নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ভোটাররাও সবদিক বিচার-বিশ্লেষণ করে বর্তমানের সঙ্গে ভবিষ্যতের হিসাব-কষা শুরু করেছেন। এই হিসাব-নিকাশের অঙ্কে ‘আঞ্চলিকতা’ এবং ‘কারা ক্ষমতায়’ এই দুটি বিষয় প্রবল প্রভাব ফেলছে। প্রার্থীদের কে বা কারা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় তা তলিয়ে দেখছেন তারা। পাশাপাশি কে নির্বাচিত হলে এলাকার উন্নয়ন সহজ হবে, সেই হিসাবও মেলানোর চেষ্টা করছেন ভোটারদের অনেকে। সঙ্গে অবশ্য জাতীয় রাজনৈতিক হিসাবও আছে।
নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা মজিবুর রহমান নির্বাচন নিয়ে ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন ‘যাকে ভোট দিলে এলাকার উন্নয়ন হবে, যার পক্ষে কাজ করা সম্ভব হবে আমরা তাকেই ভোট দেব।’ সিদ্ধিরগঞ্জের সানারপাড় এলাকার সৈয়দ আহমদের মতে, যিনি যোগ্য এবং নারায়ণগঞ্জকে নিরাপদ রাখা যার পক্ষে সম্ভব হবে-ভোটাররা তাকেই বেছে নেবেন। তবে আরো কয়েকজন ভোটারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে নিজেদের রাজনৈতিক বিশ্বাসকে প্রাধান্য দেবেন তারা।
শুধু যে ভোটাররাই বিষয়গুলো ভাবছেন তা নয়। প্রার্থীরাও ভোট টানতে এই ইস্যুগুলোকে সামনে নিয়ে আসছেন। আওয়ামী লীহসহ ১৪ দলের মেয়র প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াত্ আইভী রবিবার নাসিকের ২৬ ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে গণসংযোগকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেছেন ‘বিএনপির প্রার্থী (অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান) নারায়ণগঞ্জের মানুষ নন, তিনি মুন্সীগঞ্জ থেকে কিছু বছর আগে নারায়ণগঞ্জে এসেছেন, উনি নারায়ণঞ্জের নদ-নদী, খাল-বিল কিছুই চেনেন না। নারায়ণগঞ্জবাসীর উপর আস্থা নেই বলেই উনি বারবার সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি করছেন। এই আস্থা না থাকার কারণ উনি এখানকার স্থানীয় নন। উনি নারায়ণগঞ্জের কোন কোন জায়গায় গেছেন, এখানকার কত লোকে তাকে চেনেন। কেউ তাকে ভালোভাবে চেনেন না, এমনকি বিএনপির লোকজনও ঠিকভাবে উনাকে চেনেন কি না আমার সন্দেহ আছে।’
আইভীর এসব মন্তব্যের জবাব দিয়েছেন বিএনপিসহ ২০ দলের মেয়র প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন খান। গতকাল সোমবার সকাল থেকে শহরের বিভিন্ন স্থানে প্রচারণার সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আইভীর বক্তব্যের জবাবে সাখাওয়াত বলেন, ‘আমাদের পরিবার এ শহরে ১৫০ বছর ধরে ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। মুন্সীগঞ্জে জন্ম হলেও আমার শিক্ষাজীবন এখানে (নারায়ণগঞ্জে) কেটেছে। এই শহরে আমি ২৫ বছর ধরে আইন পেশায় নিয়োজিত। পেশাজীবনে নারায়ণগঞ্জের মানুষের সঙ্গেই ছিলাম, এখনও আছি, ভবিষ্যতেও থাকবো।’ আঞ্চলিকতা প্রশ্নে আইভীর মন্তব্যের জবাবে সাখাওয়াত বলেন ‘আইভী তো নিউজিল্যান্ডের বাসিন্দা। ওনার স্বামী এখনও নিউজিল্যান্ডের নাগরিক। উনিও নিউজিল্যান্ডের নাগরিক ছিলেন। ২০০৩ সালে নির্বাচন করার জন্য নাগরিকত্ব ছেড়ে এখানে এসেছেন।’
‘ধানের শীষ’-এর প্রার্থী সাখাওয়াতকে ‘নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় নয়’ বলে কাবু করার চেষ্টার পাশাপাশি ‘নৌকা’র প্রার্থী আইভী ভোটারদের এই বার্তাও দিচ্ছেন যে-বর্তমানে ক্ষমতায় আছে আওয়ামী লীগ, কাজেই ক্ষমতাসীন দলকে ভোট দিলে এলাকার উন্নয়ন করা সম্ভব হবে। যার কারণে ‘নির্বাচিত হতে পারলে শীতলক্ষ্যা নদীর উপর সেতু করব’-সাখাওয়াতের এই প্রতিশ্রুতির জবাবে আইভী বলেছেন ‘সাখাওয়াত হোসেন যে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন ব্রিজ করে দেবেন, তা তিনি কীভাবে করে দেবেন? উন্নয়নের এ ধারাবাহিকতা রাখতে হলে আইভীকেই প্রয়োজন আছে, এ সরকারের প্রয়োজন আছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী (শেখ হাসিনা) অবশ্যই এ সেতু করে দেবেন।’
