আজ হানাদার মুক্ত হয় যেসব এলাকা

আজ ৭ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের এই দিনে দেশের বিভিন্ন এলাকা পাকিস্তানি হানাদারমুক্ত হয়। মুক্ত এলাকায় উড়ে স্বাধীন বাংলাদেশের লাল সবুজের পতাকা। এ বিষয়ে আমাদের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর।

 
 গোপালগঞ্জ: আজকের এই দিনে গোপালগঞ্জ পাক হানাদার মুক্ত হয়। দলে দলে মুক্তিযোদ্ধাসহ সর্বস্তরের মানুষ মেতে উঠে আনন্দ উল্লাসে। যা গোপালগঞ্জবাসীর কাছে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে। প্রতিবছরের ন্যায় এবারো নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালন করা হবে দিবসটি। ২৫ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত গোপালগঞ্জ ছিল মুক্তিবাহিনীর দখলে। ৩০ এপ্রিল পাকহানাদার বাহিনী শহরে ঢুকতে শুরু করে। শুরু হয় জ্বালাও-পোড়াও-ধর্ষণ আর হত্যাযজ্ঞ। ৫ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্তলগ্নে মিত্রদেশ ভারত প্রবাসী সরকারকে স্বীকৃতি দেয়ায় এখানকার পাক হানাদার বাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়ে। এ দিন সূর্য উঠার সাথে সাথে বিভিন্ন এলাকা থেকে দলে দলে বিভক্ত হয়ে মুক্তিযোদ্ধারা গোপালগঞ্জ শহরে প্রবেশ করে। চারিদিক থেকে আক্রমণ বলয় রচিত হওয়ার খবর পেয়ে পাক সেনারা গোপালগঞ্জের মিনি ক্যান্টনমেন্ট ছেড়ে পালিয়ে যায়। অবশেষে ৭ ডিসেম্বর ভোর থেকে গোপালগঞ্জের আকাশে উড়তে থাকে স্বাধীন বাংলার বিজয় পতাকা।
 
চুয়াডাঙ্গা: ১৯৭১ সালের এই দিনে মুক্তিপাগল অকুতোভয় দামাল যোদ্ধারা পাক হানাদার বাহিনীকে হটিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজধানী খ্যাত চুয়াডাঙ্গার মাটিতে স্বাধীনতার পতাকা উড়ায়। দিবসটি পালন উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠন চুয়াডাঙ্গা জেলা আওয়ামী লীগ আজ বুধবার দিনভর কর্মসূচি পালন করবে। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের আয়োজনে শহরের শহীদ হাসান মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। জাতীয় সংসদের হুইপ সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন এসব কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকবেন।
 
উল্লেখ্য, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ সকালে স্থানীয় ইপিআর উইংস ওয়্যারলেসের মাধ্যমে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ‘স্বাধীনতার ঘোষণা বার্তা’টি হাতে পান তত্কালীন আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি ডাঃ আসহাব-উল-হক জোয়ার্দ্দার এমপিএ। ঘোষণা অনুযায়ী চুয়াডাঙ্গাকে প্রথমে মুক্তিযুদ্ধের সাউথ-ওয়েস্ট কমান্ড এবং পরে প্রথম অস্থায়ী রাজধানী করে এই স্থান থেকেই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়।
 
মাগুরা: ১৯৭১ সালের এদিনে মাগুরা পাকহানাদার মুক্ত হয়। দিবসটি মাগুরাবাসীর কাছে একদিকে আনন্দের অন্যদিকে গর্বের। এই দিনে মাগুরায় উড়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের জয়বাংলা ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠে পুরো এলাকা। অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতাকামী মানুষের আত্মত্যাগের মাধ্যমে মাগুরা শক্রমুক্ত হয়। দিবসটি পালন উপলক্ষে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ জেলা ইউনিট কমান্ড ও সদর উপজেলা ইউনিট কমান্ডের যৌথ উদ্যোগে নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে বিজয় র্যালি, স্মৃতিচারণ, আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল প্রভৃতি ।
 
