প্রকৃত হতদরিদ্রের ভাগ্যে জুটছে না সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১০ টাকা কেজির চাল। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের আত্মীয়-স্বজন, ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি স্বচ্ছল ব্যক্তিরাই প্রভাব খাটিয়ে গরীবের চালের কার্ড করে নিয়েছে। খাদ্যমন্ত্রীর কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি স্বত্ত্বেও এসব অনিয়ম-দুর্নীতি যেন দিনদিন বাড়ছে। সারাদেশ থেকে আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো প্রতিবেদনে সে চিত্রই উঠে আসছে।
বাবুগঞ্জ (বরিশাল) সংবাদদাতা জানান, বাবুগঞ্জে ৭ হাজার ৩৪০টি হতদরিদ্র পরিবারের ভাগ্যে এখনো অক্টোবর মাসের চাল জোটেনি। উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সূত্রে জানা গেছে, খাদ্য গুদামে চাল না থাকার কারণে এমন ঘটনা হয়েছে। খাদ্য গুদামে চাল না থাকায় খুলনার বাঘাবাড়ি থেকে চালের জাহাজ আসার কথা জানিয়ে ছিল উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা। কিন্তু ২৪ দিন অতিবাহিত হলেও এখন পযর্ন্ত খাদ্য গুদামে চাল না আসায় ডিলারা পড়েছে উভয় সংকটে।
প্রতিদিন হতদরিদ্ররা ডিলারদের কাছে চাল নিতে এসে খালি ব্যাগ নিয়ে ফিরে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা মশিউর রহমান জানান বাবুগঞ্জ খাদ্য গুদামে হতদরিদ্রের চাল মজুদ না থাকার কারনে ডিলারদের ডিউ পাশ করা যাচ্ছে না। খাদ্য গুদামে চাল আসলে ডিলারদের ডিউ পাশ করা হবে ।
গাংনী (মেহেরপুর) সংবাদদাতা জানান, গাংনীতে ১০ টাকা কেজি দরের চাল বিতরণে অনিয়ম চলছেই। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন চেয়ারম্যান, মেম্বারদের তৈরী তালিকায় ব্যাপক অনিয়ম থাকায় কাজীপুর, ষোলটাকা ও বামন্দীতে ১০ টাকা কেজি চাল বিতরণ বন্ধ ঘোষণা করেছে উপজেলা নির্বাহী অফিসার। এছাড়া ওজনে কম দেয়া, ১ মাসের চাল দিয়ে ২ মাসের মাষ্টার রোলে সাক্ষর বা টিপসহি করে নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সাহারবাটী গ্রামের হতদরিদ্র শ্রী অনিল দাস চাল নিতে গেলে ডিলার ১ মাসের চাল দিয়ে ২ মাসের টিপসহি নিয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেছেন।
সরেজমিনে বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, সাহারবাটী ইউনিয়নের ভাটপাড়া গ্রামের ট্রাক্টরের মালিক রবগুল ,কাথুলী ইউনিয়নের গাড়াবাড়ীয়া গ্রামের আফসার আলীর ছেলে সচ্ছল পরিবারের সদস্য আজাদ ও পিন্টু এবং ফয়েজ মন্ডল, তেতুলবাড়ীয়া ইউনিয়নের সহড়াতলা গ্রামের ছমিরউদ্দীন,পাকাবাড়ীর মালিক গোলাম রহমানসহ অনেক স্বচ্ছল ব্যক্তি ১০ টাকা কেজি চালের কার্ড পেযেছেন।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার আরিফ-উজ-জামান জানান, বিভিন ইউনিয়নের ডিলারদের চাল বিতরণ মনিটরিং করার জন্য ইতোমধ্যে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করা হয়েছে। কোথাও কোন অনিয়ম, অসঙ্গতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, গোপালগঞ্জে এ চাল নিয়েছেন সাবেক ইউপি চেয়ারম্যানের ছেলে সিদ্ধার্থ বিশ্বাস সতু। স্বচ্ছল ব্যক্তি হওয়া স্বত্ত্বেও তিনি কার্ড পাওয়ায় ইউনিয়ন জুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, সরোজ কান্তি বিশ্বাস খোকন ইউপি চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকার সময় গত বছর হতদরিদ্র্যদের তালিকা করা হয়। বাবা চেয়ারম্যন থাকায় ছেলে সিদ্ধার্থ ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের নামে কার্ড নিয়েছেন। এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
রঘুনাথপুর ইউনিয়নে হতদরিদ্রদের ১০ টাকা দরের চাল বিক্রিতে নিয়োজিত ডিলার ভূপতি বনিক বলেন, সিদ্ধার্থ বিশ্বাস সতুর তার নিজের নামে থাকা কার্ড দিয়ে অক্টোবর মাসে ৩০ কেজি ও সেপ্টেম্বর মাসে ৩০ কেজি চাল উত্তোলন করেছেন।
অভিযুক্ত সিদ্ধার্থ বিশ্বাস সতু কার্ড নেয়ার কথা স্বীকার করে বলেছে, আমার অজান্তেই সাবেক ইউপি মেম্বর প্রণয় বিশ্বাস আমার নামে একটি কার্ড দিয়েছে। কার্ড পেয়ে আমি অবাক হয়েছি। কার্ড পাওয়ার পর বর্তমান চেয়ারম্যান শ্রীবাস বিশ্বাসকে আমার কার্ড বাতিল করার জন্য অনুরোধ করেছি। তবে আমি ওই কার্ডে মাত্র একবার সেপ্টেম্বর মাসে ৩০ কেজি চাল উত্তোলন করে একটি হতদরিদ্র পরিবারকে দিয়ে দিয়েছি।
সাবেক ইউপি মেম্বর প্রণয় বিশ্বাস বলেন, চেয়ারম্যানে ছেলে সিদ্ধর্থ নিজেই প্রভাব খাটিয়ে কার্ড নিয়েছে। সেই ভিলেজ পলিটিক্স ঠিক রাখতে আমাদের উপেক্ষা করে ইউনিয়ন জুড়ে কার্ডের তালিকা করেছে। আমি তাকে কার্ড দেইনি।
এ প্রসঙ্গে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন বলেন, এ চাল শুধুমাত্র হতদরিদ্র্যরাই পাবেন। বৃত্তবানরা নিতে পারবেন না। ইতিমধ্যে হতদরিদ্র্যদের তালিকা যাচাই বছাই শুরু হয়েছে। যাচাই বাছাই শেষে প্রভাবশালী ও বৃত্তবানদের তালিকা থেকে বাদ দেয়া হচ্ছে।
ইত্তেফাক/এএম।