সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারের জমি থেকে সাঁওতালদের উচ্ছেদ, হত্যা ও হামলার ঘটনায় একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গণশুনানির আয়োজন করেছে। গতকাল মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টা থেকে শুরু হওয়া এ গণশুনানিতে সাঁওতালরা তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করেন।
গণশুনানি পরিচালনা করেন সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক ও সাবেক বিচারপতি শামছুল হুদা। মাদারপুর চার্চ মাঠে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে সাঁওতালদের পক্ষে বারনাবাস টুডু, রাফায়েল হাসদা, রিনা মাইতি, কৃষ্ণ মুরমু, ববিতা মুরমু ও ভেরজুলিও হেমভ্রম তাদের উপর নির্যাতনের বর্ণনা করেন। তারা ১৯৫৫ সালে তাদের পূর্ব পুরুষের ঘরবাড়ি ভেঙে ১ হাজার ৮৪২ দশমিক ৩০ একর জমি দখল প্রক্রিয়ার শুরু থেকে বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরেন।
এর আগে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টা সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের নেতৃত্বে সাবেক বিচারপতি শামছুল হুদা, কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী মুকুল, সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট বায়েজিদ আব্বাস, সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ, কেন্দ্রীয় নেতা ব্যারিস্টার নাদিয়া চৌধুরসহ ১৮ সদস্যের দলটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
গণশুনানিতে সাঁওতালরা বলেন, তাদের বাপ-দাদার জমি চিনিকল যখন নিয়ে নেয় তখন শুধু জমিতে থাকা ফসলের মূল্য বাবদ টাকা দেওয়া হয়। জমির কোনো মূল্য দেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে ১৯৬২ সালে জমি অধিগ্রহণের কাগজপত্র করা হয়। জমিতে চিনিকলের জন্য আখ চাষ ছাড়া অন্য কোনো ফসল চাষ করা হলে জমি মূল মালিকদের ফেরত দেওয়া হবে বলে সে সময় চুক্তিপত্রে উল্লেখ ছিল। কিন্তু ২০০৪ সালে চিনিকলটি বন্ধ হয়ে যাবার পর স্থানীয় প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধিদের জমিগুলো লিজ দেওয়া হয়। যেখানে ধান, ভুট্টা, আলু, তামাক, গমসহ বিভিন্ন ফসলের চাষাবাদ করা হতো। এমনকি স্থানীয় সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ মিলের জমিতে ৯টি পুকুর খনন করে মাছ চাষ শুরু করেন। তারা আরো জানান, এমন পরিস্থিতিতে ওই জমির মালিকানা ফিরে পেতে তারা আন্দোলন-সংগ্রাম শুরু করেন। যাতে এমপি অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ এবং উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাপমারা ইউপি চেয়ারম্যান শাকিল আহম্মেদ বুলবুলের ইন্ধনও ছিল। বুলবুল ভূমি উদ্ধার কমিটির সভাপতি হয়ে প্রতি সপ্তাহের শনিবার সভা করে আন্দোলনের খরচ ও কাগজপত্রের কথা বলে পরিবার প্রতি দেড় থেকে ২০০ টাকা করে চাঁদাও তোলেন। কিন্তু ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর বুলবুল আন্দোলন থেকে সরে পড়েন।
শুনানি শেষে সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, অধিগ্রহণ করা জমি অন্য কাউকে লিজ দেওয়ার অধিকার চিনিকল কর্তৃপক্ষের নেই। ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করে তিনি বলেন, আপনাদের প্রয়োজনে আমরা আইনগত সহায়তা দেব। সামগ্রিক বিষয় নিয়ে পরিচালিত গণশুনানির রিপোর্ট সংশ্লিষ্ট দপ্তরসহ প্রধানমন্ত্রীর নিকট দিয়ে আপনাদের দাবি উপস্থাপন করা হবে। পরে সহায়তা হিসেবে সাঁওতালদের মাঝে নগদ টাকা ও কম্বল বিতরণ করা হয়।
ধান কাটার সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি
ইক্ষু খামারের জমিতে সাঁওতালদের রোপণ করা আমন ধান কাটার সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত করেনি সাঁওতালরা। গতকাল দুপুরে জেলা প্রশাসক আব্দুস সামাদ, পুলিশ সুপার আশরাফুল ইসলাম ও চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল আউয়াল জমিগুলো পরিদর্শন করেছেন। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক জানান, পরিমাপ করে দেখা গেছে ৪৫ দশমিক ৫০ একর জমিতে ধান চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩০ একর জমির ধান কাটার উপযোগী হয়েছে। বাকী জমির ধান কাটার উপযোগী হতে আট থেকে দশ দিন সময় লাগবে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। জেলা প্রশাসক আরো বলেন, হাইকোর্ট ৩০ নভেম্বরের মধ্যে ধান কাটার নির্দেশ দিয়েছেন। নির্দেশনা অনুযায়ী সাঁওতালরা যদি ধান সংগ্রহ না করে তবে, সুগার মিল কর্তৃপক্ষ ধান কেটে তাদের বুঝিয়ে দেবে। কর্তনকৃত ধান বুঝিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, ধান যদি কোনো সমিতির মাধ্যমে চাষ করা হয় থাকে সে ক্ষেত্রে সমিতিকে বুঝিয়ে দেওয়া হবে। সমিতি না চাইলে যারা ধান চাষ করেছে তালিকা অনুযায়ী পৃথকভাবে তাদের ধান বুঝিয়ে দেওয়া হবে। সেটিও সম্ভব না হলে স্থানীয় ওয়ার্ড পর্যায়ে যারা জনপ্রতিনিধি আছেন তাদের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা চালানো হবে। এ পর্যায়েও যদি বিষয়টি নিষ্পত্তি সম্ভব না হয়, তবে ধান শুকিয়ে খাদ্য বিভাগের মাধ্যমে তা সংরক্ষণ করে বিষয়টি আদালতকে জানানো হবে। এ বিষয়ে আদালত পরবর্তীতে যে নির্দেশনা দেবেন বা বাস্তবায়ন করা হবে।
আরো একজন আটক
গোবিন্দগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, সাঁওতালদের ওপর হামলার ঘটনায় গত সোমবার রাতে সোহেল রানা নামের আরো এক জনকে আটক করেছে পুলিশ। তিনি সাপমারা ইউনিয়নের মাদারপুর গ্রামের আজিজুর রহমানের ছেলে। এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় মোট ১৭ জনকে আটক করা হলো।
ইত্তেফাক/এএন