দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য পাঁচ তরুণের উদ্ভাবন

 
আমাদের চারপাশ থেকে আমরা যেসব তথ্য পেয়ে থাকি, তার ৯০ শতাংশই আমরা পেয়ে থাকি চোখের মাধ্যমে। কিন্তু বর্তমানে সারা বিশ্বে অন্ধত্ব সমস্যায় ভুগছে, এমন মানুষের সংখ্যা প্রায় ২৮৫ মিলিয়ন। এর মধ্যে ৯০ শতাংশই বাস করে বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশে। এসব মানুষের মধ্যে অধিকাংশই নিম্ন আয়ের হওয়ায় তাদের দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেতে অধিকাংশ মানুষই কিছু করতে পারেন না। ফলে এ সকল মানুষ যেমন স্বাভাবিক চলাচল করতে পারছে না, তেমনি চারপাশে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন তথ্য থেকেও তারা বঞ্চিত হচ্ছে।
 
দৃষ্টিশক্তি হারানো এসব মানুষের জন্য সহায়ক হিসেবে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ডিভাইস বা প্রযুক্তি। কিন্তু এর অধিকাংশই বেশ ব্যয়বহুল হওয়ায় তা অধিকাংশ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের পক্ষে ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। এমনই ভাবনা থেকে একটি বিশেষ ডিভাইস তৈরির পরিকল্পনা মাথায় আসে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িত্ কৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আহমেদ ইমতিয়াজ হুমায়ুনের। সাথে ছিল আরো চার বন্ধু মাহিন, নাফিস, রিফাত ও তমাল। মূলত তৃতীয় বর্ষে থাকাকালীন সময়ে মাইক্রো কন্ট্রোলার ল্যাবের অংশ হিসেবে এই পরিকল্পনার বাস্তব রূপ দেন তারা।
 
তাদের তৈরি ডিভাইসটি দেখতে অনেকটা বর্তমান সময়ের ভার্চুয়াল রিয়েলিটি হেডসেটের মতো। পরিধেয় এ ডিভাইসটিতে আছে দুটি ক্যামেরা এবং একটি প্রসেসিং ইউনিট। আরও আছে দুটি হেডফোন। এই ডিভাইসটি এর ব্যবহারকারীকে চলাচলে যেমন সহায়তা করবে, তেমনি চারপাশে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার খবরও জানাবে।
 
ডিভাইসটি এর ক্যামেরার মাধ্যমে সামনে থাকা বিভিন্ন বস্তুর ছবি তোলে। সেই বস্তুটি অন্ধ ব্যক্তি থেকে কত দূরে এবং তার বাস্তবিক অবস্থান, প্রথমেই এসব কিছু হিসেব করে বের করে ডিভাইসটি। এরপর বিশ্লেষণ শেষে হেডফোনের মাধ্যমে ব্যবহারকারীকে ডিভাইসটি বলে দেয় যে সামনে কত দূরে কোনো ব্যক্তি বা বস্তু অবস্থান করছে।
 
দ্বিতীয়ত, এর মাধ্যমে সামনে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনার বর্ণনা দেবে ডিভাইসটি। ডিভাইসে থাকা একটি নির্দিষ্ট বাটন প্রেস করলেই ডিভাইসটি সামনের বিভিন্ন ঘটনার ছবি তুলবে এবং সেগুলো বিশ্লেষণ করতে শুরু করবে। বিশ্লেষণ শেষে ব্যবহারকারীকে জানাবে সামনে কী ঘটছে। এ ফিচারটি সম্পর্কে ইমতিয়াজ বলেন, ‘একজন অন্ধ ব্যক্তি যে শুধু চলাচলে সমস্যায় পড়েন তা নয়, অনেক সময় তার আশপাশে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন কিছু সম্পর্কেও জানার ইচ্ছা জাগে। যেমন ধরুন, তার সামনে যদি কেউ হাসাহাসি করে তখন তার অন্য কারও কাছ থেকে জেনে নিতে হয় যে তারা হাসছে কেন। কিন্তু আমাদের তৈরি এই ডিভাইসটি সে কাজটাও করে দেবে। ক্যামেরার মাধ্যমে ছবি তুলে সেগুলো বিশ্লেষণ শেষে অন্ধ ব্যক্তিতে জানিয়ে দেবে কারা হাসছে এবং তাদের হাসির কারণ কী।’
 
এ কাজের জন্য একটি বিশেষ অ্যালগরিদম ব্যবহার করা হয়েছে যা বর্তমানে গুগল এবং মাইক্রোসফটও তাদের বিভিন্ন অ্যাপে ব্যবহার করছে। কিছুদিন আগে ঘোষণা দেয়া গুগলের পিক্সেল ফোনেও রয়েছে একই ধরনের একটি অ্যালগরিদম যার মাধ্যমে শুধু ছবির বর্ণনা দিয়ে ফোন থেকে নির্দিষ্ট কোনো ছবি খুঁজে বের করা সম্ভব। পুরো জিনিসটাই অনেকটা আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের আদলে করা হচ্ছে বলে জানান ইমতিয়াজ।
 
