ওয়াই টু কে; ২০০০ সাল।
সারা পৃথিবী নানা ধরনের নতুনের আশঙ্কা ও সম্ভাবনা নিয়ে শুরু করেছিলো এই বছরটা। কিন্তু নতুন শতবর্ষের প্রথম বছর সে অর্থে কোনো বিপর্যয় ডেকে আনেনি বিশ্বে। বরং বছরের শেষদিকে এসে বাংলাদেশ অন্তত প্রবেশ করেছিলো নতুন এক জগতে—টেস্ট ক্রিকেট।
হ্যাঁ, ২০০০ সালের ১০ নভেম্বর। ঠিক আজকের দিনটাতে প্রথম টেস্ট খেলতে নেমেছিলো বাংলাদেশ। নাঈমুর রহমান দুর্জয় বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে টস করতে নেমেছিলেন বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে। প্রতিপক্ষ ভারতের অধিনায়ক ছিলেন আরেক বঙ্গ সন্তান সৌরভ গাঙ্গুলি। পৃথিবী প্রথমবারের মতো দুই বঙ্গ সন্তানকে টস করতে নামতে দেখলো টেস্ট ক্রিকেটে।
দেখতে দেখতে আজ ১৬টি বছর পূর্ণ করে ফেললো বাংলাদেশ ক্রিকেটের কুলীন এই উঠোনে। এখনও সমালোচনা আছে, এখনও সংশয় আছে বাংলাদেশের টেস্ট খেলা নিয়ে। কিন্তু ১৬ বছর পূর্তির ঠিক আগের ক্ষণে ইংল্যান্ডের মতো অভিজাততম দলকে তিনদিনে টেস্ট ক্রিকেট হারিয়ে এই প্রথম অন্তত বুকে একটু তৃপ্তি নিয়ে উপলক্ষ্যটা উদযাপন করতে পারছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাস একটু বাঁকা পথেই এসেছিলো, এটা মানতে হবে। তখনও বাংলাদেশের সম্বল বলতে তিনটি ওয়ানডে জয়। দেশের কোনো প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট কাঠামোও গড়ে ওঠেনি। এই অবস্থায় মূলত ক্রিকেট রাজনীতির কেন্দ্রকে উপমহাদেশে টেনে আনার স্বার্থে বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাসের পক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়ে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড, তথা বোর্ডের তত্কালীন সভাপতি জগমোহন ডালমিয়া। তার সাথে হাত মিলিয়ে প্রাণান্ত তত্পরতা চালান তখনকার বিসিবি সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী ও সেক্রেটারি সৈয়দ আশরাফুল হক। এই মাঠের বাইরের খেলায় জিতে বাংলাদেশ টেস্ট স্ট্যাটাস পেয়ে যায়। তড়িঘড়ি করে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট শুরু করা হয়। আর প্রথম প্রতিপক্ষ হিসেবে ভারতই আসে বাংলাদেশে।
IMG0
প্রবল আশঙ্কা ছিলো যে, প্রথম টেস্টেই বাংলাদেশের হতদরিদ্র একটা চেহারা বের হয়ে আসবে। কিন্তু খেলোয়াড়রা ব্যক্তিগত নৈপুণ্য দিয়ে অনেকটাই ঢেকে দেন অবকাঠামোগত দীনতা। আমিনুল ইসলাম বুলবুলের অভিষেকে ১৪৫ রান, হাবিবুলের ফিফটি এবং অধিনায়ক নাঈমুর রহমান দুর্জয়ের ৬ উইকেট ভারতকে চমকে দেয়; যদিও দ্বিতীয় ইনিংসে ধসে পড়েছিলো বাংলাদেশ। কিন্তু ব্যক্তিগত নৈপুণ্যগুলো মান হারাতে দেয়নি। এরপর