ড. আবদুল লতিফ মাসুম
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় থাইল্যান্ড একমাত্র দেশ যেটি কখনোই ঔপনিবেশিক শক্তির অধীনস্থ হয়নি। ১৯৩৯ সালে গর্বের সাথে তারা দেশটির নামকরণ করে থাইল্যান্ড বা মুক্তভূমি। এর আগে ‘শ্যাম’ নামে পরিচিত ছিল দেশটি। মধ্যপ্রাচ্যের ইরাকের মতো এ দেশের আর একটি বৈশিষ্ট্য চির অস্থিরতা। পৃথিবীর ইতিহাসে আর কোনো দেশে সম্ভবত এতবার সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়নি। এর বিপরীতে থাই জনগণের আর একটি গুণ হলো নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের প্রতি তাদের শর্তহীন আনুগত্য। এতে দোষের কিছু নেই। একটি দেশ-জাতি-রাষ্ট্র এরকম স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্র্য নিয়েই বেঁচে থাকে। কিন্তু যা তাদের জন্য সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তা হচ্ছে সামরিক বাহিনী। বিচারপতি কায়ানি একবার বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানস মিলিটারি ইজ সো মাইটি দ্যাট দে কনকয়ার্ড দেয়ার ওউন ট্যারিটরি’। থাই মিলিটারির ক্ষেত্রেও কথাটি অপ্রিয় সত্য। ওই অঞ্চলের মধ্যে থাই মিলিটারি হচ্ছে সবচেয়ে শক্তিশালী। তারাই সবচেয়ে হস্তক্ষেপপ্রবণ। সামরিক রাজনীতি সম্পর্কে বিশ্লেষকরা বলেন, যে-কোনো নির্বাচিত সরকারকে উত্খাত করা তাদের ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার যখন সুবিধা তখন নির্বাচন দেয়া তাদের খেয়াল-খুশির উপর নির্ভর করে। চলতি মাসের ২৪ তারিখে অনুষ্ঠিত নির্বাচনটিও এমন আর একটি উদাহরণ। ২০১৪ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর এটি ছিল সে দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর অনেক টালবাহানার পর এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। নির্বাচনে প্রধানত দু’টো পক্ষের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমাবদ্ধ থাকে। একটি পক্ষ সামরিক জান্তা সমর্থিত অন্য পক্ষ থাইল্যান্ডের জনপ্রিয় নেতা থাকসিন সিনাওয়াত্রা সমর্থিত গণতান্ত্রিক দল। ৯৩ ভাগ ভোট গণনার পর দেখা যায়, ১২৯টি আসনে গণতন্ত্রপন্থি সিনাওয়াত্রার দল পিউ থাই পার্টি সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে আছে। আর সামরিক জান্তা সমর্থিত দল ১১৭টি আসনে এগিয়ে। এতে দেখা যাচ্ছে কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে না। এখনও ১৫০টি আসনের ভাগ্য অনির্ধারিত রয়েছে। সরকার গঠনের জন্য থাই জাতীয় সংসদে ২৫১টি আসন প্রয়োজন। তাই যে-কোনো বড় দলকে ছোট দলের সহায়তা নিতে হবে। গণনার পর দেখা গেছে সামরিক সমর্থিত দল প্ল্যাংপ্রচা রাত পার্টি পপুলার ভোটের ৭৬ লাখ পেয়েছে। অপরদিকে পিউ থাই পার্টি পেয়েছে ৭৫ লাখ ভোট। নির্বাচন কমিশন ও বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে স্থানীয় মিডিয়া বিভিন্ন আসনের ফলাফল ঘোষণা করেছে। ফলাফলে দেখা যাচ্ছে ‘কেহ নাহি হারে সমানে সমান’। নির্বাচন কমিশন সচিবও এরকম পরিসংখ্যন দিচ্ছেন। কিন্তু আসল ঘটনা অন্যরকম। সেনাসমর্থিত সরকার ভোট জালিয়াতি ও নির্বাচন কমিশনকে প্রভাবিত করে ওই সমতার খবর প্রচার করছে। তথ্যাভিজ্ঞ মহল জানাচ্ছেন, তৃণমূল পর্যায়ে সেনাসমর্থিত দলের কোনো ভিত্তি নেই। নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশে বিলম্ব করছে। এতে সন্দেহ আরো ঘনীভূত হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী