পুরুষদের জন্য খেলার জগত্টা যেমন চির উন্মুক্ত নারীদের জন্য সে পথটি যেন চির রুদ্ধ। একজন মেয়ে যত বড় হতে থাকে তত বুঝতে পারে যে বাসার পাশে খেলার মাঠটি তার জন্য নয়। বাসার ছোট ছেলেটির জন্য ফুটবল, ক্রিকেট ব্যাট সবই এসে হাজির হয় কিন্তু মেয়েটি ফুটবল, ক্রিকেট খেলতে চাইলে শুনতে হয় এসব তোমাদের জন্য নয়। তাদের খেলার জগত্ যেন ঘরের চার দেয়ালের মাঝে রুদ্ধ। একজন ছেলে ক্রিকেট ভালো খেললে পরিবার, সমাজ সবদিক থেকে সে তার ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা পায়, কিন্তু একজন মেয়ের ক্ষেত্রে সমাজ বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এখন যেসব নারী আমাদের জাতীয় ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টনসহ অন্যান্য খেলার দলে রয়েছেন তাদের এ পর্যন্ত আসার পথযাত্রা অনেক সংগ্রামের। একজন ছেলের চেয়ে একজন মেয়ের জন্য সে সংগ্রাম অনেক গুণে বেশি।
তাদের এ সংগ্রামের পথযাত্রা সম্পর্কে জানতে এবং খেলার জগতকে নারীদের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্রে পরিণত করতে আমাদের কি করণীয় তা জানতে কথা হচ্ছিল বাংলাদেশ মহিলা ক্রিকেট দলের দলনেতা রুমানা আহমেদের সাথে। তিনি বলেন, অনেক ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি সখ ছিল। ছোটবেলায় মাঠে ভাইদের খেলা দেখতাম। অনেক সময় খেলার ইচ্ছা থাকলেও খেলতে পারতাম না। আমি খুলনার খালিশপুরে লোটারি স্কুলে ছিলাম। আমাদের স্কুল থেকে মেয়েদের জন্য খেলাধুলার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। এটি আমাদের বেশিরভাগ স্কুলের চিত্র। বেশি খেলা খেলা করতাম দেখে সবসময় বকাঝকা শুনতে হতো। পরিবার থেকে পড়াশোনার ওপর চাপ ছিল। ক্রিকেটের প্রতি নেশা বেশি ছিল, তাই ব্যাট-বলের অভাবে কখনো কখনো নারকেল গাছের ডালকেও ব্যাট বানিয়ে খেলেছি। প্রথম এলাকার একটি পত্রিকা থেকে জানতে পারি যে, স্টেডিয়ামে মেয়েদের ক্রিকেটের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সেখানে প্রথম শিখতে যাই। যখন পরিবার আমার ইচ্ছা বুঝতে পেরেছে তখন তারাও পাশে থেকে আমাকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস দিয়েছে।
আমি মনে করি, নারীদের খেলার জগতে অংশগ্রহণের হার বাড়াতে গণমাধ্যমকে আরও এগিয়ে আসতে হবে। মেয়েদের খেলাধুলা কোথায় কী হচ্ছে তার আরও বেশি প্রচার দরকার। ছেলেদের খেলা নিয়ে যেরকম প্রচার হয় মেয়েদের ক্ষেত্রে এখনো সে পর্যায়ের প্রচার নেই। বাংলাদেশ মহিলা ক্রিকেট দলের দলনেতা হিসেবে আমার ইচ্ছা আমাদের দলকে আরও অনেক এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। ভবিষ্যতে খেলার জগতে নারীদের অংশগ্রহণের হার বাড়াতে প্রতিটি নারী যেন তার মনের ইচ্ছাটুকু পূরণ করতে পারে তার সুবন্দোবস্ত করতে হবে। নারীদের স্কুলগুলোতে খেলার পূর্ণ সুযোগ রাখতে হবে।
