অবৈধ গ্যাস সংযোগ বন্ধ হচ্ছে না

গৃহস্থালীতে বৈধভাবে গ্যাস সংযোগ দেওয়া বন্ধ রয়েছে প্রায় দেড় বছর ধরে। শিল্পে নতুন গ্যাস সংযোগে কিংবা গ্যাসের চাপ বাড়িয়ে নিতে বড় ঝক্কি পোহাতে হয় ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের। অবৈধ গ্যাস সংযোগ বন্ধে অভিযানও চালাচ্ছে বিতরণ কোম্পানিগুলো। গত তিন বছরে আবাসিক, শিল্প ও বাণিজ্য খাতের অবৈধভাবে সংযোগ দেওয়া প্রায় ৮২০ কিলোমিটার পাইপলাইন উচ্ছেদ করেছে তিতাস গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানি (টিজিটিডিসিএল)। তারপরও দেওয়া হচ্ছে নতুন নতুন অবৈধ সংযোগ। বিতরণ কোম্পানির স্থানীয় কর্মকর্তা, কর্মচারী ও ঠিকাদারদের সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনীতির প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এতে জড়িত রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

 
পেট্রোবাংলা ও টিজিটিডিসিএল সূত্র জানায়, ঢাকা ও তার নিকটবর্তী ১৪টি জেলায় গ্যাস বিতরণ করে তিতাস কোম্পানি। এর আওতাধীন এলাকায় অবৈধ গ্যাস সংযোগও সবচেয়ে বেশি।
 
সরেজমিন অনুসন্ধান, গ্রাহকদের অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা সূত্রে জানা যায়, তিতাস গ্যাস ঢাকা ছাড়াও নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, নরসিংদী, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলায় গ্যাস সরবরাহ করছে। দেশের ৩০ লাখ গ্যাস গ্রাহকের প্রায় ২০ লাখই এ কোম্পানির সেবা নেয়। এর মধ্যে আবাসিক গ্রাহক প্রায় ১৯ লাখ। প্রায় সাড়ে ১১ হাজার বাণিজ্যিক এবং ৫ হাজার শিল্প গ্রাহক রয়েছে। ১৩ হাজার কিলোমিটার বিতরণ পাইপলাইনের মাধ্যমে এসব গ্রাহককে সেবা দেওয়া হচ্ছে। এর বাইরে আরো প্রায় চার হাজার কিলোমিটার অবৈধ লাইন স্থাপন করেছে দুর্বৃত্তরা। আবাসিক, শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে বিপুলসংখ্যক অবৈধ গ্যাস সংযোগ রয়েছে।
 
টিজিটিডিসিএল’র ২০১৪ সালের এক হিসাবমতে তখন কোম্পানির আওতাভুক্ত এলাকায় এক লাখ ৬৫ হাজার অবৈধ গ্রাহক ছিল। এর মধ্যে অনেকেই গ্যাস সংযোগ বৈধ করেছেন, আবার অনেকেই করেননি। তিতাস গ্যাসের একজন মহাব্যবস্থাপক জানান, বর্তমানেও শিল্প, বাণিজ্যিক ও আবাসিক গ্রাহক মিলে চার লাখের বেশি অবৈধ গ্রাহক রয়েছে। চিহ্নিত ও অচিহ্নিত মিলে চার হাজার কিলোমিটারের বিতরণ ও সার্ভিস পাইপলাইন রয়েছে। টিজিটিডিসিএল’র আওতাভুক্ত ঢাকাসহ অন্যান্য জেলাগুলোতে এ অবৈধ পাইপলাইন উচ্ছেদ ও সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি জেলাতেই প্রশাসকের সভাপতিত্বে একটি কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই কমিটির অভিযানে একদিকে অবৈধ সংযোগ অপসারিত হচ্ছে অন্যদিকে স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় নতুন নতুন অবৈধ সংযোগ দেওয়া হচ্ছে। অবৈধ গ্যাস সংযোগের জন্য প্রকাশ্যে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির সময়ও কেউ কিছু বলে না। বরং                                                                 স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনীতির সাথে জড়িত কিছুসংখ্যক প্রভাবশালী ব্যক্তি এ অবৈধ সংযোগের পেছনে সহযোগিতা করেন বলে তিতাস গ্যাসেরই এক তদন্ত প্রতিবেদনে সম্প্রতি উঠে এসেছে।
 
তিতাস গ্যাস কোম্পানির এক প্রকৌশলী জানান, গাজীপুরের টঙ্গী, সাভার, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ, ফতুল্লা, মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া, ঢাকার আশুলিয়া, তেজগাঁও, মিরপুর এলাকায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ কিংবা বরাদ্দকৃত চাপের চেয়ে বেশি চাপের গ্যাস ব্যবহারের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। অবৈধ আবাসিক সংযোগের সংখ্যা বেশি হলেও অবৈধভাবে বেশি পরিমাণ গ্যাস ব্যবহার করছে শিল্প খাত।
 
গত ৩ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ভাই ভাই হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট, হূদয় হোটেল এবং ২টি খাবার হোটেল, ৮ নভেম্বর সোনারগাঁও এলাকায় শাপলা হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। ৮ নভেম্বর সোনারগাঁও হাসপাতালের পিছনে ৩ ইঞ্চি ব্যাসের ৩২ হাজার ৮১০ ফুট, ৯ ও ১১ নভেম্বর গাজীপুরের শ্রীপুর এলাকায় ১ ও ২ ইঞ্চি ব্যাসের ৩৭ হাজার ৭৪৭ ফুট অবৈধ পাইপলাইন উচ্ছেদ করা হয়। নভেম্বরে নরসিংদীর বিভিন্ন এলাকায় ২ লাখ ৩২ হাজার ৯৫৪ ফুট; গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় ৪১ হাজার ১৬৫ ফুট,  ৯ ও ১৪ নভেম্বর জিনজিরা এলাকায় ৩,৬৫০ ফুট, ১৪ ও ২৯ নভেম্বর সাভারের বিভিন্ন এলাকায় ৫৭ হাজার ৪১৮ ফুট অবৈধ পাইপলাইন উচ্ছেদ করা হয়। শুধু নভেম্বরেই ১ লাখ ২৯ হাজার ৫২৭টি চুলার অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। সবমিলিয়ে গত ২০১৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি হতে গত ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত মোট ৩৬৪টি অভিযানের মাধ্যমে প্রায় ৮২০ কিলোমিটার অবৈধ গ্যাস পাইপলাইনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও অপসারণ করা হয়।
 
এ দিকে এ অবৈধ সংযোগের কারণে দুর্ঘটনা ও গ্যাস লিকেজে হতাহতের ঘটনাও বেড়ে চলছে। চলতি বছরে প্রায় ৩০০টি গ্যাস দুর্ঘটনাজনিত অগ্নিকাণ্ড ঘটে।
 
অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিষয়ে তিতাস গ্যাস কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মসিউর রহমান বলেন, অবৈধ সংযোগ উচ্ছেদে নিয়মিত অভিযান চলছে। এরপরও বেশকিছু স্থানে নতুন অবৈধ সংযোগ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা এ অবৈধ সংযোগ বন্ধের ব্যাপারে আন্তরিক না হলে এটি শতভাগ বন্ধ করা যাবে না।

ইত্তেফাক/এএন