প্রচারযুদ্ধ শেষ, রাত পোহালেই ভোট

নীরব ভোটাররাই ফ্যাক্টর

 
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বেঁধে দেয়া সময়সীমা অনুযায়ী গতকাল মঙ্গলবার রাত ১২টায় শেষ হয় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রচারণা। প্রচারণার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ভোটারদের কাছে ছুটেছেন প্রার্থীরা। আজ রাত পেরোলে কাল বৃহস্পতিবার ভোট। ভোটের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে ইসি ও স্থানীয় প্রশাসন। নারায়ণগঞ্জে পৌঁছে গেছে ব্যালটপেপার ও ভোটবাক্সসহ যাবতীয় নির্বাচনী সরঞ্জাম। স্থানীয় ভোটাররা এখন তাদের রায় দেওয়ার অপেক্ষায়। বর্তমান ইসির অধীনে অনুষ্ঠেয় শেষ এই সিটি নির্বাচনের দিকে চোখ রাখছে সারাদেশের মানুষ।
 
নির্বাচনে মেয়র পদে ব্যালটপেপারে সাত প্রার্থীর নাম থাকলেও মূল লড়াইয়ে আওয়ামী লীগের ‘নৌকা’ প্রতীকের ডা. সেলিনা হায়াত্ আইভী ও বিএনপির ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও সংসদের বাইরে থাকা বিএনপির কাছে দলীয় প্রার্থীর জয়-পরাজয়ের চেয়েও দলীয় প্রতীকের মর্যাদার প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। বর্তমান সরকারের প্রায় তিন বছরের মাথায় হতে যাওয়া এই নির্বাচনকে সরকার তথা ‘নৌকা’র জনপ্রিয়তার এক ধরনের মাপকাঠি হিসেবেও দেখছে আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে, এ নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমান সরকারের উপর জন-অসন্তোষের পরিমাপ ও নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে নিজেদের দাবির যৌক্তিকতা যাচাইয়ের পাশাপাশি উদ্ভুত রাজনৈতিক সমীকরণে ‘ধানের শীষ’-এর অবস্থানও পরীক্ষা করতে চায় বিএনপি। যে কারণে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন হলেও গত প্রায় এক মাস ধরে দল দুটির মূল মনোযোগ এই নাসিক নির্বাচনকে ঘিরে। উভয় দলের কেন্দ্রীয় নেতারাই সাধ্যমতো প্রচারণা চালিয়েছেন দলীয় মেয়র প্রার্থীর পক্ষে। যদিও এক্ষেত্রে সংসদের বাইরে থাকার কারণে এক ধরনের বাড়তি সুবিধা পেয়েছে বিএনপি।
 
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদ বলেছেন, ‘নাসিক নির্বাচন নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই। ভোট সম্পূর্ণ অবাধ ও সুষ্ঠু হবে। কমিশন একটা মডেল নির্বাচন করতে চায়। যার কারণে নির্বাচনে কোনো ধরনের অনিয়ম-বিশৃঙ্খলা বরদাসত করা হবে না।’ নির্বাচন কমিশনার জাবেদ আলীও বলেছেন, ‘বর্তমান কমিশনের কিছু দুর্নাম আছে, এটা ঠিক। তবে যা হবার হয়ে গেছে। কিন্তু নাসিক নির্বাচনটি হবে ব্যতিক্রমধর্মী, সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ভোট হবে। সুষ্ঠু ভোটের জন্য যা যা করণীয় নির্বাচন কমিশন সবই করবে, এক্ষেত্রে কে সরকারে কে বাইরে তা দেখা হবে না।’ নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ভোট যেন প্রশ্নবিদ্ধ  না হয় সেজন্য কমিশনের পক্ষ থেকে স্থানীয় প্রশাসনসহ নির্বাচনসংশ্লিষ্টদের কড়া নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
 
সরকার-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারও নাসিক নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু দেখতে চায়। নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট হয় কিংবা ভোটগ্রহণ বিতর্কের জন্ম দেয়-এমনকিছু যেন না ঘটতে পারে, সেজন্য সরকারের পক্ষ থেকেও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। দলীয় নেতা-কর্মী-সমর্থকরাও যেন কোনো ধরনের অনিয়েমে না জড়ান সেই ধরনের সাংগঠনিক নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে। একইসঙ্গে অন্য কোনো পক্ষও যেন নির্বাচনে গোলযোগ সৃষ্টির সুযোগ না পায়, সেজন্যও নেতা-কর্মীদের সতর্ক থাকতে বলেছে ক্ষমতাসীন দলটি।
 