ডিভাইসটিতে আছে আরো কিছু প্রয়োজনীয় ফিচার। এর মধ্যে একটি হলো অন্ধ ব্যক্তি যখন কারো সাথে কথা বলবে, তখন ডিভাইসটি জানিয়ে দেবে সামনের ব্যক্তির অভিব্যক্তি। অর্থাত্ তিনি কি রাগান্বিত নাকি কথা বলার সময় হাসছেন, এসব কিছুই জানাবে এটি। এ ছাড়া একবার কোনো ব্যক্তির পরিচয় ডিভাইসে যুক্ত করা হলে পরবর্তীতে ডিভাইসটি সহজেই ওই ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে পারবে।
 
ডিভাইসটিকে স্মার্টফোনের সাথে যুক্ত করে ব্যবহার করা যাবে, এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে বলে জানান এর নির্মাতারা। আর তাই ডিভাইসটির দুটি সংস্করণ রয়েছে। এর একটি স্মার্টফোনের সাথে যুক্ত করা ছাড়াই ব্যবহার করা যায় এবং অন্যটি স্মার্টফোনের সাথে ব্লুটুথের মাধ্যমে যুক্ত করে ব্যবহার করতে হয়।
 
যেহেতু উন্নয়নশীল দেশের অধিবাসীদের কথা মাথায় রেখে ডিভাইসটি তৈরি করা হয়েছে, তাই এটি তৈরিতে যেন খুব বেশি খরচ না হয়, সেদিকেও নজর রাখতে হয়েছে নির্মাতাদের। ইমতিয়াজ জানান, ডিভাইসটির যে সংস্করণস্মার্টফোনের সাথে যুক্ত থেকে কাজ করে, সেটি তৈরিকরতে খরচ পড়বে প্রায় ৩ হাজার টাকা।
 
খরচ সীমিত রাখার জন্য বর্তমান প্রোটোটাইপে একেবারে স্বল্পমূল্যের ওয়েবক্যাম ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করে এ ধরনের ডিভাইস তৈরি করতে গেলে এর মূল্য অনেক বেশি হয় কারণ এতে শক্তিশালী কম্পিউটার যুক্ত থাকে। কিন্তু এ ডিভাইসের মূল্য যদি বেশিই হয়, তাহলে এটি তৈরির মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। এজন্য এতে কিছুটা কমদামী ওয়েবক্যাম এবং স্মার্টফোন ব্যবহার করা হয়েছে যাতে এর খরচ কমিয়ে আনা যায়। এর পাশাপাশি সম্পূর্ণ সিস্টেমটিকেই করা হয়েছে ক্লাউড বেজড। ফলে মূল ডিভাইসে খুব বেশি দামি প্রসেসিং ইউনিট ব্যবহার করা হয়নি।এতে ব্যবহার করা হয়েছে স্বল্পমূল্যের রাস্পবেরি পাই যা ডিভাইসের সাথে সার্ভারেরসংযোগ সাধনের কাজটি করবে। এখান থেকে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করার পর সেগুলো পাঠানো হবে সার্ভারে এবং সার্ভার সবকিছু বিশ্লেষণ করে ফলাফল আবার ডিভাইসে পাঠিয়ে দেবে।
 
ইমতিয়াজ জানান, যেহেতু ডিভাইসটি ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত থেকে কাজ করে, তাই এর বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন হবে ফ্রি কিংবা স্বল্পমূল্যের ইন্টারনেট। সাধারন এবং দরিদ্র মানুষ যেন সহজেই এবং কম খরচে এটি ব্যবহার করতে পারেন, তাই প্রয়োজন হবে সহজলভ্যইন্টারনেট।
সমপ্রতি জার্মানভিত্তিক বিজ্ঞান সংগঠন ফলিং ওয়ালস ল্যাবের বাংলাদেশ পর্বে বিজয়ী হয়েছে। আগামী মাসে অনুষ্ঠিতব্য ফলিং ওয়ালস ল্যাবের চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে এ মাসেই জার্মানি যাবেন ইমতিয়াজ। সারাবিশ্ব থেকে নির্বাচিত সর্বমোট ১০০ জন তরুণ বিজয়ী তাদের প্রকল্প নিয়ে হাজির হবেন সেখানে। জুরি বোর্ডে সামনে উপস্থাপন করবেন তাদের আইডিয়া।
 

ইত্তেফাক/এএম।