২০১১ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার জন্য চূড়ান্ত সতর্কতা জারি করেছিল শিক্ষামন্ত্রণালয়। কিন্তু ওই বাধ্যবাধকতা ততটা আমলে নেয়নি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। পরবর্তীতে স্থায়ী ক্যম্পাসে যাওয়ার সময় কয়েক দফা বাড়ানো হয়। অথচ গত পাঁচ বছরেও স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে পারেনি ৩৯টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।
আবার অনেক বিশ্ববিদ্যালয় অন্যত্র স্থায়ী ক্যাম্পাস দেখিয়ে ঢাকায় সিটি ক্যাম্পাস নামে অবৈধ শাখা ক্যাম্পাস পরিচালনা করছে। আবার কেউ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে সংযুক্ত ক্যাম্পাসের নামে অবৈধ শাখা ক্যাম্পাস পরিচালনা করছে। অনেকের বিরুদ্ধে নির্ধারিত জমির চেয়ে কম জমিতে ভবন নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই ভবন নির্মাণের অভিযোগও রয়েছে কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনে বলা আছে, যাত্রা শুরুর সাত বছরের মধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাসেই শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে হবে। আইন অনুযায়ী ঢাকা ও চট্টগ্রামে স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য কমপক্ষে এক একর, অন্যান্য স্থানের জন্য দুই একর অখণ্ড জমি থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৯৫টি। এর মধ্যে ৩৯টি বিশ্ববিদ্যালয়কে আগামী জানুয়ারির মধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে হবে। ফলে তাদের হাতে আর দুইমাস সময় রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে এসব বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব ক্যাম্পাসে যেতে পারবে না। ফলে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে মন্ত্রণালয়ের।
ইউজিসির একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, বার বার সময় দিয়েই সরকার ভুল করছে। এখনও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভাবছে, হয়তো এবারো সময় বাড়ানো হবে। এ কারণে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে তাদের অনীহা।
স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে কেন এত গড়িমসি এমন প্রশ্নের জবাবে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, ঢাকার বাইরে দুই একর জমি ক্রয় এবং সেখানে অবকাঠামো তৈরি করে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা যথেষ্ট ব্যয় সাপেক্ষ। এছাড়া ঢাকার ভেতরে অখণ্ড এক একর জমি পাওয়াও কঠিন। অথচ অধিকাংশ শিক্ষার্থী ঢাকামুখী। শিক্ষার্থীরা ঢাকার বাইরে যেতে আগ্রহী নয়। এ কারণে ঢাকার বাইরে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করলে শিক্ষার্থী সংকট তৈরি হবে এমন আশংকা রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর।
তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ পাস হওয়ার পর একই বছর ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার সময় বেঁধে দেয়া হয়। দ্বিতীয় দফায় ২০১২ সালে, তৃতীয় দফায় ২০১৩ সালে, চতুর্থ দফায় ২০১৫ সালের জুন এবং পঞ্চম দফায় ২০১৭ সালের ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়। কিন্তু এই সময়েও অনেক বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে পারবে না—এমন শংকা খোদ ইউজিসির।
তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালের মধ্যে যেসব বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পেয়েছে তাদের ইতিমধ্যেই স্থায়ী ক্যাম্পাসে চলে যাওয়ার কথা। ওই সময়ের মধ্যে ৫১টি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পেয়েছে। এদের মধ্যে ১৫টি পুরোপুরিভাবে স্থায়ী ক্যাম্পাসে কার্যক্রম চালাচ্ছে। বাকিরা এখনও স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে পারেনি।
রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকায় কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। যাদের স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার উদ্যোগও কম। বিভিন্ন বাসা বাড়িতে শাখা ক্যাম্পাস খুলে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ধানমন্ডির একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তরায় পৃথক শাখা ক্যাম্পাস রয়েছে। সব ক্যাম্পাসেই শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হচ্ছে। অথচ ইউজিসিকে বলা হচ্ছে, তাদের আউটার ক্যাম্পাস নেই। তাদের দাবি, একটি ভবনে জায়গা না হওয়ায় আলাদা ভবনে অন্য ফ্যাকাল্টির কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এটা সংযুক্ত ক্যাম্পাস।
নর্দান ইউনিভার্সিটির স্থায়ী ক্যাম্পাসের কাজ চলছে গাজীপুরের কাশিমপুরে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির বনানী এবং কারওয়ান বাজারে কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউতে রয়েছে পৃথক দুটি ক্যাম্পাস।
এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের মূল ক্যাম্পাস উত্তরায়। উত্তরার পাশাপাশি তারা মতিঝিল ক্যাম্পাস পরিচালনা করছে। ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির মূল ক্যাম্পাস আশুলিয়ায়। এর পাশাপাশি তারা ধানমন্ডি এবং উত্তরায় শাখা ক্যাম্পাস পরিচালনা করছে। ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির রাজধানীর দুটি স্থানে ক্যাম্পাস পরিচালনা করছে। গ্রীন ইউনিভার্সিটি রাজধানীর শেওড়াপাড়া এবং মিরপুর ২ নম্বর সেকশনে পৃথক শাখা ক্যাম্পাস পরিচালনা করছে। ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি মিরপুর ১ নম্বর সেকশন এবং শ্যামলীতে পৃথক শাখা ক্যাম্পাস পরিচালনা করছে। ধানমন্ডির বিভিন্ন স্থানে একাধিক ভবন ভাড়া নিয়ে ক্যাম্পাস পরিচালনা করছে ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ। ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটিও একইভাবে একাধিক ভবন ভাড়া নিয়ে ক্যাম্পাস পরিচালনা করছে।
অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসের ঠিকানা উত্তরায় হলেও বনানীতে সিটি ক্যাম্পাসের নামে শাখা ক্যাম্পাস পরিচালনা করছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য সৈয়দ হেমায়েত হোসেন বলেন, উত্তরায় মূল ক্যাম্পাস হবে। সেখানের অবকাঠামো নির্মাণ চলছে। ইউজিসি অনুমোদন দিলে সিটি ক্যাম্পাসও থাকবে। নইলে নয়।
ইউজিসির সর্বশেষ তথ্য মতে, এখনো ৬৪টি আউটার ক্যাম্পাস পরিচালনা করছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এর মধ্যে বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি চট্টগ্রামে দুটি, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামে পাঁচটি, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ ঢাকা ও চট্টগ্রামে সাতটি, চট্টগ্রামের ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ঢাকায় একটি, আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি বিভিন্ন স্থানে ১৬টি, কুইন্স ইউনিভার্সিটি রাজশাহীতে একটি, ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেস চট্টগ্রামে একটি আউটার ক্যাম্পাস পরিচালনা করছে।
মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিও চালাচ্ছে সংযুক্ত ক্যাম্পাস। গুলশানে তাদের মূল ক্যাম্পাস। মিরপুরে রয়েছে সায়েন্স ফ্যাকাল্টি নামে সংযুক্ত ক্যাম্পাস।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মান্নান বলেন, যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এখনও স্থায়ী ক্যাম্পাসে যায়নি তাদের ৩১ জানুয়ারির মধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতেই হবে। এই দিন থেকেই কোন বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী ক্যাম্পাসে গেল কি গেল না হিসাব করা হবে এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, আশুলিয়ায় বা ঢাকার অদূরে স্থায়ী ক্যাম্পাস করে ঢাকার ভেতরে সিটি ক্যাম্পাস চালানো যাবে না। এছাড়া সংযুক্ত ক্যাম্পাসটি কতদূর পর্যন্ত হবে সেটাও দেখবো এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে।
ইত্তেফাক/এএন