গত তিন দশক ধরে চরমপন্থী অধ্যুষিত চলনবিলের সিরাজগঞ্জ, পাবনা, নাটোর ও বগুড়া জেলার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন সীমান্তবর্তী উপজেলায় চরমপন্থী কর্তৃক জনপ্রিয় নেতা, ইউপি চেয়ারম্যান হত্যা, থানা ও পুলিশের অস্ত্র লুট, পুকুর দখল ও চাঁদাবাজি এবং ধানের মৌসুমে বাড়ি বাড়ি থেকে ধান সংগ্রহসহ বিভিন্ন কারণে এ অঞ্চলের প্রায় ১০ লাখ মানুষ চরম আতঙ্কের দিনাতিপাত করছেন। দীর্ঘ সময়েও চরমপন্থীদের নির্যাতন, ভয়-ভীতি, হত্যার হুমকি থেকে রক্ষা পায়নি এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ। শতাধিক প্রাণহানী, জমি-পুকুর দখল ও আতঙ্কের সন্ধ্যার পর প্রাণভয়ে এলাকার শতাধিক গ্রামের লোকজন ঘর থেকে বের হতে ভয় পায়। মাঝে মধ্যে যৌথ বাহিনী ও পুলিশের কম্বিং অভিযান হলেও চরমপন্থী দ্বারা আতঙ্কিত এলাকাবাসী এ থেকে আজ পর্যন্ত রক্ষা পায়নি।
চলনবিলে চরমপন্থীদের অবস্থান : চলনবিলের সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ, রায়গঞ্জ, উল্লাপাড়া ও শাহজাদপুর নাটোর জেলার গুরুদাসপুর, সিংড়া, বগুড়া জেলার শেরপুর, এবং পাবনা জেলার বেড়া, সাথিয়া, সুজানগর, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর উপজেলার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ও আদিবাসী অধ্যুষিত থানা সদর থেকে ১৫-২০ কিলোমিটার দুরবর্তী ইউনিয়ন এবং জেলা শহর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ কিলোমিটার। বিশেষ করে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার তালম ও দেশীগ্রাম, মাধাইনগর ও বারুহাস। রায়গঞ্জ উপজেলার ধামাইনগর ও ধুপিল, সোনাখাড়া। বগুড়ার শেরপুর উপজেলার বিশালপুর ও ভবানীপুর, উল্লাপাড়া উপজেলা রামকৃষ্ণপুর ও লাহিড়িমোহনপুর, নাটোরের সিংড়া উপজেলার ডাহিয়া, শুকাশ ও ইটালি ইউনিয়ন এবং পাবনা জেলার চারটি উপজেলায় পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টির অভয়ারণ্য। এই সকল ইউনিয়নের গ্রামগুলো যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থানের জন্য চরমপন্থীরা গত তিন দশকে কৃষকদের কাছ থেকে চাদা আদায়, সরকারী জলাশয় ও পুকুর দখলসহ চাঁদাবাজীর জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে চরমপন্থীরা এ এলাকায় তাদের শক্ত অবস্থান গড়ে তোলে।
চরমপন্থী দ্বারা আক্রমণ : গত তিন দশকে চরমপন্থীরা ১৯৮৬ সালে গুরুদাসপুর থানা লুট, ২০০৪ সালে রাধুনীবাড়ী পুলিশ ফাঁড়ী লুট, ২০০৫ সালে বামিহাল পুলিশ ক্যাম্প লুটসহ বিভিন্ন স্থানে জনপ্রিয়ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধিদের হত্যা করে ত্রাসের সৃষ্টি করে। তাছাড়া চরমপন্থীদের ভয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাড়াশ-শেরপুরের সীমান্তবর্তী রানীরহাটে পুলিশ ক্যাম্প, সিংড়া উপজেলার বিয়াস বাজার থেকে নিরাপত্তার কারণে পুলিশ ক্যাম্প প্রত্যাহার করে নেয়।
চরমপন্থী দ্বারা হত্যা ও নির্যাতন: আশির দশক থেকে পথঘাটহীন প্রত্যন্ত চলনবিল অঞ্চলে সর্বহারাদের আস্তানা গড়ে উঠে। পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি, জনযুদ্ধ সর্বহারা পার্টি (লাল পতাকা) বিভিন্ন নামে তারা এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। ১৯৮৯ সালে তাড়াশ উপজেলার কুন্দাশন গ্রামে পুলিশ ও চরমপন্থীদের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।