ইচ্ছা ছিল সারাবিশ্ব ভ্রমণ করবেন, আর্থিক অসংগতির কারণে সেটি আর হয়ে ওঠেনি। তাইতো তিনি দেশি–বিদেশি নোট, মুদ্রাসহ গত ৪৬ বছরে বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত সবগুলো লটারির টিকিট সংগ্রহ করে বিশ্ব ভ্রমণের শখ মিটিয়ে যাচ্ছেন।
নীরবে নিভৃতে ১৭০টি দেশের ৩ সহস্রাধিক মুদ্রা, নোট আর লটারির টিকিটের দুর্লভ সংগ্রহশালা গড়ে তুলেছেন মানিকগঞ্জের লিয়াকত আলী খান। মানিকগঞ্জের পৌর এলাকায় পৌররা গ্রামের লিয়াকত আলী খান একজন নিভৃতচারী ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় মানুষ। পেশায় ব্যাবসায়ী ছিলেন।গত বছর অসুস্থ হওয়ায় মানিকগঞ্জ শহরে বাসায় পাখি ও তার সংগ্রহশালা দিয়ে কাটাচ্ছেন প্রায় পুরোটা সময়। ব্যবসা এবং সংসার জীবনে একইসঙ্গে সংগোপনে লালন করে গেছেন মাত্র ৮বছর বয়সে জন্ম নেয়ার একটি শখে। সে শখটি গতানুগতিক কোনো শখ নয়, ধাতব মুদ্রাসংগ্রহের শখ। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সে শখটি পরিণত হয়েছে নেশায়। ১৯৭২ সালে তার ৭ বছরের সংগৃহীত সবকিছু চুরি হলেও আবার তিনি সংগ্রহের কাজ শুরু করেন। IMG0
সকাল ৫টায় তার ঘুম ভাঙ্গে পাখির আওয়াজে। প্রতিদিন প্রায় সহস্রাধিক শালিক এসে ভিড় করে উঠানে। শালিকরা বহু বছর যাবত তার উঠানে আসে তাদের খাবার খাওয়ার জন্য। পাখিদের খাবার খাওয়ানো হয়ে গেলেই তিনি তার সংগ্রহশালার সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
তার বয়স তখন ৮। তখন একদিন বাজার খেকে ফেরার পথে কুড়িয়ে পেয়ে ছিল ব্রিটিশ আমলের গোড়ার দিককার ১টি রুপার মুদ্রা। মুদ্রাটিকে মহামূল্যবান মনে করে বড়দের চোখ এড়িয়ে সেটি নিয়ে দুরুদুরু বুকে হাজির হয়েছিলেন স্যাকরার দোকানে। নাম ভুলে যাওয়া সোনা–রুপার সে ব্যবসায়ী সেদিন কুড়িয়ে পাওয়া মুদ্রাটি ফিরিয়ে দিয়ে তাকে বলেছিল এটি কেনা যাবে না। এমন আরো কটি জমলে তারপর এসো।
সেই থেকে সারাক্ষণ আরেকটি পুরোনো মুদ্রা কেমন করে যোগাড় করা যায়। একটি দুটি করে জমানো হলো অনেকগুলো। কিন্তু কখন যে ঐ পুরোনো মুদ্রার প্রতি তার মায়া জন্মে ছিল টের পাননি তিনি নিজেও।মুদ্রাগুলো আর বেচা হয়নি। বরং নেশা ধরে গিয়েছিল সংগ্রহের। এ ভাবে কুড়োতে কুড়োতে এখন তার সংগ্রহ ১৭০টি দেশের ৩ হাজারেরও বেশি দেশের মুদ্রার বিশাল ভাণ্ডার। মুদ্রা সংগ্রহের এ কাজটি সহজও ছিল না। বরং ছিল কষ্টসাধ্য এবং ক্ষেত্র বিশেষে ব্যয়বহুল।
নানা জনে নানা কথা বলেছেন, গুরুজনেরা তিরষ্কার করেছেন। উপহাস করতে ছাড়েনি অনেকেই তবুও তার নেশা কাটেনি।