বিশ্ব মহিলা দাবা চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের প্রথম মহিলা খেলোয়াড় হিসেবে অংশ নেন শামীমা আক্তার লিজা। তিনি ২০১৩ সালে এশিয়ান জোনাল ৩.২ এর চ্যাম্পিয়ন। তার দাবার জগতে প্রবেশের অভিজ্ঞতা জানতে কথা হচ্ছিল। তিনি বলেন, দাবা খেলার শুরু স্কুল থেকে। আমি যখন ক্লাস সেভেনে, প্রথম দাবা খেলায় নাম লেখাই। স্কুলে অন্যান্য খেলায় অংশ নিই কিন্তু মন থেকে দাবার প্রতি আলাদা আসক্তি অনুভব করি। আমাদের দেশে দাবার মতো বোর্ড গেম খেলার সুযোগ অনেক বেশি। কারণ এখন অনেক স্কুলে দেখা যায় খেলার জন্য মাঠও থাকে না। আমি দাবা খেলার ক্ষেত্রে পরিবার, বাবা, মা এবং স্বামীর কাছ থেকে সবসময়ই উত্সাহ পেয়েছি। দাবা খেলার জন্য ধৈর্য্য প্রয়োজন, প্রয়োজন বুদ্ধির। তাই দাবা খেলার মাধ্যমে যে বুদ্ধির চর্চা হয় তা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কাজে লাগে। আমি মনে করি, আমার ছোটবেলা থেকে দাবা খেলা আমাকে পড়াশোনায় এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। অনার্স, মাস্টার্সে আমার প্রথম শ্রেণি রয়েছে। আমি খেলার পাশাপাশি সমান গুরুত্ব দিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে গেছি। তাই প্রতিটি শিশুর দাবার চর্চা করা উচিত। যা তার জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রে কাজে লাগবে। ভবিষ্যতে বিশ্ব মহিলা দাবা চ্যাম্পিয়ানশিপে আরো ভালো করার ইচ্ছা আছে। তাই প্রতিদিনই অনুশীলন করছি। আমাদের দেশের নারীদের দাবার জগতে আরো উত্সাহী করতে বাবা-মাকে এর গুরুত্ব বুঝতে হবে। নারীদের খেলার জগত্ সম্পর্কে গণমাধ্যমকে আরো সরব হতে হবে। তা নতুন প্রজন্মের নারীদের খেলার প্রতি আরো উত্সাহিত করবে, বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন দেখাবে।
আমাদের দেশে ব্যাডমিন্টন খেলা এখন বেশ উপেক্ষিত, তার মাঝে নারীদের অংশগ্রহণের হার আরো কম। তবু এদের মাঝে নারীর একক, দ্বৈত ও মিক্সড ডাবলসে চ্যাম্পিয়ন পাবনার শাপলা আক্তার। তার ব্যাডমিন্টন খেলার জগতে প্রবেশ এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাই। তিনি বলেন, আমার যখন আট কি নয় বছর তখন বাবা, মা আমার হাতে ব্যাডমিন্টন ধরিয়ে দেন। সেই থেকে এ জগতের প্রতি আগ্রহ শুরু। আমার বড় বোন ছিলেন ভলিবল খেলোয়াড়। তাই খেলাধুলার প্রতি আমারও আগ্রহ ছিল। চাচী স্কুলের ক্রীড়া শিক্ষক হওয়ায় তার তত্ত্বাবধানে খেলার জগতে প্রবেশের শুরু। ২০০৩ সালে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি আয়োজিত টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হই। পরবর্তীকালে ২০০৫-২০০৬ সালে জুনিয়র, সাব জুনিয়র সব বিভাগেই পদক জিতি। ২০০৭ সালে নেপালে খেলতে যাই ও নিয়ে আসি ব্রোঞ্জ পদক। আমার খেলার ক্ষেত্রে পরিবারের উত্সাহ আমাকে এ পর্যন্ত এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। ভবিষ্যতে আরো ভালো খেলার আশা রাখি। দেশে ও বিদেশে সব ধরনের টুর্নামেন্টে নারী পুরুষের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। উপযুক্ত সুযোগ পেলে অনেক নারী খেলোয়াড়ই তার সেরা খেলাটা খেলতে পারবে ও সারা বিশ্বের কাছে দেশকে পরিচিত করে তুলতে পারবে। তাই নারীদের খেলার সুযোগ সুবিধা আরও বৃদ্ধি করতে হবে। আমাদের দেশে নারীদের খেলার জগতে অংশগ্রহণ বাড়াতে জেলায় জেলায় আরও বেশি করে টুর্নামেন্টের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি জেলা থেকে নিয়ম করে মেয়েদের আলাদা খেলার দল রাখতে হবে। তবেই নতুন খেলোয়াড় তৈরি হবে। অনেক সময় মনে করা হয় খেলাধুলা করলে পড়াশোনা হয় না। এটি ভুল ধারণা। খেলার সময় সাধারণত বিকালেই হয়, তাতে পড়ার কোনো ক্ষতি হয় না। বরং খেলাধুলা নব উত্সাহে পড়ার সুযোগ করে দেয়।
ইত্তেফাক/আরএ