এ সময় এলাকার চরমপন্থী নেতা বংকেশ গ্রেফতার হয়। ১৯৯২ সালে তালম ইউনিয়নের জনপ্রিয় ইউপি চেয়ারম্যান আলী হাসানকে গুল্টা হাটে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা। একই বছর রানীরহাটে আনু ডাকাত নামে এক ব্যক্তিকে চরমপন্থীরা গুলি করে হত্যা করে। ১৯৮৮ সালে উল্লাপাড়া উপজেলার রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের জনপ্রিয় ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আব্দুল জলিলকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে এবং ২০০৬ সালে লাহিড়ী মোহনপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলামকে কুপিয়ে হত্যা করে। ১৯৯০ সালে মোস্তফা কামাল এবং ১৯৮৭ সালে আফসার আলীকে গুলি করে হত্যা করে। ২০০৫ সালে সিংড়া উপজেলার বামিহাল পুলিশ ফাঁড়ির অস্ত্র লুট ও দুই জন আনসারকে গুলি করে হত্যা করে এবং ১৯৯৭ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে চরমপন্থীরা বিয়াশ বাজারে আব্দুল ওহাব, নিত্যঞ্জয়, জুলমত আলী ও দুদু মিয়াকে গুলি করে হত্যা করে। ২০০৮ সালে পাড়িল বড়ইচড়া গ্রামে কৃষক আনিছকে চাঁদা না দেয়ার অপরাধে গুলি করে হত্যা করে। একই বছর দেশীগ্রাম ইউনিয়নে কাটাগাড়ি বাজারের ব্যবসায়ী আবুল কালাম আজাদকে গুলি করে হত্যা করে। রায়গঞ্জ উপজেলার ধুপিল ইউনিয়নের আমসারা গ্রামের নুজাব আলী আকন্দ, বরাত আলী মেম্বর, গুপিনাথপুর গ্রামে শুকুর আলী, ময়ান আলী সরকার, বোয়ালিয়া গ্রামে ডাকাত গফুর ও দুলালকে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করে। ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর তাড়াশ উপজেলার গুড়পিপুল গ্রামে চরমপন্থীদের সঙ্গে পুলিশের আবারো গুলি বিনিময় হয় এতে দুই বিভাগীয় চরমপন্থী ক্যাডার বামিহাল পুলিশ ফাঁড়ির লুণ্ঠিত অস্ত্রসহ গ্রেফতার হয়। চরমপন্থীরা চলনবিলের শতাধিক মানুষকে নির্বিচারে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার ঘটায়। তাছাড়া অনেক সময় নিজেদের প্রভাব বিস্তারের নিজ দলের মধ্যে গ্রুপিংয়ের কারণেও তারা নিজের দলের লোককে হত্যা করতে পিছুপা হয়নি।
চরমপন্থী দ্বারা চাঁদা আদায়: প্রতিবছর চরমপন্থীরা ধানের মৌসুমে ধর্ণাঢ্য কৃষকদের কাছ থেকে ধান আদায় নিজস্ব আদালত স্থাপন করে ভয়-ভীতির মাধ্যমে মোটা অংকের চাঁদা আদায় করে। তাছাড়া পুকুর দখল, মাছ ধরা ও জমির ফসল কেটে নেয়া নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা। চরমপন্থীরা সাধারণতঃ সন্ধ্যার পর এলাকার হাট বাজারে প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে ঘোরাফেরা করে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে তাদের দলীয় কর্মকান্ড পরিচালনা করে। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টি ও জনযুদ্ধ (লাল পতাকা) তাদের বিভিন্ন প্রকাশনা, লিফলেট সাটানো ও বিতরণ করে এলাকার মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে রাখে।
চলনবিলে চরমপন্থীদের সংখ্যা: পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টির সদস্য সংখ্যা নির্ণয় করা কঠিন। তাড়াশ, রায়গঞ্জ, উল্লাপাড়া, চাটমোহর, গুরুদাসপুর, সিংড়া, শেরপুর, সাথিয়া, সুজানগর, বেড়া থানায় তালিকা থাকলেও অনেকেই এ তালিকার বাহিরে রয়েছে। ২০০৭ সালে ১ ডিসেম্বর তাড়াশ উপজেলার কাটাগাড়ী বাজারে পুলিশের কাছে ১০৪ জন সর্বহারা পার্টির সদস্য আত্মসমর্প করে। এ আত্মসমর্পণকারী সর্বহারা সদস্যদের কারো কারো বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি, লুণ্ঠনসহ তিন থেকে পাঁচটি পর্যন্ত মামলা রয়েছে। তবে আলোড়ন সৃষ্টিকারী এই আত্মসমর্পণে কোন আগ্নেয়াস্ত্র পুলিশ উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়। চরমপন্থীরা প্রত্যন্ত গ্রামগুলোর বিভিন্ন বাড়িতে অবস্থান করে। তাছাড়া স্থানীয়ভাবে অভিযোগ রয়েছে এলাকার প্রভাবশালীরা নিজেদের রক্ষায় চরমপন্থীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে থাকেন।
