানান, বর্তমান সরকারের নির্দেশে ইতোমধ্যে এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসনকে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেউ স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ বা কোন ধরনের অনিয়ম করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
চাটমোহরে চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ
চাটমোহর (পাবনা) জানান, চাটমোহরে ১০ টাকার চাল নিয়ে স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ ও স্বচ্ছল পরিবারকে কার্ড দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ উপজেলায় ১১ হাজার ১৫৪টি পরিবারকে হত দরিদ্রের খাদ্য বান্ধব কর্মসূচির আওতায় ১০ টাকা কেজি দরে চাল দেওয়া হচ্ছে। ইতোপূর্বে ১০ টাকা কেজি দরের চাল কালো বাজারে বিক্রি করার দায়ে ফৈলজানা ইউনিয়নের ডিলার আওয়ামী লীগ নেতা আ. সালামের ডিলারশীপ বাতিল ও জামানত বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
অভিযোগ পাওয়া গেছে, উপজেলার গুনাইগাছা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. নুরুল ইসলামের নির্দেশে দুই একজন ইউপি সদস্য ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি-সম্পাদক স্বচ্ছল ব্যক্তিদের ১০ টাকা কেজি দরের চালের কার্ড দিয়েছেন। অথচ হতদরিদ্ররা চেয়ারম্যানের কাছে ঘুরে ঘুরেও কার্ড পায়নি। সরকারের চাল চলে যাচ্ছে বিত্তবানদের ঘরে। বিত্তবানরা কার্ডের চাল পাওয়ার পর দ্বিগুণ দামে তা বিক্রি করে দিচ্ছে।
গুনাইগাছা ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ নেতা ও বিগত ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী রজব আলী বাবলু অভিযোগ করেন, ১০ টাকা দরের চাল চেয়ারম্যান হতদরিদ্রদের না দিয়ে তার পছন্দের বিত্তবানদের দিয়েছেন। এই ইউনিয়নের জালেশ্বর, চরপাড়া, জাবরকোল, গুনাইগাছাসহ বিভিন্ন গ্রামের শতাধিক হতদরিদ্র পরিবার সরকারের এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। চরপাড়া গ্রামের বিত্তবানরা চাল পেলেও চাল পায়নি প্রতিবন্ধী আলামিন কিংবা তার হতদরিদ্র মা আলেয়াসহ অনেকেই। বিষয়টি নিয়ে হতদরিদ্র পরিবারের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে। শুধু গুনাইগাছাতেই নয় উপজেলার ১১টি ইউনিয়নেই কমবেশী বিত্তবানরা চালের কার্ড পেয়েছেন। এতে চালের কালোবাজারীরা আরেক দফা হাতিয়ে নিচ্ছেন কালো টাকা। কারণ বিত্তবানরা চাল পাওয়া মাত্র তা বিক্রি করছেন চিহ্নিত কালোবাজারীদের কাছে।
এ ব্যাপারে গুনাইগাছা ইউপি চেয়ারম্যান মো. নুরুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বেগম শেহেলী লায়লা জানান, অভিযোগ পেলেই তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
বগুড়ায় ১১৪০ কেজি চালসহ ভটভটি চালক আটক
বগুড়া অফিস জানায়, বগুড়ার গাবতলী থানা পুলিশ শনিবার সন্ধ্যায় দাঁড়াইল বাজার এলাকা থেকে ভটভটি বোঝাই এক হাজার ১৪০ কেজি চালসহ চালক বাবুল হোসেনকে আটক করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই চাল কার্ডধারী দুস্থদের কাছ থেকে কেনা হয়েছে। এ ঘটনায় ইউএনও তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
রবিবার সকালে গাবতলী থানার এএসআই মাহবুব হোসেন জানান, ‘শনিবার সন্ধ্যার দিকে উপজেলার দাঁড়াইল বাজার এলাকা থেকে ভটভটি বোঝাই ২৩ বস্তা চাল উদ্ধার ও চালক ফুলবাড়ি দক্ষিণপাড়ার পিন্টু মিয়ার ছেলে বাবুল হোসেনকে আটক করা হয়েছে।’ কামাল পাশা চালের বস্তাগুলো গাবতলী পুরানবাজার এলাকার মেসার্স জেকে কৃষি কল্যাণ নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পাঠান। ভটভটি চালকের কাছে থাকা একটি চিরকুটে মোবাইল ফোন নম্বর ও ২৩ বস্তায় মোট এক হাজার ১৪০ কেজি চাল থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। চাল ও ভটভটি গাবতলী থানায় রয়েছে।’ গাবতলী থানার ওসি শাহীদ মাহমুদ খান দুস্থদের চাল জব্দের সত্যতা নিশ্চিত করলেও কাউকে আটক করার কথা অস্বীকার করেন।
গাবতলী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুহম্মদ আহসান হাবিব বলেন, ‘কার্ডধারীরা চালগুলো বিক্রি করে দিয়েছেন। পুলিশ ওই চাল আটক করেছে।’ ‘চালের ক্রেতাকে খোঁজা হচ্ছে। তাকে পেলে ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা দেওয়া হবে। এর সাথে ডিলারের সম্পৃক্ততা পেলে তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে।’
ইত্তেফাক/এএন