সংকটে ফুটবল

উন্মাদনার খেলা ফুটবলে যেন খেই হারিয়ে ফেলেছে বাংলাদেশ। যে খেলাটি ৯০ মিনিট পর্যন্ত দর্শকদের মুগ্ধ করে রাখে, তা থেকে যেন ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছেন দর্শকরা। ইউরোপ, ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর খেলা বাংলাদেশের দর্শকরা মন দিয়ে দেখলেও অনেকে বাংলাদেশের ফুটবল খেলার খবরও রাখছেন না ইদানীং। এমনকি হালে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের নামে দল গড়ে সেখানে যে টুর্নামেন্ট চলছে তা-ও দেখছেন বাংলাদেশের দর্শকরা। অথচ দেশের খেলা নিয়ে তাদের মধ্যে কোন আগ্রহ-উদ্দীপনা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। এর মূল কারণ সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন আনাড়ি টিমের কাছে বাংলাদেশ জাতীয় দলের শোচনীয় পরাজয়। এতে দর্শকদের মনে এমন ধারণা জন্মেছে যে দেশের ফুটবল হয়তো ‘অন্তিম শয়ানে’ চলে গেছে। এখন চারিদিকে ফুটবল নিয়ে শুধুই গভীর হতাশা।
 
দেশে ফুটবলের এই সংকটের জন্য অবশ্য অভিযোগের আঙ্গুল উঠেছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) কর্মকর্তাদের দিকে। কিন্তু তারা এসব অভিযোগ আমলে না নিয়ে নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছেন। নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে কর্মকর্তারা নির্বাচিত হচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু নির্বাচনের পর ফুটবলের উন্নয়ন বাদ দিয়ে তারা ব্যক্তিগত আর্থিক সুযোগ-সুবিধার দিকে ঝুঁকে পড়ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ফেডারেশনের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার পাশাপাশি পদ ব্যবহার করে নিজেদের ব্যবসার পরিসরও বাড়িয়েছেন অনেকে।  
 
দেশের সাধারণ মানুষ এখন আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে দুর্ভাবনায় রয়েছেন। সামপ্রতিক সময়ে এশিয়ান কাপ ফুটবলের বাছাইয়ে প্লে-অফ ম্যাচে ভুটানের কাছে হারায় হতাশ তারা। কিন্তু ফেডারেশনের কর্মকর্তারা সাধারণ দর্শকদের এই হতাশাকে মোটেই গুরুত্ব দিচ্ছেন না। উল্টো খেলোয়াড়দের দোষ দিচ্ছেন কর্তা ব্যক্তিরা। ফেডারেশনের সভাপতি কাজী মো. সালাহউদ্দিন তো বলেই বসলেন, ‘প্লেয়াররা ভালো খেলেনি। আমি তো মাঠে গিয়ে খেলে দিতে পারবো না।’ এসময় তিনি নিজেদের মাঠে বিশ্বকাপে জার্মানির কাছে  ব্রাজিলের ৭ গোল হজম করার কথাও স্মরণ করিয়ে দিলেন।
 
