ফিরে দেখা

সেই রাত্রের সত্য কাহিনি

সেই রাত্রে (২৯ মার্চ ১৯৭১) ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের সঙ্গে তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র দিলীপ দত্তকেও ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সেই ঘাতকরা। তারপর পিতাপুত্রের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। ধীরেন্দ্রনাথের একজন স্থানীয় সহযোদ্ধা জানিয়েছেন, ‘দেশ শত্রুমুক্ত হবার পর, ক্যান্টনমেন্টে ধীরেনদার মৃতদেহ খুঁজে পাবার অনেক চেষ্টা আমরা করেছি। কিন্তু তা কোথাও পাওয়া যায়নি।’ স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে, ১৯৭২ সালের ২১ জানুয়ারি ‘দৈনিক বাংলা’য় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে দেশবাসী প্রথম ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নির্মম হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে জানতে পারে। ক্ষৌরকার রমণীমোহন শীল ছিলেন এ-হত্যাকাণ্ডের একজন দুর্লভ প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি সেই সময়ে ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টে কর্মরত ছিলেন। তাঁর উদ্ধৃতি দিয়ে প্রকাশিত দৈনিক বাংলার সেই প্রতিবেদনে হত্যাকাণ্ডের বেশকিছু তথ্য পাওয়া যায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে খবরটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল কুমিল্লা থেকে প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক আমোদ’ পত্রিকায়। বড় মর্মস্পর্শী সে-বিবরণ:

নরসুন্দর রমণীমোহন শীল অত্যাবশ্যকীয় কাজে নিযুক্ত থাকায় সম্ভবত হানাদাররা অন্যদের সঙ্গে একে বন্দি করে নিয়েও হত্যা করেননি নিজেদেরই স্বার্থে। হয়ত তারা ভেবেছিলেন পরে সুযোগ বুঝে এদের হত্যা করা যাবে। ক্ষৌরকর্মের মতো অত্যাবশ্যকীয় কাজে নিযুক্ত থাকার জন্য বর্বর পশুরা তাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল; কিন্তু সে সময় হয়ত তারা বুঝতে পারেনি, দেবপুর গ্রামের রমণী শীলেরও চোখ আছে, আছে হূদয়, আছে অনুভূতি। নরপিশাচদের এই ভুলের জন্য হয়ত রমণী শীল আজও বেঁচে আছেন বিশ্বের ইতিহাসে কলঙ্কজনক নরহত্যার একটি জীবন্ত দলিল হিসেবে। কুমিল্লার শামসুন্নাহার রাব্বী শ্রী রমণী শীলের সাক্ষাত্কার গ্রহণ করেছিলেন। আমরা তার বিবরণ পেয়েছি। রমণী শীল জানিয়েছেন কিভাবে বাংলার কৃতী সন্তান স্বনামধন্য শ্রী ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে পাষণ্ডরা অত্যাচারে জর্জরিত করে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছে। তিনি জানিয়েছেন, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে তিনি গুলী করে হত্যা করতে দেখেছেন।

সে পাপের ক্ষমা নেই

ধীরেনবাবু সম্পর্কে বলতে গিয়ে রমণী শীলের চোখের জল বাঁধন মানেনি। মাফলারে চোখ মুছে তিনি বললেন, ‘আমার সে পাপের ক্ষমা নেই। বাবু স্কুলঘরের বারান্দায় অতি কষ্টে হামাগুড়ি দিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন কোথায় প্রস্রাব করবেন। আমি আঙ্গুল দিয়ে ইশারায় তাঁকে প্রস্রাবের জায়গা দেখিয়ে দেই। তখন তিনি অতি কষ্টে আস্তে আস্তে হাতে একটি পা ধরে সিঁড়ি দিয়ে উঠানে নামেন। তখন ঐ বারান্দায় বসে আমি এক জল্লাদের দাড়ি কাটছিলাম। আমি বারবার বাবুর দিকে অসহায়ভাবে তাকাচ্ছিলাম বলে জল্লাদ উর্দুতে বলে, ‘এটা একটা দেখার জিনিস নয়—নিজের কাজ কর।’ এরপর বাবুর দিকে আর তাকাবার সাহস পাইনি। মনে মনে শুধু ভেবেছি বাবু জনগণের নেতা ছিলেন; আর আজ তাঁর কপালে এই দুর্ভোগ। তাঁর ক্ষতবিক্ষত সমস্ত দেহে তুলা লাগান, মাথায় ব্যান্ডেজ, চোখ ও হাত বাঁধা অবস্থায় উপর্যুপরি কয়েকদিনই ব্রিগেড অফিসে আনতে নিতে দেখি।

ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের হত্যার  তারিখ  সম্পর্কে  নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

লেখকের ‘ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত : জীবন ও কর্ম’ (বাংলা একাডেমি, ২০১৩) বই থেকে