লিয়াকত আলী খান তার মুদ্রাসংগ্রহের এমন তথ্য দেয়ার পাশাপাশি জানান, বিরল মুদ্রার খোঁজ পেয়ে দেশের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে গেছি। এমনও ঘটনা ঘটেছে যে, পুরোনো ১ পয়সার তামার মুদ্রাও কিনতে হয়েছে হাজার টাকা দিয়ে। আমার এ নেশার কথা দীর্ঘ দিন গোপন রেখেছি। কিন্তু এক সময় বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশি আত্মীয়রা জেনে গেছেন। গোপন রাখা যায়নি। এতে আমার লাভই হয়েছে। অনেক সময় আমার বন্ধু-প্রতিবেশিরাই বিভিন্ন দেশের কয়েন পেলে আমার জন্য তা সংগ্রহ করে রেখে দেয় বা আমার বাড়িতে পৌঁছে দেয়। চেনা পরিচিত জনের বিদেশ থেকে দেশে ফেরার পথে সেসব দেশের নতুন-পুরোনো মুদ্রা আমার জন্য নিয়ে আসেন। IMG1
লিয়াকত আলী খান বিশ্বের সবগুলো দেশের মুদ্রা সংগ্রহ চেষ্টাকে নিজে নিজেই চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন। তার বিশ্বাস দু, এক বছরের মধ্যে তার সে স্বপ্নপূরণ হবে।
বিরল মুদ্রা সম্পর্কে লিয়াকত আলী জানান, তার কাছে অনেকগুলো মুদ্রা আছে যেসব মুদ্রা কোন সময়ে কোন দেশে তা এখনও তিনি বুঝে উঠতে পারেননি। অনেককে সেসব দেখিয়েছেনও, কিন্তু কেউ তার রহস্যভেদ করতে পারেনি। আরবি, ফার্সি, কোনো ভাষার সংঙ্গে এসব মুদ্রার বর্ণ মেলেনি। বেশ কয়েকটি মুদ্রা আছে যেগুলোতে কোনো ধরনের কোনো কিছুই লেখা নেই। ধাতব মুদ্রার সাথে তিনি শতাধিক দেশের কাগজের নোট ও সংগ্রহ করেছেন। এ সব নোটের মধ্যে স্বাধীন বাংলাদেশের নোটও রয়েছে।
শুধু মদ্রাই নয়, মুদ্রা সংগ্রহ করতে গিয়ে লিয়াকত আলীর নিজের অজান্তেই লটারি টিকিটের দুর্লভ আরেকটি সংগ্রহ গড়ে তুলেছেন। সহধর্মীনী মারা গেছেন কয়েক বছর পূর্বে। পাখি অার সংগ্রহশালাই এখন তার জীবন। নিরাপত্তার কথা ভেবে কোথাও বেড়াতে যান না তিনি।
১৯৬৯ সালের ঘূর্ণিঝড়ে দুর্গতদের সাহায্যার্থে রেডক্রসের ১ টাকার লটারির টিকিট থেকে শুরু করে এ বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত থ্যালাসেমিয়া রোগীদের সাহায্যার্থে বিক্রয়রত লটারির টিকিটও সংগ্রহ করেছেন তিনি।
লিয়াকত আলী খানের দাবি ১৯৬৯ সালের পাকিস্তান থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারের অনুমোদিত সবগুলো লটারির টিকিট তার কাছে আছে। তার বিশ্বাস, ধাতব মুদ্রার মতো অর্থনৈতিক মূল্য না থাকলেও এসব দেশের লটারির টিকিটের একটি ঐতিহাসিক মূল্য নিশ্চয়ই আছে।
৬০ বছরে পা দেওয়া ৩ সন্তানের জনক লিয়াকত আলী খানের আকাঙ্খা- পৃথিবীর সবগুলো দেশের মুদ্রা সংগ্রহ করা। এ সংগ্রহশালার একটি জাতীয় প্রদর্শনী করে নতুন প্রজন্মের কাছে তা তুলে ধরার আশা আছে তার।
ইত্তেফাক/এমআই