অংশীদারিত্বের নতুন উচ্চতায় বাংলাদেশ ও চীন। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুদেশের ঐতিহাসিক বন্ধন ও অংশীদারিত্বমূলক সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে একমত হয়েছেন। দুদেশের জনগণের আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির লক্ষ্যে একযোগে কাজ করতে একমত হন দুই নেতা। সেজন্য ঘনিষ্ঠ সমন্বিত সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্বকে ‘সহযোগিতার জন্য কৌশলগত অংশীদারিত্বে’ উন্নীত করার কথা জানান শেখ হাসিনা ও শি জিনপিং।
দুদিনের সফরে শুক্রবার সকালে ঢাকায় এসে পৌঁছলে চীনা প্রেসিডেন্টকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও লালগালিচা সংবর্ধনা দিয়ে বরণ করে বাংলাদেশ। বিকালে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা এবং বাণিজ্য, বিনিয়োগ অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য ২০ মার্কিন বিলিয়ন ডলার মূল্যমানের ২৭টি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয় দুই দেশের মধ্যে।
চীনা প্রেসিডেন্ট হোটেল লা মেরিডিয়ান থেকে বেলা তিনটায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এসে পৌঁছলে তাকে অভ্যর্থনা জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ‘শিমুল’ কক্ষে দুই প্রধানমন্ত্রী কিছুক্ষণ একান্ত বৈঠক করেন। বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয় ‘চামেলী’ কক্ষে। এখানে দুপক্ষের আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বাংলাদেশ পক্ষে অর্থমন্ত্রী এএমএ মুহিত, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে চীনা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ছিলেন সেদেশের বাণিজ্য, পররাষ্ট্র, অর্থমন্ত্রীসহ কয়েকজন নীতি-নির্ধারক। দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শেষে দুই নেতার উপস্থিতিতে ১৫টি সমঝোতা স্মারক ও ১২টি ঋণ রূপরেখা চুক্তি সই হয়। এছাড়া চীনা অর্থায়নে ছয়টি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন করেন শেখ হাসিনা ও শি জিনপিং।
দুই নেতা এরপর সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন। শি জিনপিং অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে বলেন, ছয় বছর পর বাংলাদেশের মতো একটি সুন্দর দেশে আসতে পেরে আমি খুবই খুশি। বাংলাদেশ ও চীন ভালো প্রতিবেশী, ভালো বন্ধু ও ভালো অংশীদার। এই সফর দুই দেশের অগ্রযাত্রায় বিশেষ ভূমিকা রাখবে। কৌশলগত যোগাযোগের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক কীভাবে আরো উচ্চ পর্যায়ে নেওয়া যায়, সে ব্যাপারে আমরা আলোচনা করেছি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বক্তব্যে বলেন, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে কিছুক্ষণ আগে আমাদের উভয়ের স্বার্থসংশ্লিষ্ট দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক ইস্যুতে একটি ফলপ্রসূ বৈঠক হয়েছে। আমরা ‘এক চীন নীতি’তে আমাদের জোরালো সমর্থন দিয়েছি। আমরা খুবই ঘনিষ্ঠভাবে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে পারস্পরিক স্বার্থে কাজ করতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা ব্যবসা ও বিনিয়োগ, অবকাঠামো, শিল্প, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি ও কৃষি খাতে একযোগে কাজ করতে ঐকমত্যে পৌঁছেছি।
তিনি বলেন, আমরা এখানে ২৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সাক্ষী হলাম। এই চুক্তিগুলো হয়েছে ব্যবসা, বিনিয়োগ, সমুদ্র অর্থনীতি, বিসিআইএম-ইসি, সড়ক ও সেতু, রেলপথ, পাওয়ার, সমুদ্র, আইসিটি, শিল্প উৎপাদন, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও দক্ষতার উন্নয়নসংক্রান্ত।
শেখ হাসিনা আরও বলেন, আমরা ছয়টি প্রকল্পও উদ্বোধন করেছি। এই চুক্তি ও প্রকল্পগুলো উদ্বোধনের পর দুই দেশের পারস্পরিক বোঝাপড়া উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। আজকে আমরা ঘনিষ্ঠ পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র থেকে কৌশলগত অংশীদারত্বের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছি। তিনি বলেন, এই কৌশলগত অংশীদারত্বের অধীনে আমরা দুই দেশের জনগণের আর্থ সামাজিক উন্নয়নের জন্য কাজ করতে সম্মত হয়েছি। আমাদের এই প্রচেষ্টার লক্ষ্য হচ্ছে, ২০২১ সালের মধ্যে জ্ঞানভিত্তিক মধ্য আয়ের দেশ এবং পর্যায়ে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে উপনীত হওয়া। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও বঞ্চনামুক্ত হবে এবং বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বাংলাদেশ গড়তে সক্ষম হব।’