এই নির্বাচনে সামরিক জান্তার প্রধান প্রতিপক্ষ, থাকসিন সিনাওয়াত্রা অভিযোগ করেছেন, সামরিক সরকার নির্বাচনী ফলাফল জালিয়াতি করছে। সরকার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আগামী ৯ মে’র আগে পূর্ণাঙ্গ ফলাফল পাওয়া যাবে না। এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক ভোটের হার ৬৪ ভাগ। নির্বাচন কমিশনে বিরোধী প্রার্থীরা ইতোমধ্যে অন্যায়, অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ দায়ের করতে শুরু করেছেন। সামগ্রিক ফলাফল নিয়ে জনমনে অসন্তোষ বিরাজ করছে। নির্বাচনের ফলাফল অগ্রাহ্য করে আন্দোলনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, যেভাবেই হোক সামরিক বাহিনী কথিত নির্বাচনী ফলাফলে তাদের সমর্থিত দলের প্রায় সমতা অর্জিত হওয়ায় ছোট ছোট দলগুলোকে করায়ত্ত করে সরকার গঠনের পথে অগ্রসর হতে পারে। উল্লেখ্য যে, থাই সংবিধান অনুযায়ী জনগণ ভোট দিয়ে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের ৫০০ সদস্য নির্বাচিত করেন। ব্যতিক্রমধর্মী তথ্য হলো, উচ্চকক্ষ ‘সিনেটে’ সেনাবাহিনীর জন্য ২৫০টি আসন সংরক্ষিত রয়েছে। দুইকক্ষ একত্রে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করে থাকে। সিনেটে সেনাবাহিনীর প্রতিনিধিত্ব প্রমাণ করে যে, তারা ক্ষমতার উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। তারা পাকিস্তানের জুলফিকার আলী ভুট্টোর মতো যুক্তি প্রদান করছে যে, আসন সংখ্যা কম পেলেও তাদের ভোটের সংখ্যা বেশি। থাকসিন তাদের ওই যুক্তি অগ্রাহ্য করে অভিযোগ করেন যে, সামরিক জান্তা ভোট নিয়ে নোংরা কৌশল অবলম্বন করছে। হংকং-এ অবস্থানরত এই নেতা এক সাক্ষাত্কারে এ অভিযোগ করেন। এই নির্বাচনকে থাকসিন বনাম সেনাবাহিনীর মধ্যে ‘ভোট যুদ্ধ’ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। একই সাথে নির্বাচনকে সেনাবাহিনী তাদের নতুন প্রণীত সংবিধানের পক্ষে জনমত যাচাই-এর বিষয় মনে করছে। ২০১৬ সালে জান্তা এই সংবিধানের মাধ্যমে সামরিক থেকে বেসামরিক সরকারে উত্তরণের কর্মসূচি প্রকাশ করে। থাই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা দীর্ঘ দিন ধরে ক্ষুব্ধ জনগণের পক্ষ থেকে এই নির্বাচনে নেতিবাচক ফলাফলের আশঙ্কা করছিলেন; কিন্তু নির্বাচনে দেখা যাচ্ছে ২০১৪ সালের অভ্যুত্থানের নেতা প্রায়াউত্ চানও চা জনপ্রিয় ভোটে এগিয়ে আছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী পদের প্রতিদ্বন্দ্বী। ভোটের দ্বারা তিনি তার প্রার্থিতা বৈধ করতে চান। অপরদিকে থাকসিনের জন্য এটি একটি অস্তিত্বের লড়াই। এমনকি তার জন্য এটি শেষ সুযোগ বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকগণ মনে করেন। থাকসিন-এর দল এর আগেও আর একবার জনপ্রিয় ভোটে জয়লাভ করে।
২০১১ সালের ৩ জুলাই অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে থাকসিনের পিউথাই পার্টি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। সেবার প্রধানমন্ত্রী হন থাকসিন সিনওয়াত্রার বোন ইংলাক সিনওয়াত্রা। তিনিই থাইল্যান্ডে নির্বাচিত প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী। ২০০৬ থাকসিন সিনওয়াত্রা সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন। ২০০৮ সালে সামরিক জান্তা তাকে তথাকথিত কোর্টের রায়ে কারাগারে প্রেরণের ব্যবস্থা করে। থাকসিন সেই