যানজট কমাতে ঢাকঢোল পিটিয়ে রাজধানীর পাশে ওয়াটার বাস চালু করা হয়েছিলো। কিন্তু দুর্নীতি ও নানা অনিয়মের কারণে জনপ্রিয় এ সার্ভিসটি প্রায় বন্ধ হতে চলেছে। ১২টি ওয়াটার বাসের মধ্যে এখন চালু আছে মাত্র ৫টি। অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন সংস্থা (বিআইডব্লিউটিসি) চালু থাকা বাসগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ঠিকমতো করছে না। কম সময়ে রাজধানীর একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে যাতায়াতের জন্য যাত্রীরা শুরুর দিক থেকে এ সার্ভিস ব্যবহার করে আসছিলেন। এতে খরচও হতো কম। কিন্তু বিআইডব্লিটিসির কতিপয় কর্মকর্তা কর্মচারীর কারণে প্রায় ডুবতে বসেছে এ সার্ভিসটি।
এ বিষয়ে বর্তমানে ওয়াটার বাসের ইজারা পাওয়া ইমরান ট্রেডার্সের মালিক আলী আশরাফ বিআইডব্লিউটিসি’র কর্মকর্তাদের দুর্নীতির বিষয়ে খেলোমেলাভাবে বলেছেন। তিনি বলেন, একটি বাসের সামান্য সমস্যা হলে যেখানে সাধারণ কারিগর দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব, সেখানে বাসগুলো দেয়া হয় ডকইয়ার্ডে। আর বাসগুলো মেরামতে তখন খরচ হয় দ্বিগুণেরও বেশি। এছাড়া বাসগুলো পরিচালনার দায়িত্বে থাকা মাস্টার ও ড্রাইভারদের বিরুদ্ধেও তেল চুরির অভিযোগ করেন তিনি। একটি বাসের সমস্যা হলে তারা ঠিকমত সার্ভিসিংও করে দেয় না বলে দাবি তার।
বিআইডব্লিউটিসি’র কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে তিনি বলেন, এমন কোনো ব্যক্তি নেই যিনি সার্ভিসটি ইজারা পাওয়ার পর ঘুষ নেননি। কেননা ঘুষ না দিলে তার?া বন্ধ করে দেবেন বলে হুমকি দেন। তিনি দাবি করেন, ওয়াটার বাস সার্ভিসের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের দুর্নীতি বন্ধ হলে সার্ভিসটি লাভের মুখ দেখতে পাবে। কেননা ১২টি ওয়াটার বাসের কোনো বাসেই নেই ভালোমানের যন্ত্রাংশ। দুর্নীতি বন্ধ করে ভালোমানের যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপন করলেই সার্ভিসটি লাভের মুখ দেখবে।
তবে বিআইডব্লিউটিসি’র চেয়ারম্যান মো. মিজানুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, যতদূর জানি যাত্রী স্বল্পতা ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সার্ভিসটি লোকসানে পড়েছে। সরকার ভর্তুকি দিয়ে হলেও এই জনপ্রিয় সার্ভিসটিকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।
প্রসঙ্গত: ২০০৪ সালে ১০৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকার চারপাশের ৩২ কিলোমিটার নৌপথ উদ্ধার করা হয়। সেই সঙ্গে সদরঘাট থেকে টঙ্গী পর্যন্ত বিআইডব্লিউটিএ ১০টি ল্যান্ডিং স্টেশন স্থাপন করে। তখন পরীক্ষামূলকভাবে গাবতলী টু আমিনবাজার রুটে ওয়াটার বাস সার্ভিস চালু করা হয়। সে সময় যাত্রীরা উত্সাহিত হলেও বিভিন্ন কারণে বন্ধ হয়ে যায় সার্ভিসটি। পরবর্তী সময়ে ২০১০ সালের আগস্টে প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে আরো দুটি ওয়াটার বাস নিয়ে পুনরায় চালু করা হয় সার্ভিসটি। কিন্তু ১১ মাস যেতে না যেতেই এসব ল্যান্ডিং স্টেশন বেদখল হয়ে যায়।
পরে ২০১৩ সালে আগের ঘাট বাতিল করে গাবতলী রুটে আবার প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে আরো ৪টি ওয়াটার বাস ন?ামানো হয়। তখন বছর যেতে না যেতেই বিকল হয়ে যায় এসব ওয়াটার বাস। পরে দৈনিক প্রায় ৪০ হাজার টাকা লোকসান দেখিয়ে সার্ভিসটি ছেড়ে দেয়া হয় একটি বেসরকারি মালিকানা খাতে। কিন্তু তারাও লোকসানের কারণে বেশি দিন টিকে থাকতে পারেনি। অভিযোগ আছে নিম্নমানের যন্ত্রাংশ দিয়ে ওয়াটার বাসগুলো তৈরি করেছে বিআইডব্লিউটিসি।
বিআইডব্লিউটিসি’র চলতি বছরের মার্চ মাসের হিসাব বলছে, মোট আয় ১,১৫,৩৬৪ আর জ্বালানি খরচ হয়েছে ৭,৪৩,৩১৫ টাকা। এপ্রিলে মোট আয় ১,১৬,২০৫ ও জ্বালানি খরচ ৭,৪৯,১৩১ টাকা। মে মাসে মোট আয় ১,০৯,১৫১ ও জ্বালানি খরচ ৭,৩৭,৬৬০ টাকা। এছাড়া নৌযানের রক্ষণাবেক্ষণ, কর্মচারীদের বেতন ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ তো আছেই।
অন্যদিকে বর্তমানে ওয়াটার বাসের ইজারা পাওয়া ইমরান ট্রেডার্সের জুলাই মাসের হিসাব বলছে, তাদের মোট আয় হয়েছে ২,১১,৪৮৫ টাকা। জ্বালানি খরচ হয়েছে ৯৭,৫০০ টাকা। এছাড়া বাসের বিভিন্ন মেরামতি, মাস্টার, ড্রাইভারদের খরচ ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য খাতে খরচ হয়েছে ১,২৩,৩৭০ টাকা। ফলে ইমরান ট্রেডার্সের ১ মাসে ব্যয় হয়েছে ৯,৩৮৫ টাকা। সেখানে বিআইডব্লিউটিসির লোকসান প্রতি মাসেই কয়েক লাখ টাকা।
এ বিষয়ে ওয়াটার সার্ভিসের প্রকল্প পরিচালক জিয়াউল ইসলাম বলেন, সাধারণত বড় আকারের বাসগুলোতে তেল খরছ বেশি হচ্ছে। এ বাসগুলোর ইঞ্জিন চীন থেকে আনা হয়েছে। তিনি ছোট বাসগুলোগুলোর দায়িত্বে ছিলেন বলে জানান। তবে তিনি দুর্নীতির বিষয়টি অস্বীকার করেন।
ইত্তেফাক/এএন