গভীর রাতে ‘রহস্যময়’ মামলা, উত্কণ্ঠায় সাঁওতালরা

 
সাঁওতালদের পক্ষ থেকে গোবিন্দগঞ্জ থানায় বুধবার গভীর রাতে ৫/৬শ অজ্ঞাত আসামি করে এক ‘রহস্যময়’ মামলা দায়েরের পর আদিবাসী পল্লীতে নতুন করে আবারো বিরাজ করছে চরম উত্কণ্ঠা। অপরদিকে বাঙালি গ্রামগুলোর পুরুষরা গ্রেফতার আতঙ্কে বাড়িঘর ছেড়েছে। অভিযোগ উঠেছে, পুলিশ যাকে পাচ্ছে তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে।
 
শুক্রবার সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, সাঁওতাল পল্লীর লোকজন এই মামলা নিয়ে বিস্মিত। তারা জানান, সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামার এলাকায় সাঁওতালদের ওপর হামলার সঙ্গে যারা সরাসরি জড়িত ও যারা ইন্ধনদাতা এবং যারা নিরীহ সাঁওতালদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে, সেসব প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম ওই মামলায় আসেনি। আবার নতুন কোন ফন্দি ফিকির কিংবা ষড়যন্ত্র কি না, এমন শঙ্কায় তারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।
 
অপরদিকে মামলাটি দায়েরের পর রাতেই থানা পুলিশ ত্বরিত অভিযানে নেমে পড়ে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে পাঁচজনকে আটক করে। পরে গত বৃহস্পতিবার রাতে আটক করা হয় তিনজন। তারা হলেন, উপজেলার কাটাবাড়ী গ্রামের সাদিকুল ইসলাম (৪৫) ও লেবু মিয়া (২১) এবং নরেঙ্গাবাদ গ্রামের জিয়াউর রহমান (৩২)। ফলে গ্রেফতার আতংকে উপজেলা চক রহিমপুর, তরফ কামাল, সাহেবগঞ্জ, কাটাবাড়ী ও নরেঙ্গাবাদ গ্রামের পুরুষরা বাড়ী ছেড়েছেন।
 
এ ব্যাপারে মাদারপুর গ্রামের ভুবেন মার্ডি বলেন, আমরা কেউ জানি না কীভাবে এ মামলা হয়েছে। তা ছাড়া আমাদের উপর হামলার ঘটনা প্রকাশ্যে ঘটেছে। এ মামলায় কেন অজ্ঞতনামা আসামি হবে। যদি কোনো মামলা হয়ে থাকে সেটা রহস্যজনক।
 
মাদারপুর ও জয়পুরপাড়া গ্রামের একাধিক সাঁওতাল পুরুষ ও নারীদের দাবি, চিহ্নিত দোষীদের বাঁচাতে এ মামলা করা হয়েছে। এই মামলা ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষ থেকে করা হয় নাই। যারা তাদের উচ্ছেদের ষড়যন্ত্রে সঙ্গে জড়িত, এটা তাদের আবারো নতুন কোনো ফন্দি ফিকির হতে পারে।
 
সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামার জমি উদ্ধার কমিটির কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক রাফায়েল হাসদার বলেন, এই মামলা সম্পর্কে আমরা কিছুই জানেন না। তিনি কী উদ্দেশ্যে এবং কার স্বার্থে মামলা করেছেন। সেটা তিনিই ভালো বলতে পারবেন। তার বাড়ি কোথায় সেটাও আমাদের জানা নেই।
 
উপজেলা নরেঙ্গাবাদ গ্রামের সাজু সরকার জানান, ঘটনার সাথে যারা জড়িত নয় পুলিশ তাদেরকেও ধরে নিয়ে যাচ্ছে। তাই গ্রেফতার আতঙ্কে রাতে কেউ বাড়িতে থাকছে না। একই কথা জানান, সাহেবগঞ্জ গ্রামের অব্দুল জোব্বার ও আসাদুজ্জামান। চক রহিমপুর গ্রামের মনির উদ্দিন জানান, এ ঘটনার সাথে তার ছেলে মানিক জড়িত নয়। তারপরও পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে গেছে।
 
সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামার জমি উদ্ধার কমিটির সহ-সভাপতি ফিলিমন বাস্কের দাবি, অতি উত্সাহী হয়ে মূল ঘটনা আড়াল করতে স্বপন মরমু নামে জনৈক এক আদিবাসী কারো প্রচোরনায় এ মামলাটি দায়ের করেছেন। স্বপন মরমু ক্ষতিগ্রস্থদের কেউ নন। তাকে আমরা চিনি না।
 
তিনি আরো বলেন, নিরহ কেউ পুলিশি হয়রানির স্বীকার হোক সেটাও আমরা চাই না। কারণ সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্ম ইক্ষু খামার জমি উদ্ধার কমিটি বাঙালি ও আদিবাসী মিলেমিশে করা হয়েছে। বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানরাও আমাদের সাথে তাদের বাপ-দাদার ভূমি উদ্ধারের জন্য আন্দোলন করেছে।
 
আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন বলেন, প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করার জন্য সাঁওতালদের নাম ভাঙিয়ে অজ্ঞাত পরিচয়দের বিরুদ্ধে এই মামলা করা হয়েছে। কোন মহল এ কাজ করল তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, সাঁওতালদের ভূমি উদ্ধার কমিটির পক্ষ থেকে এরই মধ্যে আইনি প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। আগামী রবিবার অথবা সোমবার বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের ভিত্তিতে মামলা দায়ের করা হবে। স্বপন মুরমুর এই মামলার সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্থ সাঁওতালের কোনো যোগসূত্র নেই। এটি কোনো ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে।
 
নিরহ লোকদের গ্রেফতারের অভিযোগ অস্বীকার করে গোবিন্দগঞ্জ থানার ওসি সুব্রত কুমার সরকার জানান, আধিবাসীদের একজন তো এই মামলাটি করেছে। সে ক্ষতিগ্রস্ত কিনা সেটা আমার জানা নাই।
 
গাইবান্ধা জেলা পুলিশ সুপার আশরাফুল ইসলাম বলেন, স্বপন মুরুমুর বাড়ি বাগদা ফার্মের কাছেই। তাকে তারা চেনে কিনা তা আমাদের জানার কথা নয়। তবে মামলার সুষ্ঠু তদন্ত হচ্ছে।
 
প্রসঙ্গত. গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা মুয়ালীপাড়া গ্রামের সমেস মরমুর ছেলে স্বপন মরমু বাদী হয়ে বুধবার গভীর রাতে ৫ থেকে ৬ শত জন অজ্ঞাত আসামি করে সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারের উচ্ছেদের সময় সাঁতালদের উপর হামলা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও গুলি করে হত্যার ঘটনায় এ মামলা দায়ের করেছে। মামলা নং ২৩, (তারিখ ১৬ নভেম্বর’২০১৬।) ধারা ১৪৭, ১৪৮, ৩২৩, ৩২৫, ৩২৬, ৩০৭, ৩৭৯, ৩৮০, ৪৩৬, ৩০২ ও ৩৪। এ মামলায় কোন এজাহার নামীয় আসামি করা হয় নাই।
 
ইত্তেফাক/এএম।