ভোটের আগেই ভোট পড়েছে ৩ কোটি ৭০ লাখ!

বিশ্বে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় একদিনে কিংবা কয়েক দিন ধরে। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের পদ্ধতিটা একটু ভিন্ন। দেশটিতে ভোটদানে মানুষের উত্সাহ কম। তাই ভোটের হার বাড়াতে ৪০টি রাজ্যে আগাম ভোটের বিধান রয়েছে। শপিংমল, দোকান কিংবা মানুষের সমাগম ঘটে এমন সব স্থানে বুথ বসানো হয়। ভোটাররা নিজেদের ইচ্ছামতো সেখানে গিয়ে ভোট দিয়ে আসতে পারেন। আবার অনেকে ডাকের মাধ্যমে ব্যালট পেপার নিয়ে তা পূরণ করে নির্বাচন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠান। ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত না হয়ে ভোট দেন বলে এদেরকে বলা হয় অ্যাবসান্টি ভোটার। ওয়াশিংটন ডিসি এবং ওরেগনে সব ভোটই হয় ডাকের মাধ্যমে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় ৮ নভেম্বর মঙ্গলবার মূল নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও তিন সপ্তাহ আগে থেকেই আগাম ভোট শুরু হয়েছে। আগাম ভোটের ফল আইনানুযায়ী মূল ভোট শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রকাশের বিধান নেই। ফলে তা মূল নির্বাচনে প্রভাব ফেলার কথা নয়। কিন্তু বিভিন্ন মিডিয়া এবং জরিপকারী সংস্থা বুথ ফেরত জরিপ করে ভোটদানের সম্ভাব্য তথ্য প্রকাশ করে। তাই আগাম ভোট কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলে বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। 
 
নিউইয়র্ক টাইমস শনিবার জানিয়েছে, আগাম ভোটে ৩৩ মিলিয়ন (৩ কোটি ৩০ লাখ) ভোট পড়েছে। বিবিসি জানিয়েছে, এই সংখ্যা ৩৭ মিলিয়ন বা ৩ কোটি ৭০ লাখ। এবারের আগাম ভোটে দুটো বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। একটি হিলারি ক্লিনটন এগিয়ে আছেন। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন মাধ্যমে পাওয়া তথ্যে দেখা যাচ্ছে, দুই প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা জোরালো হয়ে উঠছে। নেভাদা এবং ওহাইওতে আগাম ভোটের হার বেশি। ডেমোক্র্যাটদের জন্য এটা সুখবর। এই বছর এই দুই রাজ্যে আগাম ভোট পড়েছে ৬০ শতাংশ। ২০১২ সালে এই হার ছিল ৪০ শতাংশ। আগাম ভোটে জাতীয় এবং রাজ্যের ভোট হিসেব করে জয়-পরাজয় নির্ধারণ করা কঠিন। আর্লি ভোট ইনফরমেশন সেন্টারের গবেষক ব্রায়ান হ্যামেল সিএনএনের বরাত দিয়ে বলেন, আগাম ভোটের জাতীয় জরিপে দেখা গেছে, ৭ কোটি ৪০ লাখ ডেমোক্র্যাট এবং ৬ কোটি রিপাবলিকান ভোট দিয়েছেন।
 
আগাম ভোট অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দেখা যায়, এই ভোটের তথ্য পেয়ে ভোটাররা ভোট দেন। সাধারণত আগাম ভোটে ভালো করা প্রার্থী মূল ভোটেও ভালো করতে পারেন। তবে এবারের আগাম ভোটের সময় ট্রাম্পের নারী কেলেঙ্কারি এবং শেষ মুহূর্তে এসে হিলারির ই-মেইল ইস্যু প্রচার পায়। মূল নির্বাচন পর্যন্ত সেই প্রচারণা কিছুটা হলেও ফিকে হয়ে এসেছে। ফলে মঙ্গলবার ভোট কোন প্রার্থীর পক্ষে বেশি যাবে তা বলা খুবই কঠিন। তাই আগাম ভোটের ফল মূল ভোটের ফলকে প্রভাবিত নাও করতে পারে। আগাম ভোটে একটা বিষয় লক্ষ্যণীয়। তাহলো এই সময়টা সাধারণত তারাই ভোট দেন যারা নির্দিষ্ট কোনো প্রার্থীকে ভোট দেবেন বলে স্থির করেন বা একনিষ্ঠ দলীয় সমর্থক। এরা কোনো সংবাদ পড়ে বা অন্য কোনো ঘটনা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ভোট দেন না। ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডার আগাম ভোট বিশেষজ্ঞ সিএনবিসিকে বলেন, তিনি এবার হিস্পানিক এবং পল্লী অঞ্চলের শ্বেতাঙ্গ ভোটের দিকে নজর রেখেছেন। ট্রাম্পের মন্তব্য তাকে হিস্পানিকদের ভোট প্রদানে অনুত্সাহিত করেছে। কিছু তথ্য-উপাত্তে দেখা গেছে, হিস্পানিকরা ভোট দিতে আসছেন। আর্লি ভোট ইনফরমেশন সেন্টারের পরিচালক পল গ্রোনক বলেন, একই তত্ত্ব কাজ করছে কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের ক্ষেত্রেও। তার মতে, আগাম ভোটের ফলাফল মূল ফলাফলে খুব একটা প্রভাব ফেলবে না। কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। যেমন সব রাজ্যে ভোটাররা নিবন্ধন করেন না। আর সব রাজ্যের প্রশাসন তার সব কাউন্টির আগাম ভোটের তথ্যও প্রকাশ করেন না। ইউনিভার্সিটি অব ডেনভারের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সেথ মাস্কেট বলেন, এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিকই আছে। তিনি বলেন, কিছু রাজ্যে ২০১২ সালের আগাম ভোটের প্রভাব মূল নির্বাচনে নেতিবাচকই ছিল। নর্থ ক্যারোলিনা, লুইজিয়ানা, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া এবং ওকলাহোমায় আগাম ভোটে বারাক ওবামা এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভোট গণনা করে দেখা যায়, ওই রাজ্যগুলোতে ডেমোক্র্যাটরা হেরেছেন। পেনসিলভানিয়া এবং কলোরাডোতে রিপাবলিকানরা আগাম ভোটে এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু মূল নির্বাচনের পর ভোট গণনায় দেখা গেলো সেখানে ডেমোক্র্যাটরা জয় পেয়েছেন।
 
