চল্লিশ বছরে ৪১ খুন রাবিতে

স্বাধীনতার পর ১৯৭৬ সালে রাবি শিক্ষার্থী নীহার বানু’র নৃশংস হত্যাকাণ্ডে কেঁপে ওঠে পুরো দেশ। ২৭ জানুয়ারি তিনি নিখোঁজ হন। প্রায় ছয় মাস পর নাটকীয়ভাবে তার লাশ উদ্ধার হয়। প্রেমের প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ায় তারই তিন সহপাঠী মিলে নির্মমভাবে হত্যার পর তার লাশ ট্রাঙ্কে ভরে পুতে রেখেছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের অদূরে মিনা মঞ্জিল নামের বাড়ির উঠানের এক কোণে। এই হত্যা মামলায় মূল আসামি আহমেদ হোসেন বাবুসহ ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি আজও পলাতক রয়েছেন। আর একজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
 
সেই শুরু, তারপর থেকে ৪০ বছরে ৪১ জনের রক্তে ভিজে যায় মতিহারের সবুজ চত্বর। অস্ত্রের ঝনঝনানিতে একের পর এক ঝরতে থাকে মেধাবী তরুণ তাজা প্রাণ। এর মধ্যে ছাত্রলীগের ৭ জন, ছাত্র শিবিরের ১৬ জন, জাসদ ছাত্রলীগের ২ জন, ছাত্রদলের ২ জন, ছাত্রমৈত্রীর ৩ জন, ছাত্র ইউনিয়নের ১ জন, সাধারণ ছাত্র ২ জন, ২ দিনমজুর, বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল এ্যান্ড কলেজের ১ শিক্ষার্থী ও নিহার বানু। এই মৃত্যুর মিছিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ জন শিক্ষকও রয়েছেন।
 
প্রতিটি হত্যার পর উত্তাল হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস। শোক, প্রতিবাদ ও বিচারের দাবিতে রাস্তায় নেমে আসে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। তারপর সরকারের মন্ত্রী, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনের আশ্বাসে থেমে যায় আন্দোলন। এ পর্যন্ত একটি হত্যাকাণ্ডেরও বিচার প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। রায় হলেও উচ্চ আদালতে আপিল করায় নিষ্পত্তি হয়নি মামলার। ফলে দণ্ডও কার্যকর করা যায়নি ঘাতকদের।
 
মূলত আশির দশকে ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবিরের উত্থানে রাজনৈতিক সংঘর্ষ বাড়তে থাকে। শুরু হয় অস্ত্রের ঝনঝনানি। ১৯৮২ সালে ১১ মার্চ প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে শিবিরের       সংঘর্ষে ছাত্রলীগ কর্মী মীর মোশতাক এলাহী নিহত হয়। msNGlÆ mvwe»i আহমেদ, আব্দুল হামিদ, আইয়ুব আলী ও আব্দুল জব্বার নামে চার শিবিরকর্মীও নিহত হয়। ১৯৮৮ সালে আসলাম হোসাইন ও আজগর আলী নামে দুই ছাত্র নিহত হয়। তাদের  শিবির নিজেদের কর্মী দাবি করে। ওই বছরে মে মাসে শিবির ক্যাডাররা ছাত্রমৈত্রী নেতা জামিল আকতার রতনকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। ১৯৮৯ সালে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে সংঘর্ষে শিবির নেতা শফিকুল ইসলাম নিহত হয়। একই বছরের শেষ দিকে সংঘর্ষ চলাকালে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় জাসদ ছাত্রলীগ নেতা শাহজাহান সিরাজ এবং পত্রিকার একজন হকার।
 