থেকে হংকং-এ আশ্রয় গ্রহণ করেন। সেখান থেকে তিনি থাইল্যান্ডে গণতন্ত্রের সংগ্রাম পরিচালনা করছেন। থাকসিনের বোন ইংলাক ২০১২ সালে জাতীয় পুনর্গঠন উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে তিনি সংঘাতপূর্ণ রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেন; কিন্তু সামরিক বাহিনী একে থাকসিনকে ফিরিয়ে আনার ষড়যন্ত্র বলে নাকচ করে দেয়। ২০১৩ সালে গণতান্ত্রিক আন্দোলন পরিলক্ষিত হয়। নানাভাবে নানা কৌশলে ইংলাক সরকারকে পদচ্যুত করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ওই বছরের শেষের দিকে ইংলাক সরকার প্রতিনিধি পরিষদের বিলুপ্তি ঘটান। ২০১৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়; কিন্তু সেনাবাহিনী ও বিরোধী দলগুলো প্রকারান্তরে এ নির্বাচন প্রতিহত করে। একই বছরের ৭ মে থাইল্যান্ডের সাংবিধানিক পরিষদ ইংলাক সরকারকে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে ক্ষমতার অযোগ্য ঘোষণা করে। এর ১৫ দিন পর সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল প্রায়াউত্ চানও চা সামরিক অভ্যুত্থান ঘটান। ইংলাক সরকারকে পদচ্যুত করেন। তিনি সংবিধান বাতিল করেন। মৌলিক অধিকার স্থগিত করেন। একই সাথে সেনাবাহিনী প্রধান এবং প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেই থেকে ২৪ মার্চ ২০১৯-এর নির্বাচন পর্যন্ত সেনাবাহিনী দেশের সকল কর্তৃত্ব পরিচালনা করে। সেনা অধিগ্রহণের গতানুগতিক ধারা অনুযায়ী ২০১৬ সালের ৭ আগস্ট তথাকথিত গণভোট দ্বারা তাদের প্রণীত নতুন সংবিধান অনুমোদিত হয়। ২০১৭ সালের ৬ এপ্রিল থেকে তা কার্যকর করা হয়। এই সংবিধানের অধীনেই বর্তমান নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের শুরুতে থাকসিন সম্পৃক্ত থাই রাখসা চার্ট পার্টি একটি আইনগত সমস্যার সম্মুখীন হয়। তারা রীতি ভেঙে থাই রাজার বড় বোনকে প্রধানমন্ত্রী পদে প্রার্থী ঘোষণা করে। রাজা ওই দিনই তার প্রার্থিতা বাতিল ঘোষণা করে রাজকীয় ফরমান জারি করেন। পরে এই দলের নিবন্ধনও বাতিল করা হয়। কারণ থাই ঐতিহ্য অনুযায়ী রাজ পরিবার রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকবে। এখনো থাইল্যান্ডে রাজতন্ত্র আলঙ্কারিক হলেও জনগণ সর্বময় ক্ষমতার মালিক হিসেবে তাকে মান্য করে। রাজা সাংবিধানিক সংকটে মাঝেমধ্যেই প্রকৃত রাজার মতো ক্ষমতা প্রয়োগ করেন।
থাইল্যান্ড আর সব এশীয় দেশের মতো পশ্চাত্পদ, স্বল্প শিক্ষিত এবং রক্ষণশীল হলেও ১৯৭০ সালের পর সেখানে আধুনিকায়নের ছোঁয়া পরিলক্ষিত হয়। সেখানকার জনগণ নিয়তিবাদী, নির্ভরশীল, পিতৃতান্ত্রিক, অধীনতায় অভ্যস্ত হলেও ক্রমশ বিকশিত শিক্ষা, শিল্প ও পর্যটন তাদেরকে পাশ্চাত্যমুখী তথা গণতন্ত্র অভিমুখী করে তোলে। এখন তারা অহরহই গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন সংগ্রাম করছে। অতীত ঐতিহ্য, আধুনিকায়ন ও গণতন্ত্র তাদেরকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ মূল্যবোধ দিয়েছে। তারা এখন একটি অগ্রসর দেশ হিসেবে উন্নয়নের মধ্যমাত্রায় উপনীত হয়েছে। থাইল্যান্ড কথিত হচ্ছে ‘রাইজিং টাইগার’ বা উদীয়মান বাঘ হিসেবে। এ নির্বাচনের ধোঁয়াশা অতিক্রম করে তারা একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনে সক্ষম হবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।
n লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়