সাতক্ষীরা: ১৯৭১ সালের এই দিনে সাতক্ষীরার দামাল ছেলেরা থ্রি নট থ্রি আর এসএলআরের ফাঁকা গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে সাতক্ষীরা শহরে প্রবেশ করে। ওড়ানো হয় স্বাধীন বাংলার পতাকা। সন্তান হারানোর বেদনা ভুলে সেদিন মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে সাথে রাস্তায় নেমে আসে মুক্তিপাগল আপামর জনতা। ১৯৭১ সালের ২ মার্চ সাতক্ষীরা শহরে পাকিস্তান বিরোধী মিছিলে রাজাকাররা গুলি করে হত্যা করে শহীদ আব্দুর রাজ্জাককে। আর এখান থেকে শুরু হয় সাতক্ষীরার দামাল ছেলেদের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া। সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধের মধ্যে ভোমরার যুদ্ধ, টাউন শ্রীপুর যুদ্ধ, বৈকারী যুদ্ধ, খানজিয়া যুদ্ধ উল্লেখযোগ্য। এসব যুদ্ধে শহীদ হন ৩৩ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা। ৬ ডিসেম্বর রাতে মুক্তিযোদ্ধাদের হামলায় টিকতে না পেরে বাঁকাল, কদমতলা ও বেনেরপোতা ব্রিজ উড়িয়ে দিয়ে পাকবাহিনী সাতক্ষীরা থেকে পালিয়ে যায়। জয়ের উন্মাদনায় মেতে ওঠে সাতক্ষীরার দামাল ছেলেরা।
 
নোয়াখালী: ৬ ডিসেম্বর জেলার অভ্যন্তরে পাক হানাদার বাহিনী তাদের মূল ঘাঁটিগুলো থেকে পালিয়ে যায়। কিন্তু তাদের দোসর রাজাকার আলবদররা জেলা শহর মাইজদীর নাহার মঞ্জিল, মাইজদীকোর্ট রেল স্টেশন, হরিনারায়ণপুর, দত্তেরহাট রাজাকার ক্যাম্প ও পাক হানাদার বাহিনীর প্রধান ঘাঁটি পিটিআই এর হোস্টেলে থেকে যায়। ৬ ডিসেম্বর রাতে বৃহত্তর নোয়াখালীর বিএলএফ প্রধান মাহমুদুর রহমান বেলায়েতের নেতৃতে সকল বাহিনীর কয়েক শত মুক্তিযোদ্ধা জেলা শহর মাইজদীর রাজাকার আল বদরদের ক্যাম্পগুলো ঘিরে আক্রমণ চালায়। সারারাত ও পরদিন বিকাল পর্যন্ত যুদ্ধ চলে । এসময় কয়েকজন রাজাকার নিহত হয় এবং অনেকে পালিয়ে যায়। শত্রু পক্ষের গুলিতে শহীদ হন অধ্যাপক আবুল হাসেম, ছাত্র নজরুল ইসলাম স্বপন, সরকারি কর্মকর্তা আবদুল জলিল, নাজির বসু মিয়া ও অজ্ঞাত একজন আনসার সদস্য। একই সময় সুবেদার লুত্ফুর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা বেগমগঞ্জ টেকনিক্যাল হাইস্কুলসহ বিভিন্ন ক্যাম্পে শত্রুদের পরাজিত করে বিজয় পতাকা উড়িয়ে দেয়। শত্রুমুক্ত হয় নোয়াখালী। মুক্তদিবস উপলক্ষে আজ শহরের পিটিআইয়ের সামনে মুক্ত মঞ্চে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।
 
নাসিরনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া): দীর্ঘ ৯ মাসের সশস্ত্র রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৯৭১-এর এই দিনে মুক্তিপাগল জনতা ও দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধারা নাসিরনগর থেকে পাক-হানাদারদের বিতাড়িত করেন। হানাদার মুক্ত করে এই দিনে নাসিরনগরের আকাশে উড়েছিল লাল সবুজের পতাকা। নাসিরনগরের ইতিহাসে এ দিনটি বিশেষভাবে স্মরণীয়।
 
