বিভিন্ন স্থানে হানাদার মুক্ত দিবস আজ

আজ ৪ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার মুক্ত হয় দেশের বিভিন্ন স্থান। মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী জনতা এদিন বিজয় পতাকা উড়িয়ে উল্লাস করে শত্রুমুক্ত অঞ্চলগুলোতে। ইত্তেফাকের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর।

 
লক্ষ্মীপুর মুক্ত দিবস:আজ ৪ ডিসেম্বর লক্ষ্মীপুর হানাদার মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী সেনারা ও এ দেশীয় দোসর রাজাকার, আল বদরের সহায়তায় লক্ষ্মীপুর জেলার ৫টি উপজেলায় ব্যাপক অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, ধর্ষণসহ শত শত নিরীহ জনসাধারণকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। তখন লক্ষ্মীপুরের দামাল ছেলেরা ১৭ বার সম্মুখ যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে হানাদারদের প্রতিহত করে আজকের এই দিনে লক্ষ্মীপুরকে মুক্ত করে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন।
 
লক্ষ্মীপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট ডেপুটি কমান্ডার বাবু কাজল কান্তি দাস বলেন, আজও প্রিয়জনদের হারানোর ঘটনায় শিহরে উঠেন অনেকে। তবে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাজাকারদের বিচার শুরু করে এবং শীর্ষ স্থানীয় রাজাকারদের বিচার করে ফাঁসির রায় কার্যকর করায় বাংলাদেশ কলঙ্ক মুক্ত হচ্ছে। আমরা আশা করি, স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির আগে সকল মানবতাবিরোধীদের বিচার করে ফাঁসির রায় কার্যকর করে বাংলাদেশকে একটি মানবতাবিরোধী অপরাধীমুক্ত দেশ উপহার দিবে বর্তমান সরকার। তিনি আরো বলেন, হানাদার মুক্ত দিবস উপলক্ষে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে র্যালী ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।
 
ধানুয়া কামালপুর মুক্ত দিবস :আজ শত্রুমুক্ত হয় জামালপুরের ধানুয়া কামালপুর। এসময় মুক্তিযোদ্ধা বশির ও সঞ্জু উভয়ে লাল সবুজের বিজয় পতাকা প্রথম উত্তোলন করেন। মুক্তিযোদ্ধা মিত্র বাহিনী জয়বাংলা শ্লোগান দিয়ে গোটা এলাকা প্রকম্পিত করে তোলে। ধানুয়া কামালপুর বিজয়ের পর মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়। একের পর এক জামালপুর জেলার বিভিন্ন স্থান শত্রু মুক্ত হতে থাকে।
 
জীবননগর মুক্ত দিবস :আজ জীবননগর মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে এই দিনে ভারতীয় সীমান্তবর্তী চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবননগর হানাদার মুক্ত হয়। এ দিন মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় মিত্র বাহিনীর তুমুল প্রতিরোধের মুখে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর জীবননগর ছেড়ে ঝিনাইদহ অভিমুখে পালিয়ে যায়।
 
দেবিদ্বার মুক্ত দিবস : আজ দেবিদ্বার হানাদার মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এদিনে মুক্তি ও মিত্র বাহিনীর যৌথ আক্রমণে দেবিদ্বার হানাদার মুক্ত হয়। দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন উপলক্ষে দেবিদ্বার উপজেলা প্রশাসন, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, দেবিদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাবের যৌথ উদ্যোগে নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। সকাল ১০টায় মুক্তিযুদ্ধ চত্বর ও গণকবরে শহীদদের সম্মানার্থে পুষ্পমাল্য অর্পণ করার কথা রয়েছে।
 
ঝিনাইগাতী মুক্ত দিবস : আজ ঝিনাইগাতী উপজেলা মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে মিত্র বাহিনীর সহযোগীতায় মুক্তিযোদ্ধারা এ উপজেলাকে শত্রুমুক্ত করে। ৩ ডিসেম্বর রাত আনুমানিক দেড়টায় শালচূড়া ক্যাম্পের পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কামালপুর দুর্গের পতনের সংবাদ পেয়ে পিছু হটতে শুরু করে। তারা আহম্মদনগর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হেড কোয়ার্টারে অবস্থানরত সৈনিকদের সঙ্গে নিয়ে রাতেই মোল্লাপাড়া ক্যাম্প গুটিয়ে শেরপুরে আশ্রয় নেয়। এভাবে রাতের আঁধারে বীর মুক্তিযোদ্ধারা এ উপজেলা শত্রুমুক্ত করে। ৪ ডিসেম্বর বীর মুক্তিযোদ্ধারা এ উপজেলায় স্বাধীন বাংলার লাল সবুজের পতাকা উড়ায়। দিবসটি পালন উপলক্ষে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
 
খোকসা মুক্ত দিবস : আজ খোকসা হানাদার মুক্ত দিবস। দিবসটি পালনে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের উদ্যোগে র্যালী, আলোচনা সভা ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। ৪ ডিসেম্বর খোকসা থানায় বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন খোকসা জানিপুর পাইলট হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক আলতাফ হোসেন। এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আলাউদ্দিন খান মোদ্দাচ্ছের আলী, আলহাজ্ব সদর উদ্দিন খান, গোলাম ছরোয়ার পাতা, আলহাজ্ব সাইদুর রহমান মন্টুসহ মুক্তিযোদ্ধারা।
 
সাঘাটা-ফুলছড়ি মুক্ত দিবস :আজ যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হবে সাঘাটার মুক্তিনগরে সাঘাটা-ফুলছড়ি হানাদার মুক্ত দিবস। চূড়ান্ত বিজয়ের ১২ দিন আগে ৪ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের দামাল ছেলেরা হানাদারমুক্ত করেন গাইবান্ধার সাঘাটা-ফুলছড়ি থানা। ১১নং সেক্টরের সহকারী কোম্পানি কমান্ডার (টু আই সি) গৌতম চন্দ্র মোদকের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধে প্লাটুন ও সেকশন কমান্ডার-সামছুল আলম, এনামুল হক, মহসীন আলী, নাজিম উদ্দিন, তছলিম হাবিলদার, আব্দুল জলিল তোতা, আবু বকর সিদ্দিক ও হামিদুল কাদেরী ৩ ডিসেম্বর ভোর রাতে ফুলছড়ি থানা আক্রমণ করেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পাকিস্তানি সেনারা ক্যাম্প ছেড়ে গোবিন্দী ওয়াপদা বাঁধের আড়ালে অবস্থান নিলেও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে পালাতে থাকে। এ সময় মূল দল থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া পাকসেনাদের একটি দল ওয়াপদা বাঁধের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। ঘণ্টাব্যাপী এ সম্মুখযুদ্ধে ২২ পাকসেনা নিহত এবং শহীদ হন ৫ মুক্তিযোদ্ধা। এরই মধ্যে দিয়ে শক্রমুক্ত হয় সাঘাটা-ফুলছড়ি।

ইত্তেফাক/এএন