সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা একটি গুরুতর জাতীয় চ্যালেঞ্জ

ড. মির্জা গোলাম সারোয়ার

প্রতিটি সড়ক দুর্ঘটনাই একটি পরিবারের জন্য সীমাহীন দুঃখ, অফুরন্ত বেদনা, একরাশ হতাশা এবং তীব্র ক্ষোভ বয়ে আনে। অনেকেই দুর্ঘটনার কারণে পঙ্গুত্ব বরণ করে কিংবা নিঃস্ব হয়ে যায়। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি বছর কত মানুষ যে হতাহত হন তার কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার গত বছরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় ২০ হাজার মানুষ প্রাণ হারান। পুলিশের দেওয়া তথ্যানুসারে গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ২ হাজার ৪শ মানুষ মারা গেছেন। এর আগের বছর মারা গিয়েছিলেন ২ হাজার ৬৭ জন। দুর্ঘটনার সংখ্যা গড়ে ২ হাজার। বুয়েটের দুর্ঘটনা ইনস্টিটিউটের ধারণা দেশে প্রতি বছর ৭-৮ হাজার মানুষ প্রাণ হারান। বেসরকারি একটি সংস্থার হিসাবে গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ২৪ জন মারা গেছেন। ২০১৪ সালের পরিসংখ্যান ছিল একই। অবশ্য পুলিশের হিসাবে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান গড়ে ৬ জন। বর্তমানে সড়ক দুর্ঘটনা একটি গুরুতর জাতীয় সমস্যা।

সংকট সমাধানে সবার আগে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা জরুরি। তাদের কাজ হবে পরিবহন নিয়ন্ত্রণ করা। পরিবহনের মান উন্নত হলে মানুষ গাড়িতে চলাচল করবে, পথচারীর সংখ্যাও কমবে। পাশাপাশি যানজটও নিয়ন্ত্রণে আসবে। আইন প্রয়োগ না হওয়া দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। ফুটপাত দখলমুক্ত হলে সড়ক দুর্ঘটনা আরও কমবে। জরিপে দেখা গেছে, চালকদের ৮১ ভাগ প্রশিক্ষণ ছাড়া, শুধু ওস্তাদের কাছ থেকে শিখেই চালক বনে যান। চালকদের ৪৮ ভাগই মাধ্যমিক শিক্ষিত। চালকদের সবাই অধিক রোজগারের জন্য অতিরিক্ত পরিশ্রম করেন। ৯ থেকে ১২ ঘণ্টা গাড়ি চালান ৪৮ ভাগ চালক। ১৯ ভাগ গাড়ি চালান ১৩ থেকে ১৬ ঘণ্টা।

সড়ক দুর্ঘটনা একেবারেই বন্ধ করা যাবে না, কিন্তু কমানো অবশ্যই সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন চালকদের দক্ষতা, আইন মেনে চলার সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা। পাশাপাশি পথচারীদের সতর্ক ও সচেতন হতে হবে। এদিকে সড়কের বাঁক সোজা করা এবং মাঝে মাঝে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা ছাড়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই। কর্তৃপক্ষ গত বছর ১৪৪টি সড়কের বাঁক সোজা করার প্রকল্প নিয়েছে। এগুলো দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল হচ্ছে দেশের সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সর্বোচ্চ ফোরাম। এতে কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি রয়েছেন। গত বছর কাউন্সিলের এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, মহাসড়কে ৮০ কি.মি. গতির বেশি কোনো যানবাহন চলবে না। কিন্তু হতাশ হয়ে দুঃখ ও ক্ষোভের সঙ্গে বলতে হয় গাড়ির চালকরা কখনই এ নিয়ম মেনে চলেন না বরং তারা কে কার আগে যেতে পারে সেজন্য দ্রুতগতিতে বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালিয়ে রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু করে— যা সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ। তাই গাড়ির গতিসীমা অবশ্যই নির্ধারণ করতে হবে।

সড়ক দুর্ঘটনার জন্য ৫০ ভাগই দায়ী চালকরা। দুর্ঘটনা মামলার ৮৩ ভাগ আসামিকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয় না। তা ছাড়া ট্রাফিক ও মোটরযান আইন সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। চালকদের বিশ্রাম ও কর্মবিরতির সুযোগ দিতে হবে। বিদ্যমান মোটরযান আইন যুগোপযোগী এবং ফিটনেস দেওয়ার পদ্ধতি ডিজিটালাইজড করতে হবে।

২৬ বছর বিভিন্ন থানায় ওসি’র দায়িত্ব পালনকালে আমি সড়ক দুর্ঘটনার অনেক মামলা রেকর্ড, তদন্ত এবং তদারকি করেছি। সড়ক দুর্ঘটনায় চালকের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিলের পরও ২/১টি ছাড়া কোনো মামলায় চালকের শাস্তি নিশ্চিত করা যায়নি। কখনো মামলা তদন্তকালীন কিংবা বিচারাধীন অবস্থায় ভিকটিম বেঁচে থাকলে তার সঙ্গে অথবা ভিকটিম মারা গেলে তার আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে বাস মালিক সমিতি বা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের লোকজন আপস করে নেয়। ফলে বাদী মামলা চালাতে অনীহা প্রকাশ করে। এরপরেও কোনো মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করা হলেও বাদী এবং সাক্ষীগণ আদালতে ঠিকমতো সাক্ষ্য প্রদান করেন না। ফলে চালকের শাস্তি হয় না। বাদী চাপে হোক বা কোনো কিছুর বিনিময়ে হোক মামলা আপস করে নেয়। কখনো-বা আপস করে মামলা চালাতে ইচ্ছুক নন বলে আদালতে এফিডেভিট দাখিল করেন।

তবে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য ঢালাওভাবে শুধু চালকদের এককভাবে দোষ দেওয়া যাবে না। কারণ অনেক সময় পথচারীদের অসতর্ক ও অসচেতনতার কারণেও দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। তাদের আইন অমান্য করার প্রবণতা বিপজ্জনক। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আইনের পাশাপাশি চালকদের লাইসেন্স দেওয়ার সময় যথাযথ এবং কঠোর পরীক্ষার মাধ্যমে লাইসেন্স প্রদান করতে হবে। এ ক্ষেত্রে চালকদের পর্যায়ক্রমে প্রশিক্ষণ এবং কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করা উচিত। সড়ক হোক নিরাপদ এ কথাটি মনে রেখে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনার ব্যাপারে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন এমনটাই সবার প্রত্যাশা। আর এই প্রত্যাশা পূরণে অবশ্যই সরকারকে মুখ্য ভূমিকা নিতে হবে।

n লেখক :সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা