সেনাদের সহিংসতার শিকার শিশুরাও

চার বছরের ছোট্ট শিশু আব্দুল হান্নান। ঠিকমতো বাবা-মার নাম বলতে পারে না। বসে বসে শুধু কাঁদছিল। প্রতিবেশীরা জানায়, মিয়ানমারের সৈন্যরা তার সামনেই বাবা-মা দুজনকে জবাই করে হত্যা করেছে। তাই তারা আসার সময় তাকে সাথে নিয়ে এসেছেন।

 
হান্নানের জন্ম রাখাইন রাজ্যের হাতিপাড়ায়। এখন তার সামনে রাজ্যের অন্ধকার। ছয় বছরের সুমাইয়ার গল্পও একই। সে জানায়, রাখাইনের উত্তর মংডু’র ছোট গজিরবিল এলাকায় তাদের বাড়ি। সেনাবাহিনী তাদের বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। তার বাবা মো. হাশেমকে গুলি করে হত্যা করেছে। মা খুরশিদাকে সৈন্যরা ধরে নিয়ে গেছে। সৈন্যরা যাওয়ার সময় দুই বছর বয়সী ভাই মুসলিম ও চার বছরের সোহেলকে আগুনে নিক্ষেপ করেছে। পরে মায়ের লাশও পাওয়া যায়। সে বাড়ির বাইরে থাকায় বেঁচে যায়। প্রতিবেশীদের সহায়তায় টেকনাফে এসেছে সে।
 
হান্নান ও সুমাইয়ার মতো শত শত শিশু এভাবে মিয়ানমার সেনাদের বর্বরতার শিকার হচ্ছে। বেশিরভাগই জনসম্মুখে আসছে না। রাখাইন প্রদেশে এভাবে বাবা-মা হারিয়ে এতিম হয়ে পড়ছে শত শত শিশু। আবার অনেক শিশুকে আগুনে নিক্ষেপ ও জবাই করে নির্মমভাবে হত্যার অভিযোগ করছেন টেকনাফে অনুপ্রবেশকারী অনেক বাবা-মা। রাবাইল্যা এলাকা থেকে আসা তেমনই একজন মো. মনির ইত্তেফাককে জানান, তার চার সন্তানের মধ্যে  সাইফুলের বয়স ছিল আট ও সাদ্দামের বয়স ছিল পাঁচ। গত ২২ নভেম্বর সৈন্যরা বাড়িতে আক্রমণ করলে এ দুজন ছাড়া পরিবারের বাকী সদস্যরা বাড়ির অদূরে পালিয়ে যায়। ভেবেছিলেন বয়সে ছোট হওয়ায় সাইফুল ও সাদ্দামকে সৈন্যরা কিছু করবে না। কিন্তু পরে এসে দেখতে পান সাদ্দামকে জবাই করে রেখে গেছে আর সাইফুলকে পুড়িয়ে মেরেছে।
 
নাম-ঠিকানা প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন রোহিঙ্গা নারী জানান, তার চার সন্তানের মধ্যে দুই ছেলে ছোট। বয়স যথাক্রমে ছয় ও ৯ বছর। সৈন্যরা দুজনকেই গুলি করে মেরেছে। যাবার সময় মেয়ে দুটিকে ধরে নিয়ে গেছে। পরে একজনের লাশ পাওয়া যায়। অন্যজনের খবর এখনো জানেন না। বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গারা বলছেন, মিয়ানমারের সৈন্যরা প্রাপ্তবয়স্ক নারী পুরুষকে হত্যা, কিশোরী-যুবতীদের ধর্ষণের সাথে সাথে শিশুদের সাথেও হিংস্র আচরণে মেতে উঠেছে। লেদা বস্তি ম্যানেজমেন্ট কমিটির সভাপতি দুদু মিয়া ইত্তেফাককে জানান, যারা সেখানে আশ্রয় নিতে আসছে তাদের বেশিরভাগই শিশু। এদের কারো বাবাকে, কারো মাকে, আবার কারো বাবা-মা দুজনকেই হত্যা করা হয়েছে। আবার অনেক বাবা-মা আসছেন, যাদের সন্তানদের হত্যা করা হয়েছে।
 
টেকনাফ (কক্সবাজার) সংবাদাতা জানান, গতকাল মঙ্গলবার দিবাগত রাত ও ভোরে টেকনাফ উপজেলার বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে হাজার খানেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। এদের মধ্যে তিন শতাধিক আশ্রয় নিয়েছে টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে।
 
উখিয়া (কক্সবাজার) সংবাদদাতা জানান, গত দুদিন ধরে সীমান্ত এলাকার ঢেকিবনিয়া, কুমিরখালী, শিলখালী, বলিবাজার ও নাগপুরাসহ পাঁচটি গ্রামে মগ সেনারা তাণ্ডব চালিয়ে ঘরবাড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। প্রাণ বাঁচাতে রাতের আঁধারে আসার জন্য হাজারেরও অধিক রোহিঙ্গা সীমান্তের কুমিরখালী পাহাড়ে অপেক্ষা করছে।
 

ইত্তেফাক/এএন