প্রতিটি মেয়ের একজন বাবা আছেন; প্রতিটি পুত্রের একজন মা আছেন; সকল স্বামীর আছেন স্ত্রী। কন্যা, মাতা এবং স্ত্রী হিসেবে আমরা বাংলাদেশের সকল পুরুষের প্রতি আহবান জানাচ্ছি তারা যেন তাদের জীবনে যে সকল কন্যা এবং নারী আছেন তাদের পাশে দাঁড়ান।
গৃহাভ্যন্তরীণ সহিংসতা প্রতিটি দেশেই একটি সমস্যা। তবে বিশ্বে যে সব দেশে এই সহিংসতার হার সবচাইতে বেশি, বাংলাদেশ তার অন্যতম। বিশ্ব জুড়ে প্রতি তিন জনে একজন নারী তার সারা জীবনে সহিংসতার শিকার হয়ে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে ৮০ শতাংশেরও বেশি নারী তাদের বিবাহিত জীবনে কমপক্ষে একবার নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকে -– হোক তা শারীরিক, যৌন, মানসিক বা অর্থনৈতিক নির্যাতন অথবা অপর পক্ষের দুর্ব্যবহারের শিকার হওয়া। অর্ধেকেরও বেশি সংখ্যক বিবাহিত নারী বিগত এক বছরের মধ্যে সহিংসতার শিকার হবার কথা জানিয়েছেন। এইসব সহিংস ঘটনার যারা শিকার হয়েছেন তারা অপরিচিত কেউ নন -– তারা আপনার পরিবারেরই নারী সদস্য, আপনার সেই সহকর্মী যার সাথে বসে আপনি দুপুরের খাবার খেয়েছেন, সেই ভদ্রমহিলা যিনি আপনার ব্যাংকে আপনাকে সেবা দিয়েছেন। আর একজন বাবা হিসেবে, পুত্র, স্বামী বা ভাই হিসেবে আপনার দায়িত্ব হচ্ছে এই সহিংসতার ধ্বংসাত্মক চক্রের অবসান ঘটানো।
আমরা সবাই পরিবর্তনের দূত তবে একজন পুরুষ হিসেবে আপনাদের ভূমিকা প্রধান। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ নিজেকে সহিংসতা থেকে দূরে রাখার থেকেও বেশী কিছু করার ব্যাপার। এটি বাংলাদেশি তরুণদেরকে অনুপ্রাণিত করার জন্য পুরুষত্বের এক বিকল্প উদাহরণ বা মডেল। বিখ্যাত বাঙ্গালী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, “পুরুষেরা নির্দয়, কিন্তু মানব জাতি সদয়।” জনতার মাঝে নিজেকে তুলে ধরুন এবং নিজের মনের ভেতরকার সদয় মানুষটিকে বের করে আনুন। মানুষ হিসেবে আপনি নতুন প্রজন্মের কাছে প্রথা ও বিশ্বাস সঞ্চার করেন। আপনি যেই হন না কেন, একজন বাবা, ভাই, স্বামী, বন্ধু, শ্বশুর, চাচা-মামা, শিক্ষক, নিয়োগদাতা, বা ধর্মীয় নেতা হিসেবে আপনি একজন পথ প্রদর্শক। আপনারা বাংলাদেশের ছেলেদের পুরুষ হিসেবে বেড়ে উঠতে শেখাতে পারেন, যারা নারী ও মেয়েদের প্রতি সহিংসতাকে নিন্দা জানাবে, এবং সম্মান প্রদর্শন ও সুস্থ সম্পর্ক গড়ার প্রসারে এগিয়ে আসবে।
ঠিক করুন আপনি নারীর প্রতি সহিংসতাকে প্রশ্রয় দিবেন না। কর্মক্ষেত্রে কোন পুরুষ সহকর্মী তার স্ত্রীকে অপমানের ঘটনা নিয়ে মজা করলে তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। আপনার সন্তান থাকলে তাকে বলুন তার স্ত্রীকে সম্মান করতে -– এবং তাকে দেখান কীভাবে আপনি প্রতিদিন তার মাকে সম্মান করেন। আপনি যদি শিক্ষার্থী হয়ে থাকেন তবে বাস-এ আপনার মহিলা সহপাঠীর পাশে গিয়ে দাঁড়ান এবং তাকে উত্ত্যক্ত করলে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করুন। সহিংসতার সামনে নিশ্চুপ থাকার অর্থ মনুষ্যত্বের মর্যাদাকে উপেক্ষা করা এবং এমন বার্তা দেওয়া যে এটি গ্রহণীয়। এই নীরবতা ভেঙ্গে ফেলুন।
