বাংলাদেশের শিল্প আন্দোলনের পথিকৃত শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আজ ১০২তম জন্মবার্ষিকী। ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে তার শিল্পীমানস গড়ে ওঠে। তিনি বাঙালি মুসলমানের শিল্পকলার ঐতিহ্য নির্মাণ ও আধুনিক চিত্রকলার পথিকৃত্ ব্যক্তিত্ব। বাংলাদেশে চিত্রকলার আধুনিকতা ও প্রসারে, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বিদ্যমান অচলায়তন ভাঙতে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সৃষ্টিকর্ম ও তার ব্যক্তিগত কর্মতত্পরতা যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছে। তার অসাধারণ নেতৃত্বগুণে ১৯৪৮ সালে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে গড়ে তুলেছিলেন ঢাকা আর্ট কলেজ। তিনি ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ। সে সময় তার যুগান্তকারী পদক্ষেপের কারণে বাংলাদেশ আজ চিত্রকলায় এক অনন্য অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে। শিল্পাচার্যের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৭৫ সালে ঐতিহাসিক সোনারগাঁয়ে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
১৯১৪ সালে ময়মনসিংহে এই দিনে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৩৩ সালে তিনি কলকাতা সরকারি আর্ট স্কুলে ভর্তি হন। এখানেই তার ইউরোপীয় ও আধুনিক চিত্রকলার সাথে পরিচয় ঘটে। ১৯৩৮ সালে তিনি সর্বভারতীয় চিত্রপ্রদর্শনীতে স্বর্ণপদক লাভ করেন। তার চিত্রকর্মে ফুটে উঠেছে বুভুক্ষ মানুষের আর্তনাদ এবং একইসঙ্গে প্রতিবাদী ভঙ্গি মূর্ত হয়ে উঠেছে। তার ‘সংগ্রাম’ ও দুর্ভিক্ষ সিরিজের চিত্রগুলো আজো মানুষকে শক্তি দেয়। দেয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবার সাহস।
এক বিরল শিল্পপ্রতিভার অধিকারী এই মানুষটি নিজস্ব শৈল্পিক দক্ষতার গুণে ছাত্রজীবনেই সর্বভারতীয় পর্যায়ে শিল্পী হিসেবে সুনাম অর্জন করেন এবং পরবর্তী কয়েক বছরে (১৯৩৯-৪৭) মুষ্টিমেয় আধুনিক ভারতীয় শিল্পীর নামের তালিকায় স্থান করে নেন। দেশবিভাগের পর ঢাকায় এসে তিনি এ অঞ্চলে শিল্প-শিক্ষালয়ের অভাব অনুভব করেন। তিনি আগ্রহী হয়ে ওঠেন আমাদের সমাজ থেকে রুচির দুর্ভিক্ষ দূর করতে, মানুষের মধ্যে সৌন্দর্যবোধ জাগ্রত করতে। তা তাঁর একার ছবি আঁকার মাধ্যমে সম্ভব ছিল না। এ কারণেই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ব্যাপারে তিনি মনোনিবেশ করেন। আজ সারা বাংলাদেশে শিল্পচর্চার বিপুল কর্মযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করে আমরা তাঁর স্বপ্ন কীভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে তা উপলব্ধি করতে পারি। তাঁর ছাত্রদের কিংবা পরবর্তী প্রজন্মের হাতে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বগুড়া ও নারায়ণগঞ্জে গড়ে উঠেছে শিল্পশিক্ষার প্রতিষ্ঠান। ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউটেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন শিশুদের জন্য চিত্রাঙ্কনের একটি বিদ্যালয়। আজ সারাদেশের শিশুদের মধ্যে চিত্রাঙ্কনের যে-আগ্রহ ও সমারোহ আমরা লক্ষ্য করি, তার উত্সমূলে ওই খুদে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা অনস্বীকার্য। এভাবেই সমগ্র জাতির মধ্যে তিনি শিল্পশিক্ষার যে-বীজ বুনেছিলেন তা আজ মহীরুহে পরিণত হয়েছে।
জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে জয়নুল উত্সব এবং লোকজ মেলা শুরু হবে আজ বৃহস্পতিবার। এ বছর ‘জয়নুল সম্মাননা-২০১৬’ প্রদান করা হবে ভারতের প্রখ্যাত শিল্পী অধ্যাপক যোগেন চৌধুরী এবং বাংলাদেশের প্রতিথযশা শিল্পী অধ্যাপক হাশেম খানকে। অনুষ্ঠানে শিল্পী তারক গড়াইয়ের নির্মিত ভাস্কর্যের আবরণ উন্মোচন করা হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চারুকলা অনুষদে সকাল ৯টায় শিল্পাচার্যের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্য দিয়ে উত্সবের উদ্বোধন করা হবে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এবং বিশেষ অতিথি থাকবেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সহধর্মিণী জাহানারা আবেদিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আআমস আরেফিন সিদ্দিক অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন।
ইত্তেফাক/এএন