আইভী না সাখাওয়াত?

বহুল আলোচিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আজ বৃহস্পতিবার ভোটগ্রহনের দিন। ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৯৩১ ভোটার নির্ধারণ করবেন কে হবেন তাদের মেয়র, কারা হবেন তাদের কাউন্সিলর। মেয়র পদে আওয়ামী লীগ প্রার্থী সেলিনা হায়াত্ আইভী নাকি বিএনপি সাখাওয়াত হোসেন খান জয়ী হবেন—এই জিজ্ঞাসার সুরাহা হবে আজ। নিজেদের মেয়াদের সর্বশেষ এই ভোট আয়োজনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গ্রহণ করা হয়েছে সব ধরনের প্রস্তুতি।

 
নির্বাচন কমিশনার মো ঃ শাহ নেওয়াজ ইত্তেফাককে বলেন, নির্বাচনের সব প্রস্তুতি শেষ। পছন্দের প্রার্থীকে নির্বিঘ্নে ভোট দেবেন ভোটাররা। গোলযোগ সৃষ্টির চেষ্টা করলে কেউ কোন ছাড় পাবেন না।
 
আজ সকাল ৮টা থেকে ৪টা পর্যন্ত একটানা ভোটগ্রহন চলবে। নির্বাচনে মেয়র পদে সাতজন প্রতিদ্বন্দ্বী থাকলেও মূল লড়াই হবে সেলিনা হায়াত্ আইভী (নৌকা) ও মো ঃ সাখাওয়াত হোসেন খানের (ধানের শীষ) মধ্যে।
 
স্থানীয়রা বলছেন, নারী ভোটার, নতুন ভোটার ও সংখ্যালঘু ভোটারদের উপর জয় পরাজয় নির্ভর করবে। এদের ভোটেই নিধারিত হবে নগরভবনে কে বসবেন।
 
্এখন পর্যন্ত নির্বাচনী পরিবেশ সুষ্ঠু থাকলেও ১৭৪টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১৪৫টিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে বন্দর থানার ৪৮টি কেন্দ্রের সবক’টিকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছে পুলিশ।
 
নির্বাচন প্রসঙ্গে সেলিনা হায়াত্ আইভী বলেন, ‘আমি সুষ্ঠু নির্বাচন চাই।’ বিএনপি প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, ‘অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে।’ কঠোর নিরাপত্তা সর্বত্রই
 
নির্বাচন নির্বিঘ্ন ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে ২২ প্লাটুন বিজিবি, র্যাবের ৮১টি টিম, ৭২টি মোবাইল টিমসহ ৯ হাজার পুলিশ, আনসার, কোস্ট গার্ড ও শিল্প পুলিশ স্ব স্ব কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। দুস্কৃতকারীদের দ্রুত সনাক্ত করতে র্যাবের ডগ স্কোয়াড ও বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল মাঠে নেমেছে। শহরের চাষাড়া এলাকায় বিশেষ মহড়া দেন র্যাবের ডগ স্কোয়াড সদস্যরা। র্যাব-১১’র উপ অধিনায়ক নরেশ চাকমা জানান, র্যাব স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে মাঠে কাজ করছে।
 
রিটার্নিং অফিসার নরুজ্জামান তালুকদার জানান, প্রিজাইডিং অফিসারদের প্রশিক্ষণসহ আইন-শৃংখলা বাহিনী মাঠে নেমেছে। বহিরাগতদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদসহ তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
 
নির্বাচনে ৩৬ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ১৪ জন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন। সাধারণ প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে অস্ত্রসহ ৭ জন পুলিশ, ব্যাটালিয়ান আনসার ১ জন এবং ১৪ জন আনসার এবং ভিডিপিসহ মোট ২২ জন দায়িত্ব পালন করবে। অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে থাকবে ২৪ জন সদস্য।
 
মানুষ যাতে নিরপেক্ষভাবে, নিঃসংকোচে উত্সবমুখর পরিবেশে ভোট দিতে পারে, সুষ্ঠু ও সুন্দর নির্বাচন হয়—সে ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক ও সচেতন করতে গতকাল বিকেলে লিফলেট বিতরণ করেন পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি এস এম মাহফুজুল হক নুরুজ্জামান।
 