সরকার ও নির্বাচন কমিশনের এই ধরনের সদিচ্ছতার আলামত এখন পর্যন্ত ভোটের মাঠে বিরাজমান। পুরো নির্বাচনের পরিবেশ এক কথায় সন্তোষজনক। সাম্প্রতিক সময়ে এত ভালো পরিবেশ অন্য নির্বাচনগুলোতে দেখা যায়নি বলে মন্তব্য করেছেন খোদ নাসিক নির্বাচনে বিএনপির প্রধান সমন্বয়কারী ও দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ও, তিনি ইত্তেফাককে বলেন- এত ভালো পরিবেশ বর্তমান সরকারের গত আট বছরের চারিত্রিক বৈশিষ্ঠের সঙ্গে যায় না, এখন এটা আবার নতুন কোনো কৌশল কি-না কে জানে। মেয়র পদে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী সেলিনা হায়াত্ আইভী ও সাখাওয়াত হোসেন খানও বলেছেন, নির্বাচনের পরিবেশ এখন পর্যন্ত ভালো। ভোটাররাও বলেছেন, পরিবেশ ভালো। নির্বাচনী প্রচারণাকালে উল্লেখ করার মতো কোনো অঘটনও ঘটেনি, নির্বাচনী আচরণবিধি মানার ক্ষেত্রে প্রার্থীরাও ছিলেন যথেষ্ট সতর্ক। গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত নাসিকের ১১ নম্বর ওয়ার্ডে দু’জন কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ ছাড়া উল্লেখযোগ্য আর কোনো ঘটনা নেই এই নির্বাচনে।
 
এত ভালো পরিবেশ কিংবা উচ্ছ্বাসের মধ্যেও ভোটেরদিন বা তা আগেরদিন অর্থাত্ আজ বুধবারের পরিবেশ-পরিস্থিতি কেমন থাকে তা নিয়ে অজানা এক ধরনের শঙ্কা রয়েছে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে। খোদ দুই মেয়র প্রতিদ্বন্দ্বী আইভী ও সাখাওয়াতও এমন শঙ্কা ব্যক্ত করেছেন গতকালও। শঙ্কা থেকে সাখাওয়াত ভোটেরদিন সেনাবাহিনী মোতায়েনের জন্য গতকাল আবারও দাবি জানিয়েছেন। আর আইভী গতকাল বলেছেন- অন্য কেউ যদি বিশৃঙ্খলা না ঘটনায় তাহলে ভোট সুষ্ঠু হবে।
 
সুষ্ঠু ভোট নিয়ে এমন প্রত্যাশা-শঙ্কার মধ্যেই জয়-পরাজয় নিয়ে চলছে শেষ মুহূর্তের চুলচেরা বিশ্লেষণ। আইভীর ব্যক্তিগত পরিচিতি, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং বিলুপ্ত পৌরসভার চেয়ারম্যান ও নাসিকের প্রথম মেয়র হিসেবে টানা প্রায় ১৩ বছর দায়িত্বপালনকালে এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করার বিষয়টি ভোটের সমীকরণে তাকে এগিয়ে রেখেছে। এরসঙ্গে এবার তার সঙ্গে রয়েছে আওয়ামী লীগের ‘নৌকা’ প্রতীকের ভোট। যদিও স্থানীয় আওয়ামী লীগের বিভাজন রেখা উপরে দৃশ্যমান না হলেও ভেতরে-ভেতরে তা রয়েই গেছে। এই বিষয়টি আইভীর জন্য চিন্তার কারণ। এছাড়া সাধারণ ভোটারদের একাংশের মধ্যে ‘সরকারবিরোধী সেন্টিমেন্ট’ও আইভীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
 
অন্যদিকে, তুলনামূলকভাবে স্বল্প পরিচিতির মেয়র প্রার্থী বিএনপির সাখাওয়াত উত্তেজনাকর নির্বাচনী প্রচারণার সুযোগে এবং মিডিয়ার সুবাদে পরিচিতি সংকট অনেকটাই কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছেন। যারা তাকে চিনতেন না, এখন তারাও তাকে চিনেছেন, জেনেছেন। ব্যক্তি সাখাওয়াতের তেমন ভোটব্যাংক না থাকলেও ‘ধানের শীষ’ প্রতীকই তার মূল ভরসা। এরসঙ্গে তার জন্য বাড়তি সুযোগ হিসেবে কাজ করবে ‘সরকারবিরোধী সেন্টিমেন্ট’। এছাড়া প্রথমদিকে স্থানীয় বিএনপির যে দ্বন্দ্ব-অনৈক্য ছিল, সময়ের ব্যবধানে তাও অনেকটা কেটে গেছে। বিএনপির গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও তৈমুর আলম খন্দকার দু’জনেই ইত্তেফাককে বলেন, দিনে দিনে সেই দ্বন্দ্ব অনেকটাই নিরসন হয়েছে।
 
