বাফুফে কর্মকর্তাদের হাতের পুতুল কোচ

 
অনূর্ধ্ব-১৬ প্রথম পাইওনিয়ার ফুটবল উদ্বোধন করতে ’৮১ সালে ঢাকায় এসেছিলেন ফিফার তৎকালীন সভাপতি ড. জোয়াও হ্যাভালাঞ্জ। ঢাকা স্টেডিয়ামে ৮০টা দল নিয়ে খেলার উদ্বোধন করতে এসে বলেছিলেন ‘বাংলাদেশে এতো ফুটবলার? এতো ফুটবল প্রতিভার দেশ বিশ্বকাপ ফুটবলে না খেলে পারে না।’  ফিফার সভাপতি এক দেখায় বাংলাদেশের ফুটবলে সম্ভাবনার কথা বুঝলেও, বুঝলেন না শুধু বাংলাদেশের ফুটবল সংগঠকরা।  
 
গত ৮ বছরে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে ১৩ জন কোচ পরিবর্তন করা হয়েছে জাতীয় দলে। কিন্তু ফুটবলের উন্নতির পরিবর্তে অবনতি হয়েছে বেশি। জাতীয় দল গঠন নিয়ে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) কর্মকর্তারা অধিকাংশ কোচকে হাতের পুতুল বানিয়েছেন। কোচের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দকে তোয়াক্কাই করেননি কর্মকর্তারা। কোচ একটু এদিক-সেদিক করলেই নানাভাবে বশে আনা হয়েছে তাকে। অভিযোগ আছে যে, কোনো কোনো কোচকে নিজেদের বাগে রাখতে অনৈতিক সুবিধাও দিয়েছেন কর্মকর্তারা। এতে বাফুফেতে কর্মকর্তাদের প্রতাপ বাড়লেও ফুটবল হেঁটেছে পেছনের দিকে। তবে ২০০৫ সালে বাংলাদেশে আসা আর্জেন্টাইন কোচ আন্দ্রেস ক্রুসিয়ানী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলেছেন, বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের জন্য বিদেশি কোচ প্রয়োজন নেই। তৃণমুল পর্যায়ে বিভিন্ন বয়সের খেলোয়াড়দের গড়ে তুলতে বিদেশি কোচ প্রয়োজন।
 
একটি দেশের ফুটবলের আয়না হচ্ছে জাতীয় দল। জাতীয় দলের পারফরম্যান্স দেখলে ওই দেশের ফুটবল সম্পর্কে ধারণা মেলে। মালদ্বীপ কিংবা ভুটানের কাছে হারের পর বলাই যায় খুব নিচে আছে ফুটবল। আর কষ্টে আছে ফুটবলপ্রেমীরা। স্বাধীনতার এত বছর পরও নিরপেক্ষভাবে একটি জাতীয় দল গড়া হয়নি। ইদানিংকালে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। দল নিয়ে বার বার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গিয়ে ভালোর বদলে খারাপটাই হয়েছে বেশি।
 
কর্মকর্তারা শুধু খেলোয়াড় নির্বাচন করেই তাদের কাজ সারেন। ক্যাম্প চলাকালে খেলোয়াড়রা কতটুকু শৃংখলার মধ্যে থাকে সে খবর তারা রাখেন না। ‘কোড অব কন্ডাক্ট’  থাকলেও খেলোয়াড়রা চলেন নিজের মতো করে। যে কারণে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স ভালো হয় না। টুর্নামেন্ট শেষে শোনা যায়, খেলোয়াড়দের মধ্যে শৃংখলার অভাব ছিল। গভীর রাতে ক্যাম্পে ফেরা, রুমে বসেই মদ পান করা অনেক খেলোয়াডের জন্য নিত্য-নৈমিত্তিক। এমনও দেখা গিয়েছে যে, খেলার আগে জাতীয় দলের কিছু খেলোয়াড় তাস খেলছেন।
 