থেকে বাংলাদেশের ১৬ বছরের টেস্ট ইতিহাস আসলে ওই প্রথম টেস্টের মতোই—কাঠামো গড়ে ওঠেনি, ধারাবাহিকতা পায়নি খেলা; একমাত্র টিকে রয়েছে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের ওপরে। পরের একদশক জুড়ে দলীয় ব্যর্থতা ও ঘরোয়া কাঠামোর অভাব এতো চূড়ান্ত আকার ধারণ করেছিলো যে, বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাস বাতিল শত শত প্রস্তাব এসেছে। আইসিসিও বিভিন্ন সময় বাংলাদেশকে দ্বিতীয় স্তরে টেস্ট খেলানোর জন্য ভাবনা শুরু করেছে। কিন্তু এসব পরিস্থিতিতে বারবার জ্বলে উঠে মান রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন হাবিবুল বাশার, মোহাম্মদ রফিকরা। বর্তমান প্রজন্মের এই তারকাদের আগে এই দু’জন খেলোয়াড়ের অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতা এবং মোহাম্মদ আশরাফুলের বহু অপেক্ষার পর ঝলকই ছিলো টেস্টে বাংলাদেশের অল্প কিছু বিজ্ঞাপন।
IMG1
এর মধ্যে ২০০৫ সালে বাংলাদেশ এসে প্রথম জয় পেয়েছিলো। সেটাও এসেছিলো জিম্বাবুয়ের প্রথমসারির সব ক্রিকেটার একসাথে ক্রিকেট ছেড়ে দেওয়ার পর বাংলাদেশ সফরে আসা একটা খর্ব শক্তির দলের বিপক্ষে। এরপর জিম্বাবুয়ে ছাড়া বাংলাদেশ জয় পেয়েছে কেবল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। সেখানেও দলটির শীর্ষ সব ক্রিকেটার ধর্মঘটে যাওয়ায় একটা তৃতীয় সারির দল খেলেছিলো বাংলাদেশের বিপক্ষে। তবে এই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের আগে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠতম টেস্ট পারফরম্যান্সগুলো এসেছিলো হেরে যাওয়া কয়েকটা ম্যাচে। ২০০৩ সালে বাংলাদেশ মুলতানে জিততে থাকা ম্যাচ ১ উইকেটে হেরেছিলো পাকিস্তান, তথা ইনজামাম-উল হকের কাছে। এরপর পন্টিংয়ের বীরত্বে ২০০৬ সালে ফতুল্লায় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এবং ড্যানিয়েল ভেট্টোরির একক কৃতিত্বে ২০০৮ সালে চট্টগ্রামে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে জেতা ম্যাচ হেরেছে বাংলাদেশ। আরো কয়েকটা ম্যাচের কথা মনে করা সম্ভব। ২০০৪ সালে লারার ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সেন্ট লুসিয়া টেস্ট, ২০১১ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে চট্টগ্রাম টেস্ট, ২০১৩ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে গল টেস্ট ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দুটি টেস্ট এবং ২০১৪ ও ২০১৫ সালে এসে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে একটি করে টেস্ট ড্র করা ছিলো বাংলাদেশের জন্য গর্বের ব্যাপার। এই টেস্টগুলোতে জেতার সম্ভাবনা তৈরি না হলেও প্রতিপক্ষের সাথে একই তালে খেলে ড্র করতে সমর্থ হয় বাংলাদেশ।