ঠিক সে কারণেই, আমরা আপনাদের অনুরোধ করছি সহিংসতায় ভুক্তভোগীদের সহায়তায় এগিয়ে আসতে এবং তাদেরকে সম্মান ও মর্যাদা দিতে যা তাদের প্রাপ্য। যার অর্থ দোষীকে জবাবদিহি করাঃ অনুগ্রহ করে নারীর প্রতি সহিংসতার ব্যাপারে এই নিস্পৃহতা কাটিয়ে উঠতে কাজ করুন যা এটিকে বাড়তে সাহায্য করে।
নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে ১৬ দিনের আন্তর্জাতিক প্রচারণার অংশ হিসেবে আমরা আপনাদের উপলক্ষে লিখছি। যদিও এই প্রচারণা উদযাপন প্রতি বছর ১৬ দিনের জন্য করা হয় ২৫শে নভেম্বর থেকে ১০ই ডিসেম্বর পর্যন্ত, তবে মেয়ে ও নারীরা বছরের প্রতিটি দিনই অপমানের সম্মুখীন হয়। আমাদের প্রত্যেকেই নারীর প্রতি সহিংসতার ভীতিকে রুখে দাঁড়াতে অর্থবহ ভূমিকা রাখতে পারে। আপনারা এই চিঠি সকালের চা-এর সাথে পড়ছেন, অথবা যানজটে বসে মোবাইল ফোনে, বা কর্মক্ষেত্রে কম্পিউটারের সামনে, চোখ তুলে দেখুন আপনার চার পাশের মেয়ে এবং নারীদের এবং জিজ্ঞেস করুন তাদের নিরাপত্তার জন্য আপনি কী করতে পারেন। আমরা আপনাদের আমন্ত্রণ জানাই আমাদের সাথে যোগ দিতে; পরিবর্তনের দূত হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে।
মার্শিয়া বার্নিকাট, বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত; জুলিয়া নিব্লেট, বাংলাদেশে অস্ট্রেলিয়ার হাই কমিশনার; সোফি অবেয়ার, বাংলাদেশে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত; ওয়ানইয়া ক্যাম্পোস দা নব্রেহা, বাংলাদেশে ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত; বেনওয়া পিয়েরে লারামে, বাংলাদেশে কানাডার হাই কমিশনার; লিওনি মারগারেথা কুলেনারে, বাংলাদেশে নেদারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত; সিডসেল ব্লেকেন, বাংলাদেশে নরওয়ের রাষ্ট্রদূত ; ইয়াসোজা গুনাসেকেরা, বাংলাদেশে শ্রীলংকার রাষ্ট্রদূত; ইয়োহান ফ্রিজেল, বাংলাদেশে সুইডেনের রাষ্ট্রদূত; এলিসন মেরী ব্লেইক, বাংলাদেশে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত; ক্রিস্টিন হান্টার, কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ ইউএন উইমেন; আর্জেন্টিনা পিন্টো মাটাভেল পিসিন, কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ, জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ); ইয়ানিনা জারুযেলস্কি, মিশন প্রধান যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা (ইউএসএআইডি); ক্রিস্টা রাডার, কান্ট্রি ডিরেক্টর বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)।
ইত্তেফাক/এসএসএ