একটা সময় ছিল যখন কোনো পণ্য নকল হলে বা গুণগতমান খারাপ হলে মেইড ইন জিনজিরা বলে আখ্যা দেওয়া হতো। জিনজিরা কেরানীগঞ্জ উপজেলার একটি ইউনিয়নের নাম। ফলে এ ধরনের ঘটনায় লজ্জা ও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হতো কেরানীগঞ্জের বাসিন্দাদের। তবে ‘মেইড ইন জিনজিরা’ এখন আর কেরানীগঞ্জবাসীর লজ্জা নয় বরং অহংকার। কথাগুলো বলেন জিনজিরা ইউনিয়নের স্থায়ী বাসিন্দা ও প্রবীণ সাংবাদিক শফিক চৌধুরী।
তিনি বলেন, বাংলার চীন, বাংলার জাপান বা মেইড ইন জিনজিরা ইত্যাদি নামে পরিচিত কেরানীগঞ্জ উপজেলার জিনজিরা ইউনিয়ন। জিনজিরার মূল অংশটি তাওয়াপট্টি নামে পরিচিত। বুড়িগঙ্গা তীর ঘেঁষে এর অবস্থান। তাওয়াপট্টিতে গড়ে ওঠা টিনের ঘরের ছোট ছোট কারখানায় তৈরি হয় বিভিন্ন যন্ত্রাংশ। এখানকার কারিগররা এতোটাই দক্ষ যে তারা কোনো যন্ত্রাংশের নমুনা দিলে হুবহু তা বানিয়ে দিতে পারেন। সেগুলো টেকসই ও মানসম্মত। আর এ সব যন্ত্রপাতি তৈরিতে যে সব যন্ত্র বা মেশিন দরকার হয় তা নিজেরাই বানিয়ে নেন। তাই এটাকে নকল বলা চলে না, এটা হচ্ছে অনুকরণ। এখানকার তৈরি যন্ত্রাংশের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।
এখানে নাট-বল্টু, ওয়াসা, স্প্রিং, দরজার কবজা, ছিটকিনি, বার্নার, ক্যালাম, টোপ ওয়াসার, প্লেনজার, কলের বাকেট, হ্যাসবল, তালা, সাটার স্প্রিং, স্ক্রু, রিপিট, সকল ধরনের হার্ডওয়ার সামগ্রী ও গাড়ির পার্টসসহ সব ধরনের যন্ত্রাংশই তৈরি হয়।
তাওয়াপট্টির আয়রণ(লোহা) ব্যবসায়ী শরীফ আয়রণ স্টোরের মালিক শরীফুল ইসলাম বলেন, রিপিট তৈরির একটি অটো মেশিন জাপান থেকে আনতে খরচ হয় ১৬/১৭ লাখ টাকা, চায়না থেকে আনতে খরচ হবে ১০/১২ লাখ টাকা অথচ এ মেশিন আমরা তৈরি করে দেই মাত্র আড়াই থেকে ৩ লাখ টাকায়। স্প্রিং তৈরির একটি মেশিন পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে আনতে খরচ হয় ৬/৭ লাখ টাকা। এখানে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা খরচে সেই মেশিন তৈরি হয়।
জাহাজ ভাঙার স্ক্র্যাপ, বিভিন্ন শিল্প-কারখানা, রোলিং মিল, নির্মাণাধীন স্থাপনার বাতিল লোহা ও সিট সংগ্রহ করে সেগুলো থেকে নানা যন্ত্রাপাতি তৈরি করা হয় এখানে। ছোট ছোট টিনের ঘরে নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি মেশিনেই বিভিন্ন যন্ত্রপাতি তৈরি করা হয়। এখানকার কারিগরদের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা নেই। কাজ করতে করতে এক সময় দক্ষ কারিগরে পরিণত হন এরা।
তাওয়াপট্টি ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সমবায় সমিতির সভাপতি আক্তার জিলানী খোকন বলেন, যথাযথ সহযোগিতা পেলে এখানকার কারিগররা উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ তৈরির ক্ষমতা রাখে। সহজ শর্তে ঋণ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ সংযোগসহ সরকারি পৃষ্ঠপোকতা পেলে এখানে তৈরি যন্ত্রাংশ অদূর ভবিষ্যতে বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব হবে। আমাদের জিনজিরার তাওয়াপট্টি দেশ ও জাতির গৌরব।
ইত্তেফাক/এএন