দ্য ফ্লোরিডা সেক্রেটারি অব স্টেটের তথ্যানুসারে ডাকের মাধ্যমে (৯লাখ ৮৫ হাজার ১৪২) এবং বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করা বুথে (১১লাখ ৮ হাজার ৪৪৪) গিয়ে ভোট দিয়েছেন ২০ লাখ ৯৩ হাজার ৫৮৬ জন রিপাবলিকান। মোট ভোটারের ৩৩ দশমিক ৪শতাংশ ভোট দিয়েছেন। ডেমোক্র্যাটদের ভোটদানের সংখ্যা ডাকের মাধ্যমে (৯ লাখ ১০ হাজার ৯০৮) এবং বুথে (১ লাখ ১৮ হাজার ৮৪৫) গিয়ে ভোট দিয়েছেন ২০ লাখ ৯১ হাজার ৭৫৩ জন যা মোট ভোটারের ৩৩ দশমিক ৪ শতাংশ। কোনো দলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন এমন ভোটারের ভোটদানের সংখ্যা ৯ লাখ ৫৫ হাজারের বেশি।
 
নেভাদায় ৪০ শতাংশ ডেমোক্র্যাট এবং ৩৬ শতাংশ রিপাবলিকান ভোট দিয়েছেন। এবিসি নিউজ জানিয়েছে, পেনসিলভানিয়ায় অ্যাবসেন্টি ব্যালটের পরিমাণ বেশি। তারা পরে ভোটদানে মন পরিবর্তনও করতে পারেন। এটা ট্রাম্পের জন্য সুবিধা বয়ে আনতে পারে। ২০১২ সালে অ্যাবসান্টি ব্যালটের হার ছিল মাত্র ৫ শতাংশ। কলোরাডোতে ডেমোক্র্যাটরা ভোটদানে এগিয়ে। ৫ লাখ ৫৪ হাজার ৩৪০ জন ডেমোক্র্যাট ভোট দিয়েছেন। রিপাবলিকানদের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ৫ লাখ ৪৭ হাজার ৭৭৫ জন। আর দলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন এমন ভোটারের সংখ্যা ৪ লাখ ২৯ হাজার ২৬৭ জন। ২০১২ সালে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী বারাক ওবামা এখানে জিতেছিলেন। নর্থ ক্যারোলিনায় ডেমোক্র্যাটদের ভোট পড়েছে ৪২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং রিপাবলিকানদের ভোট পড়েছে ৩১ দশমিক ৯ শতাংশ। উটাহতে ১ কোটি ৫ লাখ ভোটার ভোট দিয়েছেন যার মধ্যে রিপাবলিকান ৭২ হাজার ৩৫৪ জন এবং ডেমোক্র্যাট ১ লাখ ৭৬ হাজার ৬৮৭ জন।
 
নির্বাচনে প্রার্থী হবার শর্ত
 
মার্কিন নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকে অবশ্যই তিনটি শর্ত পূরণ করতে হয়। প্রথমত, সব পদে সবাইকে যুক্তরাষ্ট্র বংশোদ্ভূত হতে হবে। দ্বিতীয়ত, ৩৫ বছর বয়সী এবং তৃতীয়ত, অন্তত ১৪ বছর যুক্তরাষ্ট্রে বাস করতে হবে। প্রেসিডেন্টের মতো ভাইস প্রেসিডেন্টেও একই নিয়ম। কংগ্রেসম্যানদের বয়স ২৫ বছর ও ৭ বছর মার্কিন নাগরিক এবং সিনেটরদের বয়স ৩০ বছর ও ৯ বছর যুক্তরাষ্ট্রে বাস করতে হবে।
 

ইত্তেফাক/এএন