দেশে কুষ্ঠ রোগ নিয়ন্ত্রণে আছে- সরকার এমন ঘোষণা দিলেও প্রতিবছর এখনো চার হাজার মানুষের শরীরে এই রোগ শনাক্ত করা হচ্ছে। বিশেষ করে দেশের চা বাগানগুলোতে শ্রমিকদের মধ্যে কুষ্ঠ রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সেখানে সরকারিভাবে রোগ শনাক্ত কার্যক্রম না থাকার কারণে বহু রোগী আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। এতে রোগীদের হাত-পা বিকৃত হবার পাশাপাশি তাদের মাধ্যমে রোগ ছড়ানোর আশঙ্কাও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের চা বাগানগুলোতে রোগ শনাক্ত ও চিকিত্সা সেবা দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল নেই। ফলে নীরবেই এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শ্রমিকেরা। প্রতিবছর গড়ে চার হাজার কুষ্ঠ রোগীর সন্ধান মিলছে। সারাদেশে স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম চালু করলে এ সংখ্যা আরো বাড়বে বলে তাদের আশঙ্কা।
উল্লেখ্য, ১৯৯৮ সালে কুষ্ঠরোগ বাংলাদেশ থেকে উচ্ছেদ হয়েছে বলে ঘোষণা দেয় সরকার। কিন্তু দেশে এখনো এই রোগ দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সহায়তা পেলে অবহেলিত এই রোগীদের দ্রুত শনাক্তের মাধ্যমে এ রোগ নির্মূল করা সম্ভব।
এ প্রসঙ্গে জাতীয় কুষ্ঠ উচ্ছেদ কর্মসূচির সাবেক ব্যবস্থাপক ডা. সাফির উদ্দিন বলেন, আমরা জরিপ করে দেখেছি, প্রতি বছর দেশে প্রায় চার হাজার নতুন কুষ্ঠ রোগী শনাক্ত হচ্ছে। এর আগে এ সংখ্যা আরো বেশি ছিল। তিনি বলেন, কুষ্ঠ রোগে ভয় পাওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে ঘা ও বিকলাঙ্গ হওয়া। বর্তমানে কুষ্ঠ রোগীদের মধ্যে বিকলাঙ্গতা কমেছে। তবে এখনো দৃশ্যমান বিকলাঙ্গের হার ১১-১২ শতাংশ। তিনি জানান, কুষ্ঠ রোগের ওষুধ নিয়মিত সেবন করতে হয়। কোর্স শেষ না হওয়া পর্যন্ত চিকিত্সা চালিয়ে যেতে হয়। দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং এ নিয়ে কাজ করা আটটি এনজিও পরিচালিত ক্লিনিকে বিনামূল্যে কুষ্ঠ রোগীদের চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছে।
চা বাগানে কুষ্ঠের প্রাদুর্ভাব :মৌলভীবাজারে পাত্রখোলা চা বাগান এলাকায় কুষ্ঠ রোগীদের সঙ্গে কথা বলে তাদের দুর্দশার কথা জানা গেল। সেখানকার ৬০ বছর বয়সি বিশ্বপতি দেববর্মা ত্রিপুরা নিজের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘বাপ-মা, ভাই-বোন কেউ নাই আমার। স্বামীও চলে গেছে। ঔষধ নাই; জুতা নাই। কেউ আমাকে এসব দেয় না। একটা মেয়ে আছে, সেও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী।’ কুষ্ঠরোগে বিশ্বপতির দুই পায়ের সবগুলো আঙ্গুলে ঘা হয়ে গেছে। পা কাটতে কাটতে গোড়ালিতে এসে ঠেকেছে। দুই হাতের আঙ্গুলগুলোও ঝরে গেছে।
একই অবস্থা ৩০ বছর বয়সী অর্জুন পাল ও তার বড় ভাই রঞ্জু পালের (৩৪)। ১৫ বছর আগে অর্জুনের পায়ের তলায় আলসার ধরা পড়ে। অর্জুনের এক পা কেটে ফেলতে হয়েছে হাঁটুর নিচ পর্যন্ত, অন্য পায়ের সবগুলো আঙ্গুল ক্ষয়ে গেছে। কুষ্ঠ রোগীদের জন্যে তৈরি বিশেষ জুতাসহ কৃত্রিম পা পরে চলাফেরা করেন অর্জুন। আর রঞ্জুর দুই পা’ই কেটে ফেলতে হয়েছে কুষ্ঠরোগের কারণে।
মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন ডা. সত্যকাম চক্রবর্ত্তী বলেন, মৌলভীবাজারে কুষ্ঠ রোগী আছে এটা স্বীকৃত সত্য। এখানে কুষ্ঠ রোগী শনাক্ত করা, চিকিত্সা এবং যদি প্রতিবন্ধী হয় তাকে পুনর্বাসন করতে সরকারের যে কর্মসূচি আছে সেটা করে ‘লেপ্রা বাংলাদেশ’। তারা এটা করে অন্য একটা সোর্সের মাধ্যমে। চা বাগানে এই রোগটা সবচেয়ে বেশি। কারণ চাবাগান অধ্যুষিত এলাকায় সরকারের যে মেডিক্যাল সুবিধা সেটার বাইরে থাকে চা শ্রমিকরা। পর্যাপ্ত সুবিধা সেখানে না থাকার কারণে আমরা তাদের চিহ্নিত করতে পারি না। তিনি বলেন, মৌলভীবাজারে ৯২টা চাবাগানে ৪ থেকে ৫ লক্ষ মানুষ বাস করে, তাদের মধ্যে এই রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি। আমরা বাগানে একটা ক্রাশ প্রোগাম করার পরে দেখলাম, সেখানে প্রচুর রোগী শনাক্ত হচ্ছে। এতে করে আমরা নিশ্চিত হলাম যে বাগানে প্রচুর কুষ্ঠ রোগী আছে। চা বাগানের জনগোষ্ঠীকে কখনোই সঠিকভাবে চিহ্নিত করা হয়নি।
সিলেটের কুষ্ঠ হাসপাতাল সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, সেখানে প্রতিদিনই আসছে নতুন নতুন রোগী। তবে পুরাতন প্রতিবন্ধী রোগীদের আনাগোনাই বেশি। হাসপাতালের চিকিত্সক ডা. রুবিনা ফারজানা বলেন, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জে কুষ্ঠ রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি। প্রতিদিন গড়ে এই হাসপাতালে রোগী আসে ১৫ থেকে ২০ জন করে। বর্তমানে এই হাসপাতালে রোগী আছে ৩৩ জন। এর মধ্যে ৯ জন নারী, বাকিরা পুরুষ।
ইত্তেফাক/এএন