নাসিক নির্বাচনের সিডিউল ঘোষণা, দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন, মনোনয়ন প্রত্যাহার ও প্রতীক বরাদ্দের পর আনুষ্ঠানিক প্রচারণার শুরু থেকে গতকাল পর্যন্ত ইত্তেফাক নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে নাসিক নির্বাচনের আগাগোড়া হালচাল। দফায় দফায় কথা হয়েছে প্রার্থীদের সঙ্গে, কথা হয়েছে উভয় দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে। আলাপ হয়েছে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গেও। সবচেয়ে বেশি কথা হয়েছে সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে। প্রচারণার শেষদিন গতকালও স্থানীয় নানা শ্রেণী-পেশার লোকজনের সঙ্গে কথা বলেছে ইত্তেফাক। সবার সঙ্গে ১৫ থেকে ২০ দিনের এই আলাপন এবং গতকাল পর্যন্ত পরিবেশ-পরিস্থিতির আলোকে যে সারমর্ম দাঁড়িয়েছে তা হলো- আইভীর পক্ষে ভোটারদের একাংশ বেশ সরব, তারা প্রকাশ্যেই বলছেন আইভীকে ভোট দেবেন। আর বিএনপির সমর্থক ভোটাররাও সাখাওয়াতের পক্ষে সরব। তবে বেশিরভাগ ভোটার নিরব। সংখ্যার হিসাবে এই বিপুল সংখ্যক নিরব ভোটাররাই দিনের শেষে জয়-পরাজয় নির্ধারণ করবেন। সেই হিসাব বলছে- সুষ্ঠু ভোট হলে আইভীর সঙ্গে সাখাওয়াতের লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি। সেক্ষেত্রে দু’জনের যে কেউই জিততে পারেন।
 
নিরব ভোটাররাই যে জয়-পরাজয় নির্ধারণ করবেন সেই বার্তা পেয়েছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বও। নানা মাধ্যমে পাওয়া তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, ধানের শীষের প্রার্থী সাখাওয়াতের পক্ষে নিরব ভোট বিপ্লব ঘটবে। আর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গতকাল বলেছেন, নৌকার পক্ষেই নিরব বিপ্লব ঘটবে।
 
বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে দুই মেয়র প্রার্থী আইভী ও সাখাওয়াতও নিজেদের জয় দেখছেন। গতকাল শেষদিনে প্রচারকালে আইভী সাংবাদিকদের বলেছেন, নির্বাচন কমিশন যদি সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করে, তাহলে নির্বাচনে কেউ প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না। আর ভোটের দিন যদি পর্যাপ্তসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য থাকেন, তাহলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে, আর ভোট সুষ্ঠু হলে নৌকার বিজয় নিশ্চিত।
 
প্রচারণার শেষদিনে গতকাল বিএনপির সাখাওয়াত সাংবাদিকদের বলেন, আমি সুষ্ঠু ভোট চাই। তবে সুষ্ঠু ভোট নিয়ে আমি শঙ্কায় আছি। নির্বাচনের শুরু থেকেই আমি সেনা মোতায়েন চেয়েছিলাম। কিন্তু নির্বাচন কমিশন সেটা করেনি। এ কারণেই লোকজনের মধ্যেও উত্কণ্ঠা বিরাজ করছে। তিনি বলেন, মানুষ ধানের শীষকে ভোট দিতে পাগল হয়ে আছে। লোকজন ধানের শীষকেই ভোটে পাস করাবে।
 
বিশৃঙ্খলা হলে গুলি: ডিআইজি
 
নাসিক নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে বিশৃঙ্খলার চেষ্টা করা হলে গুলি চালানোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মাহফুজুল হক নুরুজ্জামান। গতকাল নারায়ণগঞ্জের মাসদাইর পুলিশ লাইন এলাকায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আইনে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা ও আত্মরক্ষায় গুলি চালানোর বিধান রয়েছে। নির্বাচনে কেউ ভোটকেন্দ্র দখল ও ব্যালটবাক্স ছিনতাই বা জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিঘ্ন করার চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গুলি ছুড়বে। যদি কোনো পুলিশ সদস্য গুলি না  ছোড়ে, তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
 
ইসির কাছে সেনা মোতায়েন দাবি বিএনপির
 
নাসিক নির্বাচনে আবারো সেনা মোতায়েনের দাবি জানিয়েছে বিএনপি। গতকাল শেরেবাংলা নগরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদের সঙ্গে সাক্ষাত শেষে সাংবাদিকদের এ দাবির কথা জানান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। এর আগে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে নজরুল ইসলাম খানের নেতৃত্বে বিএনপির দুই সদস্যের প্রতিনিধিদল নির্বাচন কমিশনে সিইসির সঙ্গে সাক্ষাত করেন। সাক্ষাত শেষে নজরুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের জানান, নারায়ণগঞ্জে এখন পর্যন্ত প্রচারণায় কোনো বাধা দেয়া হয়নি; যে কোনো সময়ই পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। আমরা এ নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের জন্য আবারও বলেছি সিইসির কাছে। কমিশন সে ব্যবস্থা করছে না। ভোটের পরিবেশ ভালো রাখতে আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্য প্রয়োজনে আরও বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন সিইসি। বিদায়ের আগে একটা ভালো নির্বাচন করার অনুরোধও সিইসির কাছে রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।