এই ধারাবাহিকতায় লক্ষ্য করুন ১৬ বছর পর এসে বাংলাদেশ এখন বলতে পারে, আমরা টেস্ট খেলতে শিখেছি। বলা ভালো, জিততে শিখেছি।
এক নজরে ১৬ বছর
প্রথম ম্যাচ: বনাম ভারত (২০০০, বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম)
প্রথম সেঞ্চুরি: ১৪৫-আমিনুল ইসলাম বুলবুল (২০০০, বনাম ভারত)
প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি: ২০০-মুশফিকুর রহিম (২০১৩, বনাম শ্রীলঙ্কা)
প্রথম ৫ উইকেট: ৬-১৩৬ (২০০০, বনাম ভারত)
প্রথম জয়: ২২৬ রান (বনাম জিম্বাবুয়ে, ২০০৫)
প্রথম সিরিজ জয়: ১-০ (বনাম জিম্বাবুয়ে, ২০০৫)
পরিসংখ্যানে ১৬ বছর
দলীয় সর্বোচ্চ রান
স্কোর প্রতিপক্ষ ভেন্যু সাল
৬৩৮ শ্রীলঙ্কা গল ২০১৩
৫৫৬ উইন্ডিজ ঢাকা ২০১২
৫৫৫/৬ পাকিস্তান খুলনা ২০১৫
দলীয় সর্বনিম্ন ইনিংস
স্কোর প্রতিপক্ষ ভেন্যু সাল
৬২ শ্রীলঙ্কা কলম্বো ২০০৭
৮৬ শ্রীলঙ্কা কলম্বো ২০০৫
৮৭ উইন্ডিজ ঢাকা ২০০২
বড় জয় (রান)
ব্যবধান প্রতিপক্ষ ভেন্যু সাল
২২৬ রান জিম্বাবুয়ে চট্টগ্রাম ২০০৫
১৮৬ রান জিম্বাবুয়ে চট্টগ্রাম ২০১৪
১৬২ রান জিম্বাবুয়ে খুলনা ২০১৪
সেরা রান সংগ্রাহক
ব্যাটসম্যান রান ম্যাচ গড়
তামিম ইকবাল ৩৩৪৯ ৪৪ ৪০.৩৪
হাবিবুল বাশার ৩০২৬ ৫০ ৩০.৮৭
সাকিব আল হাসান ২৯২৯ ৪৪ ৩৯.০৫
সেরা ইনিংস
ইনিংস ব্যাটসম্যান প্রতিপক্ষ সাল
২০৬ তামিম ইকবাল পাকিস্তান ২০১৫
২০০ মুশফিকুর রহিম শ্রীলঙ্কা ২০১৩
১৯০ মোহাম্মদ আশরাফুল শ্রীলঙ্কা ২০১৩
সবচেয়ে বেশি সেঞ্চুরি
সেঞ্চুরি ব্যাটসম্যান ম্যাচ
৮ তামিম ইকবাল ৪৪
৬ মোহাম্মদ আশরাফুল ৬১
৪ মুমিনুল হক ১৯
সর্বোচ্চ পঞ্চাশোর্ধ্ব ইনিংস
সেঞ্চুরি ব্যাটসম্যান ম্যাচ
২৭ তামিম ইকবাল ৪৪
২৭ হাবিবুল বাশার ৫০
২২ সাকিব আল হাসান ৪৪
সর্বোচ্চ উইকেটশিকারী
বোলার উইকেট ম্যাচ গড়
সাকিব আল হাসান ১৫৯ ৪৪ ৩২.১৮
মোহাম্মদ রফিক ১০০ ৩৩ ৪০.৭৬
মাশরাফি বিন মুর্তজা ৭৮ ৩৬ ৪১.৫২
ইনিংস সেরা বোলিং
ফিগার বোলার প্রতিপক্ষ সাল
৮-৩৯ তাইজুল ইসলাম জিম্বাবুয়ে ২০১৪
৭-৩৬ সাকিব আল হাসান নিউজিল্যান্ড ২০০৮
৭-৯৫ এনামুল হক জুনিয়র জিম্বাবুয়ে ২০০৫
ম্যাচে সেরা বোলিং
ফিগার বোলার প্রতিপক্ষ সাল
১২-১৫৯ মেহেদী হাসান মিরাজ ইংল্যান্ড ২০১৬
১২-২০০ এনামুল হক জুনিয়র জিম্বাবুয়ে ২০০৫
১০-১২৪ সাকিব আল হাসান জিম্বাবুয়ে ২০১৪
সর্বাধিক ৫ উইকেট
৫ উইকেট ম্যাচ বোলার
১৫ ৪৪ সাকিব আল হাসান
৭ ৩৩ মোহাম্মদ রফিক
৪ ৩৮ শাহাদাত হোসেন
সর্বোচ্চ ম্যাচ
ম্যাচ খেলোয়াড় সময়কাল
৬১ মোহাম্মদ আশরাফুল ২০০১-২০১৩
৫০ হাবিবুল বাশার ২০০০-২০০৮
৫০ মুশফিকুর রহিম ২০০৫-২০১৬*
ইত্তেফাক/আরএ