আমরা গরিব মানুষ, টাকার অভাবে বগুড়া যেতে পারি না। ওষুধ কিনতে পারছি না। এখানে সাদা সাদা বড়ি ছাড়া কিছুই দিল না এ কথাগুলো বলছিলেন চিকিত্সা নিতে আসা উপজেলার দলগাছ গ্রামের রেহেনা বেগম, বৈলগ্রামের আলেফা বেগম।
অবকাঠামো নির্মাণের ১০ বছরেও জনবলের অভাবে বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলা সদরে ২০ শয্যার সরকারি হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি। জনবল নিয়োগ না দিয়েই তড়িঘড়ি করে ২০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালটি উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনের পর থেকেই হাসপাতালের আউটডোরের চিকিত্সা চালু থাকলেও বন্ধ আছে হাসপাতালের পূর্ণাঙ্গ চিকিত্সাসেবা কার্যক্রম। বর্তমানে দুইজন মেডিক্যাল অফিসার, একজন মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট, একজন ফার্মাসিস্ট দ্বারা হাসাপাতালের আউটডোর চালু করা হয়েছে।
ইতোমধ্যে হাসপাতালের চারটি ভবনে ফাটল ধরেছে। বিভিন্ন অংশ ধসে পড়েছে। ময়লা আবর্জনায় ভরা জরাজীর্ণ হাসপাতালের লোহার গ্রিল, জানালা, দরজা ও কাচের গ্লাস ভেঙে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার না করায় নষ্ট হচ্ছে হাসপাতালের মূল্যবান আসবাব ও যন্ত্রপাতি। এ ছাড়াও হাসপাতালটিতে নেই পানি ও নিরাপত্তার জন্য নৈশপ্রহরী।
স্থানীয়রা জানান, জনবল নিয়োগ না দিয়েই শুধুমাত্র রাজনৈতিক কৃতিত্ব নিতে বিগত সরকার আমলে বিএনপি তড়িঘড়ি করে হাসপাতালটির লোক দেখানো উদ্বোধন করেছে। বর্তমান সরকার হাসপাতালটিতে জনবল নিয়োগের ব্যাপারে কার্যকরী উদ্যোগ নিচ্ছে না।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাহেদুর রহমান বলেন, শুধুমাত্র রাজনৈতিক কৃতিত্ব নিতেই জনবল নিয়োগ না দিয়ে এ হাসপাতালটি উদ্বোধন করা হয়েছিল। এলাকাবাসীর চিকিত্সাসেবার স্বার্থে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দিয়ে হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর উদ্যোগ নেওয়া দরকার।
সাধারণ সম্পাদক আনিছুর রহমান বলেন, বর্তমান সরকার মানুষের চিকিত্সাসেবা নিশ্চিত করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তাই হাসপাতালটি অতিদ্রুত চালু করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বলেছি।
নন্দীগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি উপজেলা সদর থেকে ৯ কিলোমিটার দূরে ভাটগ্রাম ইউনিয়নের বিজরুল বাজারে অবস্থিত। উপজেলা সদরে কোনো স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স না থাকায় পৌর শহরসহ আশেপাশের বিপুল সংখ্যাক মানুষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছিল। এ কারণে উপজেলা সদরে একটি আধুনিকমানের হাসপাতাল নির্মাণের দাবি তোলেন স্থানীয়রা। স্থানীয়দের দাবির প্রেক্ষিতে ২০০১-২০০২ অর্থবছরে বিগত বিএনপি সরকার আমলে উপজেলা সদরে ২০ শয্যা বিশিষ্ট একটি অত্যাধুনিক হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সরকারের স্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের তত্ত্বাবধানে (নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ইউনিট-সিএমএমইউ) হাসপাতালটির অবকাঠামো নির্মাণসহ আনুষঙ্গিক খাতে ব্যয় হয় ৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। ২০০২ সালে তত্কালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠপুত্র তারেক রহমান হাসপাতালটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং নির্মাণ কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। ২০০৫ সালে এর অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হয়। কিন্তু অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হলেও জনবল নিয়োগ না দেওয়ায় আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন আটকে যায়। জনবল নিয়োগ ছাড়াই ২০০৬ সালের ১৮ অক্টোবর জোট সরকার ক্ষমতা ছাড়ার শেষ মুহূর্তে তড়িঘড়ি করে হাসপাতালটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন তত্কালীন সাংসদ জিয়াউল হক মোল্লা। এরপর দীর্ঘ ১০ বছরে জনবলের অভাবে হাসপাতালটি আর চালু হয়নি।
সূত্রে জানা গেছে, ২০ শয্যা অত্যাধুনিক এ হাসপাতালে চিকিত্সক, সেবিকা, চিকিত্সা সহকারী, ঔষধবিদ, ওয়ার্ডবয়, অফিস সহকারী, ল্যাব এটেনডেন্টসহ ১৩ জনের পদ রয়েছে।
ডা. সাজ্জাদ হোসেন জানান, এখানে দু’জন মেডিক্যাল অফিসার ও একজন ফার্মাসিস্ট রয়েছেন। প্রতিদিন এখানে গড়ে ১০০ জন রোগী চিকিত্সা নিতে আসেন। তবে প্রাথমিক চিকিত্সা ছাড়া রোগীদের কোনো সেবা দেওয়া যায় না।
পৌর মেয়র কামরুল হাসান সিদ্দিকি জুয়েল বলেন, এলাকাবাসীর চিকিত্সাসেবার স্বার্থে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দিয়ে হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
চিকিত্সা নিতে আসা দলগাছ গ্রামের রেহেনা বেগম, বৈলগ্রামের আলেফা বেগম বলেন, গরিব মানুষ টাকার অভাবে বগুড়া যেতে পারি না। ওষুধ কিনতে পারছি না। এখানে সাদা সাদা বড়ি ছাড়া কিছুই দিল না।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অফিসার ডা. তোফাজ্জল হোসেন মণ্ডল বলেন, জনবলের অভাবে ওই হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা যাচ্ছে না। তবে পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর প্রক্রিয়া চলছে।
ইত্তেফাক/এএন