৪৮ বছরেও স্বীকৃতি পাননি রাণীনগরের ১০ বীরাঙ্গনা

স্বাধীনতার ৪৮ বছর পেরিয়ে গেলেও নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার মিরাট ইউনিয়নের আতাইকুলা পালপাড়া গ্রামের ১০ বীরাঙ্গনা আজও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত। তারা এখনো অবহেলিত। সরকার ঘোষিত সকল সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ১৯৭১ সালে দেশ-মাতৃকার টানে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এসব নারীরা বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও আজ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পাননি।

নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার আতাইকুলা পালপাড়া গ্রামে বসবাস করেন রেনু বালা, মায়া সূত্রধর, রাশমুনি সূত্রধর,  কালীদাসি পাল, সুষমা পাল, সন্ধ্যা রানী পাল, ক্ষান্ত বালা পাল ও গীতা রানী পাল এই ১০ জন বীরাঙ্গনা। এদের মধ্যে বাণী রানী পাল ও কান্তা রানী পাল মারা গেছেন। একাত্তরের সেই দুর্বিষহ যন্ত্রণা, সামাজিক বঞ্চনার পাশাপাশি অনেকটা দুঃখ-দুর্দশার অভাব-অনটন আর অসুস্থতার মধ্যেই চলছে তাদের জীবন সংগ্রাম। সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সরকার প্রধান শেখ হাসিনা প্রতিবছর বীরাঙ্গনা নারীকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও সেই তালিকায় নওগাঁর রাণীনগরে ১০ জন বীরাঙ্গনার নাম তালিকাভুক্ত না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা।

১৯৭১ সালের ২৫ এপ্রিল পাক-হানাদার বাহিনীর স্থানীয় দোসর রাজাকার আলবদরদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় প্রকাশ্য দিবালোকে সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত নির্যাতন চালায়। এই সময় গণহত্যা, নারী নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ, লুটপাটসহ ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে সংখ্যালঘু পরিবারের  কিশোর, যুবক, মাঝ বয়সী ও বিভিন্ন বয়সী নারীদের ধরে ওই গ্রামের সুরেস্বর পালের বাড়ির বারান্দায় একত্রিত করে “জয়বাংলা বলতে হ্যায় নৌকামে ভোট দিতে হ্যায়” এভাবে পাক-সেনারা ব্যঙ্গোক্তি করতে করতে ব্রাশফায়ার করে গবীন্দ চরণ পাল, সুরেশ্বর পাল, বিক্ষয় সূত্রধর, নিবারণ পালসহ ৫২ জন মুক্তিকামী জনতাকে নির্বিচারে হত্যা করে।

১৯৭১ সালে এই গ্রামে পাক-বাহিনীর নির্যাতনের আলাপকালে কালীদাসি পাল (৭৮) জানান, ওই দিন সকালে যখন আমাদের গ্রামে পাঞ্জাবী আসে তখন আমর স্বামীসহ বাড়ির দরজা লাগিয়ে আত্মগোপনের চেষ্টা করি। কিন্তু স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় গেটের দরজা ভেঙে আমার স্বামীকে টেনে-হিঁচড়ে পাঞ্জাবিরা রাইফেল দিয়ে মারতে মারতে যোগেন্দ্রনাথের বারান্দায় ফেলে রাখে। স্বামীর প্রাণভিক্ষা চাইতে গিয়ে আমার কথা না শুনে চোখের সামনে আমার স্বামীসহ ৫২জনকে হত্যা করে উল্টো আমার উপরও তারা নানা কায়দায় নির্যাতন চালায়। আমার এক ছেলে আছে। অভাবের সংসারে সে দিনমজুরের কাজ করে। আমিও পেটের তাগিদে কখনও ধান কুড়িয়ে, বয়লারের চাতালে কাজ করে, কিংবা অন্যের জমিতে শ্রমিকের কাজ করে দু’মুঠো ডাল-ভাত খেয়ে কোনোমতে বেঁচে আছি।

সুষমা পাল জানান, ওই দিন সকাল নয়টার দিকে পাঞ্জাবিরা আমার স্বামী বাড়িতে কাজ করা অবস্থায় সুরেশ্বর পালের বাড়িতে ধরে নিয়ে লাইন করে রাখে এদিকে পাঞ্জাবিরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগসহ নানা ধরনের নির্যাতন চালায়। আমি ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে পাশের বাড়ির এক বড় মাটির ডাবরের ভিতর আশ্রয় নেই। বাচ্চার কান্না পাঞ্জাবিরা শুনতে পেয়ে আমাকে সেখান থেকে বের হওয়ার কথা বলে। তখন আমি পালিয়ে মাঠের মধ্যে দৌড়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। রাজাকারদের সহযোগিতায় পাক-বাহিনীরা মেয়েদের সাথে অনেক খারাপ আচরণ করেছে।  

আতাইকুলা গ্রামের শহীদ পরিবারের সদস্য গৌতম পাল জানান, স্বাধীনতার প্রায় পাঁচ দশক সময় অতিবাহিত হলেও মুক্তিযুদ্ধের বীরত্ব গাঁথা এই গ্রামের শহীদ ও বীরাঙ্গনার পরিবারের সদস্যরা রাষ্ট্রীয় কোনো সুযোগ-সুবিধা পাননি। এমনকি মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় তাদের নামের স্থান হয়নি।

উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার অ্যাডভোকেট ইসমাইল হোসেন বলেন, এই গ্রামের বীরাঙ্গনা ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে আবেদন করার প্রেক্ষিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রধান করে একটি তদন্ত দল সরেজমিনে তদন্ত করেছে। আমি আশারাখি তদন্ত প্রতিবেদন কাউন্সিলে জমা হলেই তাদের নাম গেজেটভুক্ত করা হবে এবং তারা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিসহ সকল সুযোগ-সুবিধা পাবে।

নির্বাহী কর্মকর্তা আল মামুন বলেন, এই গ্রামের বীরাঙ্গনাদের দ্রুত রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিসহ যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা প্রদানের জন্য মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করবো। আমাদের তদন্ত প্রতিবেদন মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল বরাবর পাঠিয়েছি। আশারাখি সরকার বিষয়টি সুদৃষ্টি সহকারে দেখবেন।

সংসদ সদস্য মো. ইসরাফিল আলম বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ পরিবার ও বীরাঙ্গনাদের ব্যাপারে অত্যন্ত আন্তরিক। আতাইকুলা গ্রামের ১০ বীরাঙ্গনার ব্যাপারে নিয়মমাফিক যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট আবেদন করলে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যাতে তারা তালিকাভুক্ত হতে পারে সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।