পুলিশের কর্মকান্ড চরমপন্থীদের আনা-গোনা বৃদ্ধি পেলে এলাকার মানুষ পুলিশ প্রশাসনকে খবর দিলেও পুলিশ সঠিক সময়ে উপস্থিত হয় না। ফলে ঐ সব এলাকার জনগণের মধ্যে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ দেখা দেয়। চলনবিল অঞ্চলে সর্বহারাদের অবাধ বিচরণ রোধে মাঝে মধ্যেই পুলিশি অভিযান করা হয়ে থাকে। চরমপন্থীরা দুর্গম জনপথে অবস্থান করায় পুলিশের অভিযান চালাতে বাঁধার সৃষ্টি হয়। যে কারণে পুলিশ যথা সময়ে এ্যাকশানে যেতে পারে না। তাছাড়া পুলিশের গাড়ির অভাবে এক এলাকা আরেক এলাকায় অভিযান চালানো সম্ভব হয় না। বছরের দুই-একবার চরমপন্থীরা কোন অঘটন ঘটালে পাঁচটি থানার পুলিশের সমন্বয়ে কম্বিং অপারেশন পরিচালিত হয়। কিন্তু শক্তিশালী সোর্স, যানবহণ ও রাস্তাঘাটে বেহাল দশায় চরমপন্থীরা ওই এলাকায় নিরাপদেই অবস্থান করে। ফলে পুলিশের অভিযান থেকে নিজেদের রক্ষা করতে তারা সক্ষম হয়। বিশেষ করে চরমপন্থী সর্বহারারা যে এলাকায় অবস্থান করে সেই এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত লাজুক এবং দূরত্ব প্রত্যেক থানা সদর হতে ২০-২৫ কিলোমিটার হওয়ায় পুলিশ পৌঁছার আগেই চরমপন্থীরা নিরাপদ স্থানে চলে যায়।
চরমপন্থী এলাকার জনগণের কথা: যে সব এলাকায় চরমপন্থীরা অবস্থান করে, ঐসব এলাকার মানুষ প্রাণভয়ে পুলিশের কাছে মুখ খুলতে সাহস পায় না। এমনকি রাতের আঁধারে কোন বাড়িতে চরমপন্থীরা আশ্রয় নিলে ওই বাড়ির মালিক তাদের জামাই আদরে যতœ করে থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করে হয়। নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক জনৈক ব্যক্তি জানান চরমপন্থীরা গ্রামে প্রবেশ করলে পুরো গ্রামটাই নিশ্চুপ হয়ে যায়। প্রাণ ভয়ে কার বাড়ীতে আছে তা কেউ প্রকাশ করে না। তাছারা ১৫-২০ জনের দলে প্রত্যেকের কাছে ভারী অস্ত্র থাকায় কেউ মুখ খুলতেও সাহস পায় না। ফলে নিরবে তাদের অবস্থানকে সহ্য করতে হয়। তাড়াশ উপজেলার কাটাগাড়ী বাজারের জনৈক ব্যবসায়ী জানান চরমপন্থীরা রাতের অন্ধকারে লিফলেট সাঁটানোর সময় পুলিশকে খবর দিলেও পুলিশ যথা সময়ে না।
বর্তমান অবস্থাঃ চলনবিলের চরমপন্থী অধ্ষিত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এ অঞ্চলের মানুষ গত তিন দশক অতিবাহিত হলেও চরমপন্থী দ্বারা এখনো তারা নির্যাতিত। কোন কোন এলাকায় এখনো চরমপন্থীরা প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিয়ে বেড়ায়। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও গ্রামে গ্রামে ধান সংগ্রহ করছে। হত্যা, চাঁদাবাজী, পুকুর দখল, জমির ফসল কাটাসহ নানাবিধ প্রতিবন্ধকতার মধ্যে দিয়ে সাধারণ মানুষ দিন কাটায়।
পুলিশের কথা
দীর্ঘ সময়ে চরমপন্থীরা চলনবিল এলাকায় থেমে থেমে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করলেও ওই এলাকার মানুষ মুখ খুলতে নারাজ। প্রতিবছর ধানের মৌসুমে সর্বহারাদের চাঁদা দিয়ে নিরবে বসবাস করার মানসিকতা সর্বহারাদের কর্মকাণ্ডকে ভীতিকর সমর্থনেরই অংশ এবং প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় চরমপন্থীরা এলাকায় বসবাস করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। তাছাড়া বিভিন্ন সময়ে তাদের দলীয় মিটিং, গণআদালত ইত্যাদির খবর জনগণ কখনই পুলিশকে জানায় না। যে কারণে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো সম্ভব হয়না।
তাড়াশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনজুর রহমান বলেন, ‘আমি যোগদানের পর চরমপন্থী দারা মানুষ নির্যাতিত হচ্ছে এমন অভিযোগ আমার কাছে নেই। আমার সময়ে তাড়াশের কোথাও চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটে নাই। পুলিশের সীমিত সাধ্যের মধ্যে থেকে চরমপন্থী নিয়ন্ত্রণ কর্মকান্ড অব্যাহত রাখা হয়েছে।
ইত্তেফাক/এএসএমইউ