এদিকে, জাতীয় ফুটবল দল গঠনে কার্যকরী কোনো পরিকল্পনা নেই বাফুফের। বিদেশি কোচ থেকে শুরু করে খেলোয়াড় নির্বাচকরা পর্যন্ত জাতীয় দলকে নিজের স্বার্থে বার বার ভাঙ্গেন। পারফরমেন্স বিচার না করে যখন যাকে খুশি জাতীয় দলে রাখেন। যাকে খুশি বাদ দেন। জাতীয় দলে জায়গা হলেও খেলোয়াড়রা সবসময় ভয়ে থাকেন কখন তাদের বাদ দেয়া হবে। এজন্য শুধু কর্মকর্তাদের নয়, কোচকেও খুশি রাখতে হয় তাদের। কর্মকর্তার সাথে সম্পর্ক ভালো না হলে ওই খেলোয়াড়কে দলে  নেয়া হয় না। কোচের সাথে খেলোয়াড়ের সম্পর্ক ভালো না হলেও বাদ। এ যেন উভয় সংকট। ক্লাব এবং জাতীয় দলে একই ব্যক্তি ম্যানেজার থাকলে ফুটবলের আরো বারোটা বাজে। ক্লাবের খেলা বন্ধ থাকায় খেলায়াড়দের পারফরমেন্স ধরে রাখতে ওই ম্যানেজার তাদের জাতীয় দলে নিয়ে নেন।
 
আরো ভয়ংকর খবর হচ্ছে ২০১৪ সালে বিদেশি কোচকে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ করে দিয়ে নিজের মনগড়া দল গড়েছেন একজন কর্মকর্তা। গুলশানের একটি বড় হোটেলে ওই কোচের ব্যক্তিগত বিল হয়েছিল সাড়ে ৬ লাখ টাকা। বাফুফের ওই কর্মকর্তা নিজের পকেট থেকে সে টাকা পরিশোধ করার দাবী করেন। যে কারণে তিনি যা বলেন বিদেশি কোচও তাই করেছিলেন।
 
স্বাধীনতার পর জাতীয় দল নিয়ে বড় কোনো পরিকল্পনা তৈরি করা হয়নি। বর্তমান ফুটবল কর্মকর্তারা ফুটবল উন্নয়নের কথা বললেও জাতীয় দলের জন্য সুনির্দিষ্ট এবং বাস্তবমুখী পরিকল্পনা করতে পারেননি। ফুটবল দুনিয়ায় সব দেশে জাতীয় দলের পেছনে একাধিক পাইপলাইনে খেলোয়াড় থাকে। যেখান থেকে খেলোয়াড় আসে মূল জাতীয় দলে। বাংলাদেশের ফুটবলে নেই দ্বিতীয় এবং তৃতীয় জাতীয় দল। বাফুফে সভাপতি কাজী সালাহউদ্দিন খেলোয়াড়দের ঘাড়ে সব দায়িত্ব দিয়ে বলেছেন, 'আমি বিদেশি কোচ এনেছি। খেলোয়াড়দের মান বাড়াতে চেষ্টা করেছি। খেলোয়াড়দের কাজটা খেলোয়াড়দেরই করতে হবে।'
 
এখনকার ফুটবলারদের মান নিয়ে নানা প্রশ্ন আছে এটা ঠিক। ভুটানের বিপক্ষে বাংলাদেশের খেলা যারা দেখেছেন তারা খেলোয়াড়দের দায়ী করেছেন। জাতীয় দলের সাবেক ডিফেন্ডার প্রদীপ পোদ্দার অনেকটা মজা করেই বললেন, 'দাঁড়িয়ে থাকলেও ৩ গোলে ভুটানের কাছে হারা সম্ভব না। ভুটান ভালো খেলেছে ঠিকই, কিন্তু যেভাবে বাংলাদেশ গোল হজম করেছে তাতে খেলোয়াড়দের পারফরমেন্স নিয়ে কথা উঠতেই পারে। বাফুফের সিনিয়র সহ-সভাপতি সালাম মুর্শেদী বললেন, ‘আগে খেলোয়াড়দের নামের উপর দর্শক মাঠে আসতো। এখন সে ধরনের কোনো খেলোয়াড় নেই মাঠে। কার খেলা দেখতে আসবেন দর্শক।'
 
ইত্তেফাক/আরএ