‘আমার কবিতা আজ একরাশ পাতার মতন/উড়ে যায়, দূরে যায়, বস্তুত এ-সন্ধেবেলা যায়,
কোথায় যে যায়। (আমার কবিতা আজ)’ নিজের কবিতা নিয়েই সন্দিহান ছিলেন কবি। আজ রবিবার কবির ৮৮তম জন্মদিন। তাঁর মৃত্যুর পর দশটি বছর চলে গেছে। কিন্তু তিনি কী হারিয়ে গেছেন বাংলার মানুষের হূদয় থেকে? আজ দেশের সাম্প্রতিককালের অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমানের ৮৮তম জন্মদিন। ১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর বুধবার পুরানো ঢাকার মাহুতটুলীর ৪৬ নম্বর বাড়িতে কবি জন্মগ্রহণ করেন।
কবি শামসুর রাহমান সারাজীবনের রচনায় মানুষকে আশার কথা বলেছেন। আজীবন কবিতায় সমর্পিত এ কবি ২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট আমাদের ছেড়ে চলে যান। কিন্তু বাঙালির সত্ত্বায় তিনি স্থান লাভ করেছেন। বাংলা কবিতায় নতুন ধারা সৃষ্টি করেন কবি শামসুর রাহমান। ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা আর কতকাল ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়/আর কতকাল দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন’—মুক্তিযুদ্ধে কবির উদ্দীপ্ত উচ্চারণে স্বাধীনতাকামী মানুষের মনে সাহস সঞ্চারিত হয়েছিল। মৃত্যুকে পরোয়া না করে সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ মানুষ স্বাধীনতাকে ছিনিয়ে এনেছিল। তার কবিতার পংক্তিমালায় মানুষ দেখেছিল নতুন দিনের স্বপ্ন। তাঁর কবিতা হয়ে উঠেছিল গণমানুষের কবিতা, সাধারণ মানুষের কবিতা।
কালের কণ্ঠস্বর, এ কবি ছিলেন মৃদুভাষী। কিন্তু যে কোনো আন্দোলনে, অধিকার আদায়ের দাবিতে সোচ্চার এ কবি ছিলেন মানুষের পাশাপাশি। তার লেখনী এসব আন্দোলনে ছিল প্রেরণার উত্স। তিনি সশরীরেও আন্দোলনে যোগ দিতেন। মুক্তিযুদ্ধে, মৌলবাদ ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাঁর কবিতা মানুষকে উজ্জীবিত করেছে, যুগিয়েছে প্রেরণা। বিপর্যয়ে, দুঃশাসনে, মানবতার লাঞ্ছনায় বাঙালিকে ফিরে যেতে হবে কবি শামসুর রাহমানের কাছে।
সামপ্রতিককালের বহুল পঠিত কবি শামসুর রাহমান। বাংলা কবিতায় এককভাবে সবচেয়ে বেশি কবিতা লিখেছেন তিনি। শামসুর রাহমানের কাব্যগ্রন্থ ৬৬টি।
তার মায়ের নাম আমেনা খাতুন, পিতা মুখলেসুর রহমান চৌধুরী। পৈতৃক বাড়ি নরসিংদী জেলার রায়পুরা থানার পাড়াতলী গ্রামে। ১৯৫৭ সালে দৈনিক মর্নিং নিউজে সাংবাদিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। ১৯৫৭-১৯৫৯ রেডিও পাকিস্তানের প্রোগ্রাম প্রডিউসার ছিলেন। ১৯৬০-১৯৬৪ দৈনিক মর্নিং নিউজে সিনিয়র সাব-এডিটর, ১৯৬৪-১৯৭৭ দৈনিক পাকিস্তান ও দৈনিক বাংলায় সহকারী সম্পাদক এবং ১৯৭৭-১৯৮৭ দৈনিক বাংলার ও সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯ বছর বয়সে কবিতা লিখতে শুরু করেন ১৯৪৮ সালে। ১ম কবিতা ‘উনিশশো ঊনপঞ্চাশ’ প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক সোনার বাংলায়। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ৬৬টি। উপন্যাস ৪টি, প্রবন্ধগ্রন্থ ১টি, ছড়ার বই ৮টি, অনুবাদ ৬টি। তিনি বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। কবিকে তার পঞ্চাশ বর্ষপূর্তিতে জাতির পক্ষ থেকে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হয় ১৯৭৯-এ এবং ষাট বর্ষপূর্তি উপলক্ষে জাতীয় সংবর্ধনা দেওয়া হয় ১৯৮৯ সালে।
দিনের কর্মসূচি
কবির জন্মবার্ষিকী স্মরণে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা আয়োজন করেছে। রয়েছে বনানী কবরস্থানে কবির সমাধিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ, আলোচনা সভা, গান ও কবিতা আবৃত্তির অনুষ্ঠান।আজ সকালে কবির সমাধিতে বাংলা একাডেমি, জাতীয় কবিতা পরিষদ, শামসুর রাহমান স্মৃতি পরিষদ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন পুষ্পমাল্য অর্পণ করবে। তাঁর স্মরণে বিকাল চারটায় বাংলা একাডেমি, জাতীয় কবিতা পরিষদ ও শামসুর রাহমান স্মৃতি পরিষদ যৌথভাবে একাডেমির রবীন্দ্র চত্বরে আলোচনা, নিবেদিত কবিতাপাঠ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এতে সভাপতিত্ব করবেন বাংলা একাডেমি ও শামসুর রাহমান স্মৃতি পরিষদের সভাপতি ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। আলোচনায় অংশ নেবেন রামেন্দু মজুমদার, কবি রবিউল হুসাইন, কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা এবং অধ্যাপক রফিকউল্লাহ খান।
ইত্তেফাক/এএন