ভোটকেন্দ্রে ব্যালট বাক্স
 
শহরের আদালত পাড়ায় অবস্থিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় থেকে বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে ব্যালট বাক্স। নির্বাচনে সহকারী রিটার্নিং অফিসার ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা তারিফুজ্জামান জানান, গতকাল সকাল থেকে ব্যালট ও স্বচ্ছ বাক্সসহ নির্বাচনের আনুষঙ্গিক সামগ্রী কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিজাইডিং কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স, ব্যালট পেপার, প্যাড, সিল, অমোচনীয় কালিসহ অন্যান্য উপকরণ পুলিশি পাহারায় পাঠানো হয়েছে ১৭৪টি ভোটকেন্দ্রে। তিন পদের জন্য ব্যালট ছাপানো হয়েছে ১৪ লাখ ২৪ হাজার ৭৯৩টি।
 
অস্ত্র প্রদর্শন করলেই জব্দ
 
নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বৈধ ও অবৈধ কোনো অস্ত্রই জমা নেওয়া হয়নি। তবে অস্ত্র প্রদর্শন না করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রিটার্নিং অফিসার নুরুজ্জামান তালুকদার বলেন, বৈধ অস্ত্র জমা নেওয়া হয়নি; তবে নির্বাচনকালীন বৈধ অস্ত্র প্রদর্শন করা যাবে না। অস্ত্র প্রদর্শন করলেই তা জব্দ করা হবে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চলছে। এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।
 
নির্বাচন অনুষ্ঠানে ব্যয় ৬ কোটি
 
এই নির্বাচন আয়োজনে নির্বাচন কমিশনের প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। ব্যয়ের অধিকাংশ যাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেছনে।
 
দুই বিদেশিসহ পর্যবেক্ষক ৩২০ জন
 
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন পর্যবেক্ষণে যাচ্ছে ৯টি স্থানীয় সংস্থার ৩১৮ জন ও একটি বিদেশি সংস্থার দুই জন পর্যবেক্ষক। এছাড়াও একহাজার ১২২ জন সাংবাদিক নির্বাচনের সংবাদ সংগ্রহে নারায়ণগঞ্জ অবস্থান করবেন বলে জানিয়েছে ইসির জনসংযোগ শাখা।
 
ভোটার, ভোটকেন্দ্র ও কক্ষ
 
২৭টি ওয়ার্ডে ১৭৪টি কেন্দ্র এবং এক হাজার ৩০৪টি ভোটকক্ষ স্থাপন করা হয়েছে। মোট ভোটার ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৯৩১ জন। পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬৬২ এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৩৫ হাজার ২৬৯। ৪ হাজার কর্মকর্তা নির্বাচনী দায়িত্বে থাকবেন। ইসির ৯ জন পর্যবেক্ষক এই নির্বাচন গোপনে পর্যবেক্ষণ করবেন।
 
মোট প্রার্থী ২০১ জন
 
নির্বাচনে মেয়র, সাধারণ কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত আসন মিলে মোট ২০১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাদের মধ্যে মেয়র পদে ৭ জন, সাধারণ কাউনিন্সলর পদে ১৫৬ জন ও সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে ৩৮ জন। মেয়র পদে সেলিনা হায়াত্ আইভি ও সাখাওয়াত হোসেন খান ছাড়াও ব্যালট পেপারে নাম রয়েছে এলডিপির কামাল প্রধান (ছাতা), বিপ্লবী ওর্য়াকার্স পার্টির মাহবুবুর রহমান (কোদাল), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাছুম বিল্লাহ (হাতপাখা), ইসলামী ঐক্যজোটের এজহারুল হক (মিনার) ও কল্যান পার্টির রাশেদ ফেরদৌসের (হাতঘড়ি) নাম।
 
কারো ব্যর্থতায় নির্বাচন বিঘ্নিত হলে ব্যবস্থা :ইসি সচিব
 
নির্বাচন কমিশন সচিব মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ জানিয়েছেন, কারো ব্যর্থতার জন্যে ভোট বিঘ্নিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। গতকাল বুধবার নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে নিজ কক্ষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি।
 
উল্লেখ্য, গত ১৪ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে ইসি। গত ৪ ডিসেম্বর ছিল প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। ৫ ডিসেম্বর প্রতীক বরাদ্দের পর শুরু হয় আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচারণা। ২০১১ সালের ৩০ অক্টোবর প্রথম সিটি নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছিলেন সেলিনা হায়াত্ আইভি।

ইত্তেফাক/এএন