আওয়ামী যুবলীগের ৪৪তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী সংগঠনের ভবিষ্যৎ, বর্তমান কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। ইত্তেফাক পাঠকদের জন্য সাক্ষাতকারটি তুলে ধরা হলো-
প্রশ্ন : যুবলীগের প্রতিটি নেতাকর্মীর আদর্শ কেমন হবে?
উত্তর : রাজনীতি হচ্ছে কঠিন ত্যাগ তিতিক্ষার ব্যাপার। মানুষকে রাষ্ট্র চিন্তায় উদ্বুদ্ধ করে তার মধ্যে প্রেরণা সৃষ্টির মন্ত্র মানব কল্যাণের আদর্শিক উপায়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে বিশ্বাসী এবং রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আস্থাশীল যুবকদের নিয়েই এই যুবলীগ। কাজেই যুবলীগের প্রতিটি নেতা কর্মীকে হতে হবে মানবিক, মেধা ও মনন মনস্ক, যুক্তিবাদী। মানুষের প্রতি ভালবাসাই জাতির পিতার সবচেয়ে বড় আদর্শ। যে আদর্শ বিকশিত করেছেন রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা ‘জনগণের ক্ষমতায়ন’ দর্শণের মাধ্যমে। যুবলীগকে এই আদর্শ লালন ও ধারণ করতে হবে। জনগণের অধিকার, ভোটের অধিকার, ভাতের অধিকার, বাসস্থানের অধিকার, কথা বলার অধিকারসহ জনগণকে সমস্ত ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আনাই আমাদের লক্ষ্য।
যুবলীগকে কেমন দেখতে চাই?
উত্তর : বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ তারুণ্যের দীপ্ত জয়গানের সংগঠন। যুব মেধা লালন, ধারণ এবং এর বিকাশই হলো যুবলীগের অন্যতম লক্ষ্য। যাতে আমরা মেধাভিত্তিক, যুক্তিবাদী, বিজ্ঞানমনস্ক যুব সমাজ গড়তে পারি। যুব শ্রেণী সমাজের মূল চালিকাশক্তি। মানুষের যে চারটি স্তর অতিক্রম করে তার মধ্যে যৌবনকালই হল শ্রেষ্ঠ কাল। যৌবনকালই হচ্ছে নিজেকে গড়ে তোলার শ্রেষ্ঠ সময়। সৃষ্টির কালই হল যৌবনকাল। যুবলীগকে কেমন দেখতে চাই তা অনুধাবন করতে গেলে গত কয়েক বছরে যুবলীগের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করলেই বোঝা যায়। আমরা এ সময় ইতিহাস অন্বেষণ করেছি, গবেষণা করেছি, বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা করেছি। যুবলীগকে আমরা অগ্রসরমান, পথিকৃৎ এবং যুব সমাজের আলোকবর্তিকা হিসেবে দেখতে চাই। রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার দেশ গড়ার ডাকে এখন তরুণরা প্রবাস থেকে ফিরে আসছেন। কারণ রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার বাংলাদেশ এখন তরুণদের। যুবকদের দেশ। এই তরুণ ও যুবকরাই এখন সম্পদ। উচ্চশিক্ষা শেষ করে কৃষিকাজে জড়িত হচ্ছে-এই তরুণরা, এই যুবকরা। আধুনিক প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন চিন্তা নিয়ে তরুণরা এগিয়ে আসছেন।
যুবলীগের অতীত ঐতিহ্য
দেশের ঐতিহ্যবাহী যুব সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ। তার গৌরবময় পথচলার ৪৪তম বার্ষিকী উৎযাপন করতে যাচ্ছে এ বছর। বিশ্বের মানচিত্রে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এবং রক্তাক্ত সংগ্রামের ভিতর দিয়ে ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যদ্বয়। সেই গৌরবময় সংগ্রামে অস্ত্র হাতে শত্রুর মোকাবেলা করেছিল এ দেশের অকুতোভয় যুব সমাজ। শুধু মুক্তিযুদ্ধই নয়, মহান রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন থেকে আইয়ুব বিরোধী গণ-আন্দোলনেও দেশে যুব সমাজই ছিল রাজপথে অগ্রগামী। আর তাদের নেতৃত্ব দিয়েছেন তৎকালীন তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। ক্রমান্বয়ে তিনি বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা-‘বঙ্গবন্ধু’ এবং জাতির পিতা হয়ে উঠেছিলেন। মূলত তিনিই বাঙালি জাতির জীবনে প্রথম তারুণ্যের প্রতীক। বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ তারই আদর্শে গড়া সংগঠন। জাতির পিতার নির্দেশে শেখ ফজলুল হক মনি এই যবুলীগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যে কারণে যুবলীগের প্রতিটি কর্মী এক অনন্য গৌরবের উত্তরাধিকার বহন করে চলেন হৃদয়ের গভীরে।
প্রশ্ন : অতীতে যুবলীগ রাজপথে ছিল-এখন?
