শিশুপার্ক চলে ৩৭ বছরের পুরনো খেলনায়

সবুজ পাতারা কেমন, বিকাল বেলা আকাশ কেমন করে রঙ বদলায়, ঘাসফুল, প্রজাপতি, পাখিরা কেমন— এসবের কিছুই জানে না রাজধানী ঢাকার অনেক শিশু। নদী-নালা, গাছপালা আর প্রকৃতি সম্পর্কে ওদের যতটুকু জ্ঞান, জানাশোনা- সবই পড়ার বই আর টেলিভিশনের কল্যাণে। রাজধানীতে অসংখ্য শিশু বেড়ে উঠছে দেহ ও মনে যান্ত্রিকতা নিয়ে। কম্পিউটার গেমস আর টেলিভিশনে রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ।
 
এমন ইট-পাথরের শহরে শিশুদের বিনোদন যেনো সোনার হরিণ! আর বিনোদন কেন্দ্র যাও আছে সেসবের অবস্থাও ভালো না। এই যেমন শাহবাগের শহীদ জিয়া শিশুপার্কের কথাই বলা যাক। ৩৭ বছরের পুরনো খেলনা দিয়ে চলছে এই শিশুপার্ক। ৪৫ বিঘা জমির উপর গড়ে উঠেছে এই পার্ক। এখানে সরকারি ১১টি এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ৩টি খেলনা রয়েছে। সরকারি খেলনা বেশিরভাগই ঝুঁকিপূর্ণ। আর বেসরকারি খেলনায় গলাকাটা ফি আদায় করা হয়। এই পার্কের ভেতরে-বাইরে আবর্জনার ছড়াছড়ি। বাড়তি পাওনা হিসেবে আছে হকারদের উত্পাত। পার্কিংয়ের জায়গায় রয়েছে অবৈধ দোকানপাট। এছাড়া পার্কের নিরাপত্তা বেষ্টনীও খুব একটা যুত্সই নয়। তবে ইতিবাচক কেবল-সপ্তাহের একটি দিন সুবিধাবঞ্চিত ও অসচ্ছল শিশুদের বিনামূল্যে প্রবেশের ও খেলনায় উঠার সুযোগ দেয়া হয়। তবে শিশুপার্কের খেলনা থেকে পড়ে অনেক দুর্ঘটনার ঘটনাও ঘটেছে। অবশ্য শিশুপার্কের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন বলছে, আন্তরিকার সঙ্গেই বিষয়টি দেখভাল করা হচ্ছে। তবে দুর্ঘটনার বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলেও জানান সংস্থাটির কর্তা-ব্যক্তিরা।
 
সরেজমিনে দেখা যায়, যন্ত্রপাতি অকেজো হওয়ায় ‘রোমাঞ্চ চক্র’ খেলনাটির বেহাল দশা। ‘উড়ন্ত বিমান’ নামক খেলনারও পর্যাপ্ত সিটবেল্ট নেই। প্রতি বছর পহেলা বৈশাখের সময় উড়ন্ত বিমানের সিটবেল্ট লাগানো হয় বলে জানা গেছে। তবে কিছুদিনের মধ্যেই তা নষ্ট হয়ে যায়। এ কারণে সিটবেল্ট ছাড়াই উড়ন্ত বিমান খেলনা চালাতে হয় বছরে বাকি সময়ে।
 
উড়ন্ত নভোযানেরও বেহাল দশা। নিরাপত্তা বেষ্টনী ছাড়াই ঝুলন্ত তারে ঘুরছে শিশুরা। ‘ব্যাটারি কার’ খেলনাও অত্যন্ত জীর্ণশীর্ণ। ‘ফুলদানি আমেজ’ খেলনার বসার সিট, নিচের মেঝে ও দড়ির বেহাল দশা। ‘এফ-৬ জঙ্গি বিমান’ অত্যন্ত নোংরা। অনেকদিন ধরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং রঙ করা হয় না। এছাড়া বিস্ময়চক্র, আনন্দ ঘূর্ণি, ঝুলন্ত চেয়ার, লম্ফজম্ফ এবং রেলগাড়িরও করুণ দশা। মেয়াদ উত্তীর্ণ এসব খেলনা অনেকটা ঝুঁকি নিয়ে চালানো হচ্ছে।
 
সরকারি খেলনার বাইরে তিনটি খেলনা রয়েছে শিশুপার্কে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অনুমতি নিয়ে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ৯-ডি এনিমেশন ও দুটি ঝুলন্ত নৌকার খেলনা রাখে। সবচেয়ে বেশি ফি আদায় করা হয় এই তিনটি খেলনায়। এসব খেলনা সাধারণ পরিবারের শিশুরা ব্যবহার করে না। তবে শাহবাগ শিশুপার্কে নতুন উন্নতমানের খেলনার ব্যবস্থা করা এবং বেসরকারি খেলনা বের করে দেয়ার দাবি জানিয়েছে দর্শনার্থীরা।
 
ঢাকা দক্ষিণ সিটির যান্ত্রিক বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, শহীদ জিয়া শিশুপার্কের অবস্থা খুব একটা ভালো না। অনেক পুরনো যন্ত্রাংশ দিয়ে কোনো রকমে খেলনাগুলো পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে দুর্ঘটনার বিষয়ে তারা সতর্ক রয়েছেন বলে জানান তিনি। শিশুপার্কের যত্রতত্র আবর্জনার ছড়াছড়ি। দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা রুটিন অনুযায়ী পার্ক পরিষ্কার করে না বলে জানা গেছে। শিশুপার্কের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কোনো তদারকিও করেন না।
 
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা খোন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিন শিশুপার্কের আবর্জনা পরিষ্কার করা হয়। তবে অবৈধ দোকানপাটের কারণে আবর্জনা বেশি হয় বলে তিনি জানান।
 
শিশুপার্কের ভেতর কিছু বৈধ দোকান বরাদ্দ দিয়েছে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। তবে এসব দোকানের মালিকরা অবৈধভাবে পার্কের ভিতরে ফাস্টফুড বিক্রি করছে। এছাড়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পাশের সীমানা বাউন্ডারি পার হয়ে শিশুপার্কে প্রবেশ করে হকাররা।
 
উল্লেখ্য, ১৯৭৯ সালে শিশুপার্কটি প্রতিষ্ঠিত হয়। শিশুদের বিনোদনের জন্য পাবলিক সেক্টরে প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রথম এই শিশুপার্কটি ১৯৮৩ সাল থেকে বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে যাত্রা শুরু করে। শিশুপার্কের প্রতি খেলনা ৮ টাকা হারে ৬টি খেলনা ব্যবহার করতে দেয়া হয়। প্রতি শুক্রবার পার্কটি ২.৩০-৭.৩০ টা পর্যন্ত চালু থাকে। রবিবার ছাড়া শনি থেকে বৃহস্পতিবার ২-৭টা পর্যন্ত খেলনা চালু থাকে। এই শিশুপার্কে প্রতিদিন ছয় হাজারের অধিক দর্শনার্থী আসে। তবে বিভিন্ন উত্সবে দর্শনার্থী কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
 
ইত্তেফাক/এএন