দেশের ফুটবলের যারা দায়িত্ব নিয়েছেন, তারা কতটুকু ফুটবলের জন্য কাজ করছেন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ নানা ফোরামে ফুটবলের ব্যর্থতার কথা আলোচনায় আনছেন। প্রতিবারই নির্বাচনের সময়ে ফেডারেশনের প্রার্থীরা কথার ফুলঝুরি দিয়ে দেশের মানুষের আশাকে চাঙ্গা করেন। বড় স্বপ্ন দেখান। নির্বাচনের পরই ফুটবল উন্নয়নের কথা ভুলে গিয়ে কর্মকর্তারা নিজেদের ভাগ্য উন্নয়নে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।বাফুফে ভবনে শুধু ‘অর্থের খোঁজ’ :গত কয়েক বছর বাফুফে কার্যালয়ে গিয়ে যে বিষয়টি পরিষ্কার হয়েছে তা হলো- ফুটবল নিয়ে ফেডারেশনেও আলোচনা কম হয়। ফেডারেশনে আসার সময়ও নেই অনেকের। যারা আসেন তাদের মাথায়ও ফুটবল ভাবনা নেই। নিজেদের ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক স্বার্থ না থাকলে বাফুফেতে কেউ আসেন না। বাফুফের অনেক কর্মকর্তা আছেন যারা ব্যবসায় অঙ্গনে বাফুফের পরিচয়কে কাজে লাগান। অনেক কর্মকর্তা একে অন্যের সহযোগিতায় বাফুফের ভেতরেই ব্যবসা করেন এবং পছন্দের সদস্যকে ব্যবসা করার সুযোগ করে দেন। দুপুরে বাফুফে ভবনে প্রতিদিন গণমাধ্যম কর্মীদের ভিড় থাকে। তারা চলে গেলেই বাফুফের চিত্র বদলে যায়। শুরু হয় বিল-ভাউচার নিয়ে ছোটাছুটি। বিল-ভাউচার আর ভাগ-বাটোয়ারার কাজে রাত পর্যন্ত বাফুফের ঘরে আলো জ্বলে। অথচ পাশেই যখন বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে খেলা হয় তখন বাফুফের দুই একজন ছাড়া মাঠে কোনো কর্মকর্তাকেই দেখা যায় না।
 
সামপ্রতিক সময়ে ভুটান বিপর্যয় প্রসঙ্গে বাফুফে সভাপতি কাজী সালাহউদ্দিন বলেলেন, ‘অবশ্যই এটা আমাদের খারাপ সময়। আমি ব্যক্তিগত ভাবেও বলব, এমন পারফরম্যান্স হবে এটা আমি জানতাম। কারণ জাতীয় দলের ফুটবলারদের পারফরম্যান্স ভালো না।’ জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের উপর রীতিমতো ক্ষুব্ধ তিনি। বললেন, ‘খেলোয়াড়দের সব সুযোগ-সুবিধা দেয়ার পরও তাদের পারফরম্যান্স সন্তুষ্ট হওয়ার মতো নয়।’
 
এশিয়ার বড় কোনো দলের বিপক্ষে বাংলাদেশ হারতেই পারে। তাই বলে কেন মালদ্বীপ, ভুটানের মতো ফুটবল শক্তির কাছে হারতে হবে? এ নিয়ে সাধারণ দর্শকদের মতো ক্ষুব্ধ সাবেক ফুটবল তারকা কায়সার হামিদও। ভুটানের কাছে হারার পর কায়সার হামিদ ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন। তিনি ইত্তেফাককে বলেন,‘কী আর বলব। আমার কোনো ভাষা নাই। আমরা মালদ্বীপ-ভুটানকে বলে কয়ে হারিয়েছিলাম। ওরা একসময় আমাদের ভয়ে কাঁপতো। সেই মালদ্বীপ-ভুটান কি না আমাদের হারায়। হায়রে কপাল!’ সাবেক এই ডিফেন্ডার আরো বলেন, ‘ভুটানকে আমাদের খেলোয়াড়রা ঘরের মাঠেই তো হারাতে পারেনি। ওখানে (ভুটান) গিয়ে কিভাবে হারাবে?’
 
ফিফা র্যাংকিংয়ে তলানিতে বাংলাদেশ:একটা সময় দেশের মানুষ মনে করতো সংগঠকদের চেয়ে সাবেক খেলোয়াড়রা ফেডারেশনের মসনদে বসলে ফুটবল এগুবে। অথচ ব্যালটের রায়ে নির্বাচিত হয়ে সাবেক ফুটবলার কাজী সালাহউদ্দিন, সালাম মুর্শেদী, বাদল রায়, আরিফ খান জয়, শেখ মো. আসলাম, সত্যজিত দাস রুপু, ইকবাল হোসেন, বিজন বড়ুয়া, সংগঠক হারুনুর রশিদ, কাজী নাবিল আহমেদ, শওকত আলী খান জাহাঙ্গীররা পালাক্রমে ক্ষমতায় এসে দেশের ফুটবলকে এগিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে লজ্জায় ডুবিয়েছেন। ফল হয়েছে ফিফার র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশ এখন ইতিহাসের সর্বনিম্ন স্থানে। ২০৯ দেশের মধ্যে ১৮৮ নম্বরে। দক্ষিণ এশিয়ায় একমাত্র শ্রীলঙ্কা আর পাকিস্তানই আমাদের চেয়ে পিছিয়ে।
 
২০০৮ সালে কাজী সালাহউদ্দিন যখন বাফুফে সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন তখন ফিফার র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৭৮। তার হাতেই এক বছরে ২০০৯ সালে উঠে যায় ১৪৯ এ। এরপর এক বছরে ১০ ধাপ কমে গিয়ে ২০১০ সালে বাংলাদেশের অবস্থান হয় ১৫৯। এরপর প্রতি বছর একটু একটু করে র্যাংকিংয়ের নীচের দিকে নামতে থাকে বাংলাদেশ। ২০১১ সালে ১৫৭, ২০১২ সালে ১৬৮। ২০১৩ সালে অবশ্য একটু ঘুরে দাঁড়ায়, ৪ ধাপ উপরে ১৬৪ নম্বরে উঠে। ২০১৪ সালে এক ধাপ নামলেও আন্তর্জাতিক ফুটবলে বাংলাদেশের সবচেয়ে টার্নিং পয়েন্ট ছিল এই বছর। র্যাংকিংয়ে ভালো অবস্থানে থাকার কারণে বাংলাদেশ ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপ এবং ২০১৯ এশিয়ান কাপ ফুটবলের বাছাইয়ে ঢুকে যায়। বাংলাদেশ অনেক ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়ে যায়। শেষ ম্যাচটায় ভুটানের কাছে হারার পর আবার স্বপ্ন ভাঙে। চারদিকে ‘জবাব চাই, জবাব চাই’ শ্লোগান ওঠে। ভুটান থেকে ফিরে খেলোয়াড়রা ফোন ধরেন না। বাফুফের কর্মকর্তারা ফুটবল ভবনে আসা বন্ধ করে দেন। কর্মকর্তাদের মুন্ডুপাত করেন ক্ষুব্ধ দর্শকরা।
 
সাবেকরা যা বললেন: ফুটবলের এই সংকট সৃষ্টির জন্য সাবেক তারকা কায়সার হামিদ ফুটবল কর্মকর্তাদের পদত্যাগ চেয়ে বললেন, ফেডারেশনের লজ্জা থাকলে বলা উচিত ছিল ‘আমরা পারলাম না পদত্যাগ করলাম।’ শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্রের সভাপতি নুরুল আলম চৌধুরী একধাপ এগিয়ে বললেন, ‘ফুটবলের এই দশার জন্য শুধু বাফুফের বর্তমান কমিটি নয়, যারা ভোট দিয়ে দ্বিতীয়বার এই কমিটিকে নির্বাচিত করেছেন তারাও দায়ী।’
 
জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক আলফাজ আহমেদ বললেন, ‘ফুটবল সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে হবে। খেলোয়াড় সংকট দূর করতে তৃণমূল থেকে তুলে আনতে হবে ফুটবলার। সোহরাওয়ার্দী কাপ, শেরে বাংলা কাপ চালু হলে খেলোয়াড় সংকট দূর হবে। পাশাপাশি বন্ধ করতে হবে বিদেশি ফুটবলার আনা।’
 
৯৯ এর সাফ গেমস ফুটবল চ্যাম্পিয়ন দলের অধিনায়ক জুয়েল রানাও খুবই হতাশ। তার মতে, এদেশের ফুটবলে নাকি আর উন্নতিই হবে না। তিনি বলেন, ‘শুধু ঢাকায় ফুটবল হলে হবে না। জেলায় ফুটবল হলে পনের ষোল বছরের ছেলেরা সেখানে লিগ খেলবে। পরিণত হলে ঢাকায় আসবে। কিন্তু গ্রামে তো লিগ খেলা নাই, টার্গেটও নাই। তাহলে খেলোয়াড় আসবে কোথা থেকে?