উত্তর : বিরোধী দলে থাকলে রাজপথে দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলন করা যায় আর সরকারি দলে থাকলে ? কোন আন্দোলনকে যৌক্তিক পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য যেমন সংগঠন অপরিহার্য ঠিক তেমনি আন্দোলন না থাকলে সংগঠন বিনোদনমূলক ক্লাবে পরিণত হয়। অর্থাৎ প্রয়োজন হচ্ছে এই দুয়ের সমন্বয় সাধন। সংগঠনবিহীন আন্দোলন যেমন নৈরাজ্যের সৃষ্টির করে ঠিক তেমনি আন্দোলনবিহীন সংগঠন ও অবিকশিত এবং অপরিপক্ক থাকতে থাকতে এর কার্যকারিতা হারায়। কাজেই সংগঠন-আন্দোলন, আন্দোলন-সংগঠন অর্থাৎ কর্মসূচী। এটাই হচ্ছে অগ্রসর হওয়ার একমাত্র পথ। সংগঠনকে শক্তিশালী করতে হলে কর্মসূচী লাগবে।
সেই লক্ষ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই (২৫ জুলাই ২০০৯) আমি সংগঠনটির আদর্শিক চেতনা এবং এর বিকাশের ব্যাপারে উদ্যোগী হই। সেই লক্ষ্যে প্রথমে আমাদের রাজনীতির শিকড় অনুসন্ধানের কাজ করি। আর সে কারণেই রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার চিন্তা, তার রাজনৈতিক কর্ম, তার দর্শন বিশ্লেষণের চেষ্টা করি। আমি সব সময় পেশাদারী এবং উপযুক্ত ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করানোর পক্ষপাতি। এই লক্ষ্যেই শেখ হাসিনার রাজনীতি, তার চিন্তা-ভাবনাগুলোকে ধারনের জন্য একটি পেশাদার গবেষকদল তৈরি করে বিশ্বে ৩৯টি রাষ্ট্র সফর করি। এই গবেষক দলটি দীর্ঘ প্রায় এক বছর ধরে শেখ হাসিনার রাজনীতির উপর গবেষণা করে। এই গবেষণার ফলাফল ছিল ঐতিহাসিক, তাৎপর্যপূর্ণ এবং অসাধারণ। এই গবেষণায় আমরা রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার রাজনীত বিশ্লেষণ করে দেখি যে জাতির পিতার রাজনৈতিক আদর্শে বড় হলেও শেখ হাসিনা কখনই ইন্দিরা গান্ধী কিংবা বেনজির ভুট্টোর মতো ভবিষ্যত গড়ে উঠেনি। শেখ হাসিনার বিকশিত হয়েছেন তার আপন মহিমায় চারপাশের পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির মধ্যে। যেখানে সবকিছু তাকে দ্রুত আয়ত্ব করতে হয়েছে সম্পূর্ণ প্রতিকূল পরিস্থিতিতে। আমরা গবেষণায তার জীবন ও রাজনীতি বিশ্লেষণ করে পাই যে, তার রাজনৈতিক জীবনে সব চেয়ে বড় পাথেয় ও শক্তি হলো জনগণ। রাজনীতিতে শেখ হাসিনার এক অভূতপূর্ব দিক হলো, তিনি জনগণের হৃদয়স্পন্দন শুনতে পান। তার বিষয়টি হলো এই রকম জনগণকে সচেতন করা। তাদের জাগাও, তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল নিয়ামক করো। তাহলেই শান্তি আসবে, মানুষের উন্নতি হবে।
প্রশ্ন : সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ দমনে যুবলীগের ভুমিকা কি?
উত্তর : রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার বিশ্বশান্তির দর্শন “জনগণের ক্ষমতায়ন” এ আমরা বিশ্বাসী। সেই লক্ষ্যে জনমত সৃষ্টি করা আমাদের কাজ। দেশের ভিতর একটি অরাজনৈতিক অশুভ শক্তি আছে, যাদের মূল কাজ মিথ্যাচার, মূর্খতা, আর বেয়াদবি হচ্ছে শক্তি। যারা বর্হিবিশ্বে বর্তমান সরকারকে একটি ব্যর্থ সরকার প্রমাণ করে দেশের রাজনীতিতে বাইরের হস্তক্ষেপ কামনা করছে। বঙ্গবন্ধু দিয়েছেন স্বাধীনতা, রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা দিচ্ছেন অর্থনৈতিক মুক্তি আর ভারসাম্যমূলক পররাষ্ট্রনীতি। যার ফলে জাপান, চীন, ভারত, আমেরিকা, সৌদী আরবসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সাহায্যের হাত বড়িয়ে দিয়েছে। সজীব ওয়াজেদ জয় দিলেন ডিজিটাল বাংলাদেশ অর্থাৎ জ্ঞান নির্ভর বাংলাদেশ। আর শেখ রাসেলের জীবন থেকে আমরা একটা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাই, তাহলো পরিবার বন্ধন। পরিবার বন্ধনে যে একটি শিশুর প্রকৃত বিকাশ ঘটতে পারে তার প্রমাণ শেখ রাসেল। আজ বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধে পারিবারিক বন্ধন এবং পারিবারিক একাত্ততা কত যে প্রয়োজন বঙ্গবন্ধুর পরিবারের দিকে তাকালেই শিক্ষা গ্রহণ করা যায়। এই ‘জনগণের ক্ষমতায়ন’ বাস্তাবায়নে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। মানুষকে জাগাতে হবে, জনগণের মতামতের ভিত্তিতে দেশ পরিচালিত হবে। সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদের অবসান নিশ্চিত করা হবে। এই সরকার বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করেছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে সকল হত্যাকান্ডের বিচার করতে হবে। আগুন সন্ত্রসীদের বিচার করতে হবে। আগুন সন্ত্রাসের হুকুমের আসামী খালেদা জিয়ার বিচার করতে হবে। এদেশে আইএস নেই। এই বিচার করলেই জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ নির্মূল হবে।
ইত্তেফাক/ইউবি