দল (বিএনপি) ক্ষমতায় না থাকার কারণে সাখাওয়াত প্রতিশ্রুতির চেয়ে বিগতদিনে মেয়র হিসেবে আইভীর নানা ব্যর্থতার দিক ভোটারদের কাছে তুলে ধরছেন। গতকাল শহরে প্রচারকালে সাখাওয়াত বলেন, ‘উনি (আইভী) ১৩ বছর সময় পেয়েও অনেক সমস্যার সমাধান ও উন্নয়ন করতে পারেননি। আমাকে মানুষ পাঁচবছর সময় দিলে আমি সন্ত্রাস নির্মূল করবো। আইভীর পায়ের তলায় মাটি নেই, কারণ তিনি বুঝে গেছেন জনগণ তাকে আর ভোট দেবে না।’
সাখাওয়াতের এই অভিযোগের জবাবে আইভী বলেছেন, ‘এ বিষয়ে জনগণ বলবে, আমি বলবো না। উন্নয়ন কী করেছি না করেছি সেটা জনগণই ভালো বলতে পারবে।’ গ্যাস, পানির সমস্যার বিষয়ে আইভী বলেন, ‘গ্যাস ও পানি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নয়। গ্যাসের সমস্যা নারায়ণগঞ্জে আছে। ইতিমধ্যে আমি প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। তবে এখন হয়তো কিছুটা গ্যাসের চাপ কমে গেছে। তবে গ্যাসের কাজ এখানে চলছে। তাই দয়া করে এ নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াবেন না। পানির সমস্যা ঢাকা ওয়াসার কাজ, সেটা ওয়াসা দেখবে। কিন্তু এ কাজে আমাদের যতটুকু সহযোগিতা প্রয়োজন সেটা করবো।’ ভোটে সেনা মোতায়েনের জন্য সাখাওয়াতের দাবির প্রসঙ্গে আইভী বলেন, নির্বাচনের আরও ৯ দিন বাকি। দিনের পর দিন নির্বাচনচিত্র বদলাচ্ছে। যদি নির্বাচন কমিশন মনে করে তাহলে তারা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে। এ ব্যাপারে আমার কিছু বলার নেই।
প্রতিশ্রুতি, সফলতা, ব্যর্থতা-এসব নিয়ে বিতর্কের মাঝে নির্বাচনি প্রচারণায় উঠে আসছে নারায়ণগঞ্জের সন্ত্রাস ইস্যুও। আইভীর পক্ষে নারায়ণঞ্জ-৪ আসনের আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের সংবাদ সম্মেলন করা নিয়েও আপত্তি তুলেছেন সাখাওয়াত হোসেন। শামীম ওসমানের সংবাদ সম্মেলনকে ইঙ্গিত করে সাখাওয়াত বলেন, ‘আইভী কার সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন সেই বিচারটা জনগণের ওপর দিলাম। আইভীর সন্ত্রাস বিরোধী অবস্থান শুধু একটা পরিবারের বিরুদ্ধে ছিল, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তিনি কথা বলেননি। শুধুমাত্র একটি পরিবারের বিরুদ্ধে কথা বলে উনি আজ দাবি করছেন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কথা বলছেন। আর আমি ওই পরিবারের বিরুদ্ধেও কথা বলেছি, সকল অন্যায় অত্যাচার ও অপরাধের বিরুদ্ধেও কথা বলেছি। উনার (শামীমের) কার্যক্রমের বিরুদ্ধেও আমি কথা বলেছি।’ এর জবাবে আইভী বলেছেন, আমি সবসময়ই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলাম, যার কারণে এবার নির্বাচনে আমার স্লোগানও হচ্ছে- ‘নয় শঙ্কা, নয় ভয়, শহর হবে শান্তিময়’।
চরমনোই পীর নারায়ণগঞ্জে
ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের চেয়ারম্যান ও চরমোনাই পীর সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম দলের মেয়র প্রার্থী মাসুম বিল্লাহর পক্ষে প্রচারণা চালাতে গতকাল নারায়ণঞ্জে এসেছেন।
দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষ, এক প্রার্থী আহত
নাসিক নির্বাচনে এতদিন উত্সবমুখর পরিবেশ থাকলেও গতকাল শহরের ১১ নম্বর ওয়ার্ডে বরফকল এলাকায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থিত দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় এক প্রার্থী আহত হয়েছেন।
ইত্তেফাক/এএন