 ইসলামপুর (জামালপুর): ইসলামপুর আজ হানাদার মুক্ত দিবস। ৬ ডিসেম্বর দুপুর ১টা ৩০ মিনিট থেকে পরের দিন ভোর পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধারা সর্দারপাড়া অষ্টমী খেয়াঘাট সংলগ্ন ব্রহ্মপুত্র নদের দক্ষিণ পাড়, সিরাজাবাদ, থানার পূর্ব পার্শ্বে পাকা মোড় ও বাহাদুরপুরে চূড়ান্ত আক্রমণ পরিচালনা করে। ৭ ডিসেম্বর ইসলামপুর থানাকে হানাদার মুক্ত করে বীর মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও হাজার হাজার মুক্তিকামী ছাত্র জনতা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন দেশের বিজয় পতাকা উত্তোলন করেন। এ উপলক্ষে বর্ণাঢ্য র্যালি ও পথসভা অনুষ্ঠিত হবে।
 
নালিতাবাড়ী (শেরপুর): আজ শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলা মুক্তদিবস। ‘৭১ সালের এইদিনে বীর মুক্তিযোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে পাক হানাদার বাহিনীকে পরাস্ত করে নালিতাবাড়ী উপজেলাকে দখল মুক্ত করেন। জেলার সীমান্তবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়ি জনপদ দুইদিন দুইরাত সরাসরি যুদ্ধের পর মুক্ত হওয়ায় এই দিনটি এলাকার মানুষের স্মৃতিতে আজও ভাস্বর হয়ে আছে।
 
কেন্দুয়া (নেত্রকোনা): কেন্দুয়া ও পার্শ্ববর্তী মদন উপজেলার বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যুদ্ধে পাক বাহিনী পর্যুদস্ত হয়। এ সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে কেন্দুয়ায় অবস্থানরত পাকসেনা ও তাদের দোসররা ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় ৭ ডিসেম্বর সূর্যোদয়ের পূর্বেই পাক বাহিনী কেন্দুয়া ছেড়ে পালিয়ে যায়। হানাদাররা চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা বিজয় পতাকা উড়ান। দিবসটি উদযাপন উপলক্ষে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের উদ্যোগে বিজয় মিছিল ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।
 
পার্বতীপুর (দিনাজপুর):তিন মাস ১৭ দিন পর গতকাল মঙ্গলবার বিকালে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয়ের তালা ভেঙে ভারপ্রাপ্ত কমান্ডারকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন দিনাজপুর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার সিদ্দিক গজনবী, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তরফদার মাহমুদুর রহমান, থানার ওসি মোস্তাক আহম্মেদ, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম, আমজাদ হোসেনসহ সাধারণ মুক্তিযোদ্ধারা।
 
উল্লেখ্য, গত ১৫ আগস্ট শোক সভায় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুল হাই বঙ্গবন্ধু ও প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি অবমাননাকর বক্তব্য রাখায় ক্ষুব্ধ হয় সাধারণ মুক্তিযোদ্ধারা। তারা কমান্ডার ও ডেপুটি কমান্ডারের বিরুদ্ধে তহবিল আত্মসাত্সহ নানা অনিয়মের অভিযোগ এনে জেলা কমান্ড, কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল ও মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করে। কেন্দ্রীয় কমান্ডের নির্দেশে জেলা কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা সিদ্দিক গজনবীর নেতৃত্বে চার সদস্যের তদন্ত দল অভিযোগের সত্যতা পায়। গত ২০ নভেম্বর উপজেলা কমান্ডার ও ডেপুটি কমান্ডারকে সাময়িক অপসারণ করে সহকারী কমান্ডার (অর্থ) সেলিম উদ্দীনকে ভারপ্রাপ্ত কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তারা ভারপ্রাপ্ত কমাণ্ডারকে দায়িত্ব না দিয়ে গা ঢাকা দেয়। এতে আগামী ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিজয় দিবস পালন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। প্রশাসনের উপস্থিতিতে তালা ভেঙে ভারপ্রাপ্ত কমান্ডারকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ায় অচলাবস্থার অবসান ঘটেছে।

ইত্তেফাক/এএন