বিমানবন্দরে লাল গালিচা সংবর্ধনা
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে সকালে শুক্রবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছলে তাঁকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেয়া হয়। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বিমান বন্দরের ভিভিআইপি টার্মিনালে চীনা প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানান। চীনের প্রেসিডেন্ট এয়ার চায়নার একটি বিশেষ বিমানে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছলে একুশবার তোপধ্বনি দেয়া হয়। এ সময় এক কিশোরী চীনের প্রেসিডেন্টকে ফুলের তোড়া উপহার দেয়। চীনের প্রেসিডেন্টকে বহনকারী বিমানটি বাংলাদেশের আকাশ সীমায় প্রবেশের সাথে সাথে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ৪টি জেট বিমান তাঁর বিমানটিকে এসকর্ট করে নিয়ে আসে।
এরপর সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত একটি চৌকস দল চীনের প্রেসিডেন্টকে গার্ড অব অনার প্রদান করে। চীনের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সালাম গ্রহণ এবং গার্ড পরিদর্শন করেন। এ সময় দু’দেশের জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করা হয়।
অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী এএমএ মুহিত, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী, জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ তাঁর পাশে থাকা মন্ত্রীবৃন্দ ও কর্মকর্তাদের চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে কঠোর নিরাপত্তায় মোটর শোভাযাত্রা সহকারে চীনা প্রেসিডেন্টকে রাজধানীর হোটেল লা মেরিডিয়ানে নিয়ে যাওয়া হয়।
‘সোনার বাংলার স্বপ্নের মতো তেজোদীপ্ত হতে চায় চীন’
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন, বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে চীন। বাংলাদেশ ও চীন উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। চীনের স্বপ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের স্বপ্ন ‘সোনার বাংলার’ সঙ্গে নিবিড় মিল রেখে পুরো চীনকে তেজোদীপ্ত করা। গতকাল শুক্রবার দুই দিনের সফরে ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেমে এক বিবৃতিতে চীনা প্রেসিডেন্ট এ কথা বলেন। চায়না ডেইলির এক অনলাইন প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।
শি জিনপিং বলেন, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে পারস্পরিক আস্থা, দুই দেশের সম্প?র্ক এগিয়ে নেওয়া ও বাস্তবসম্মত সহযোগিতা আরো উচ্চপর্যায়ে নিতে বাংলাদেশের সঙ্গে আমরা কাজ করতে প্রস্তুত। ৪১ বছর ধরে বিদ্যমান বাংলাদেশ-চীনের কূটনৈতিক সম্পর্ক আরো সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, চীন ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয় ও ভবিষ্যত্? সহযোগিতার ব্যাপারে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও অন্যান্য দলের নেতাদের সঙ্গে বিশদ আলোচনা হবে; যা দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন যুগের সূচনা করবে।
ছয় প্রকল্পের নির্মাণ কাজ উদ্বোধন
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং শুক্রবার বিকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে ছয়টি প্রকল্প উদ্বোধন করেন। এর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম এবং পায়রায় দুটি বড় তাপ বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প, যার একেকটির ক্ষমতাই হবে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট। চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে একটি টানেল তৈরির প্রকল্পেও অর্থ সহায়তা দিচ্ছে চীন। এছাড়া একটি শাহজালাল সার কারখানা, ন্যাশনাল ডাটা সেন্টার এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘কনফুসিয়াস ইন্সটিটিউট’ নামে একটি গবেষণা কেন্দ্র স্থাপিত হচ্ছে চীনা অর্থ সাহায্যে।
ইত্তেফাক/আরএ