১৯৯০ সালে শিবির নেতা খলিলুর, ১৯৯২ সালে জাসদ ছাত্রলীগ নেতা ইয়াসির আরাফাত পিন্টু, ছাত্রলীগ কর্মী মুহাম্মদ আলী নিহত হন। ১৯৯২ সালে বিশ্ববিদ্যালয় পার্শ্ববর্তী একটি বাড়িতে বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণে শিবির ক্যাডার আজিবরসহ চারজন নিহত হন। একই বছরে জাসদ ছাত্রলীগ নেতা মুকিম নিহত হয়। ১৯৯৩ সালে ১৯ সেপ্টেম্বর রাতে শের-ই-বাংলা হলে ছাত্রশিবিরের সশস্ত্র হামলায় নিহত হয় ছাত্রমৈত্রী নেতা জুবায়ের চৌধুরী রিমু। একই বছর শিবির-ছাত্রদল সংঘর্ষে মুহাম্মদ ইয়াহিয়া নামে এক শিবির নেতা নিহত হয়। একই বছরের ফেব্রুয়ারিতে সংঘর্ষে ছাত্রদল নেতা বিশ্বজিত্, ছাত্র ইউনিয়ন নেতা তপন রায়, শিবির নেতা মুস্তাফিজুর রহমান এবং রবিউল ইসলাম নিহত হয়। ১৯৯৫ সালে সংঘর্ষে ইসমাঈল হোসেন সিরাজী নামে এক ছাত্র নিহত হয়। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে ছাত্রমৈত্রী নেতা দেবাশীর্ষ ভট্টাচার্য রুপমকে বাস থেকে নামিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে শিবির ক্যাডাররা। ১৯৯৬ সালে ছাত্রদল নেতা আমান উল্লাহ আমানকে কুপিয়ে হত্যা করে শিবির।
 
এদিকে ২০০৪ সালে ডিসেম্বরে সকালে প্রাতঃভ্রমণে বের হয়ে সন্ত্রাসীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নিহত হন অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহম্মদ ইউনুস। মামলায় আট জেএমবি সদস্যকে আসামি করে চার্জশিট দেয় পুলিশ। চূড়ান্ত বিচারে তাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। ২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এস তাহেরকে খুন করা হয়। এই মামলায় দুইজনের ফাঁসি হয়েছে। তবে এখনও রায় কার্যকর হয়নি।
 
২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে পুলিশ শিক্ষার্থী সংঘর্ষ হয়। এতে পুলিশের গুলিতে এক নিরীহ রিকশাচালক নিহত হন। ২০০৯ সালের ১৩ মার্চ বিনোদপুরে ছাত্রলীগ-শিবির সংঘর্ষে শিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক শরীফুজ্জামান নোমানী নিহত হন। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে শাহ্ মখদুম হলে ছাত্রলীগ কর্মী ফারুক হোসেনের হাত-পায়ের রগ কেটে নৃশংসভাবে হত্যা করে ম্যানহোলে ফেলে রাখে শিবির ক্যাডাররা। ২০১০ সালের ১৫ আগস্ট অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ছাত্রলীগ কর্মী নাসরুল্লাহ নাসিমকে ছাদ থেকে ফেলে দেয় দলীয় নেতাকর্মীরা। পরে চিকিত্সাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। ২০১২ সালের ১৫ জুলাই পদ্মা সেতু নির্মাণে উঠানো চাঁদার টাকা ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্বে সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয় ছাত্রলীগ নেতা আব্দুল্লাহ আল হাসান সোহেল। ২০১৩ সালের ১৪ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের অনুষ্ঠান চলাকালে বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল এ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ২০১৪ সালের ৪ এপ্রিল শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী হলে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয় ছাত্রলীগ নেতা রুস্তম আলী।
 
২০১৪ সালে ১৫ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন চৌদ্দপাই এলাকায় নিজ বাড়ির অদূরে খুন হন সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শফিউল ইসলাম লিলন। মামলাটির বিচার প্রক্রিয়া সেভাবে এখনও শুরু হয়নি। চলতি বছরের এপ্রিলে রাজশাহী নগরীর শালবাগান এলাকায় নিজ বাড়ির একটু দূরে দুর্বৃত্তদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে খুন হন ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. এএফএম রেজাউল করিম সিদ্দিকী।
 
সবশেষ বুধবার রাতে নৃশংসভাবে মৃত্যু হয়েছে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মোতালেব হোসেন লিপুর। পুলিশের ধারণা এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
 
রাবি শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক শাহ আজম শান্তনু বলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে এক ধরনের মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন এসব হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়ায় এবং একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ অভিভাবকদের মধ্যে এক ধরনের ভীতি কাজ করছে।
 

ইত্তেফাক/এএন