আলোচিত তনু ও মিতু হত্যার কিনারা হয়নি

বিদায়ী বছরে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ছিল দুই নারী হত্যাকাণ্ড। এদের একজন কুমিল্লার কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনু ও চট্টগ্রামে আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা আক্তার মিতু। এই দু’টি হত্যাকাণ্ডের কোনো কিনারা করতে পারেনি পুলিশ। যদিও মিতু হত্যার কিলারদের শনাক্ত করা গেছে। কিন্তু মূল পরিকল্পনাকারী রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। আর তনু হত্যাকাণ্ডের কোনো কূলকিনারাই হয়নি। আসামি গ্রেফতার তো দূরের কথা কাউকে শনাক্তই করতে পারেনি পুলিশ। এ নিয়ে দেশ জুড়ে আন্দোলন হলেও কোনো ফল হয়নি।

 
গেল বছরের ২০ মার্চ কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু খুন হন। ওইদিন রাতে কুমিল্লার ময়নামতি সেনানিবাসের ভেতরের একটি ঝোপ থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। পরদিন লাশের প্রথম ময়না তদন্ত হয়। প্রথম ময়না তদন্ত প্রতিবেদনে চিকিত্সকরা বলেছিলেন, তনুকে হত্যার আগে ধর্ষণের কোনো প্রমাণ তারা পাননি। কিন্তু ডিএনএ পরীক্ষার পর সিআইডির পক্ষ থেকে জানানো হয়, খুনিরা তনুকে ধর্ষণও করেছিল। আলোচিত এই খুনের প্রথম ময়না তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর  আদালতের নির্দেশে ৩০ মার্চ দ্বিতীয়বার ময়না তদন্ত করেন কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজের চিকিত্সকরা। এরপর ১৩ জুন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গাজী মো. ইব্রাহিম কুমিল্লার মুখ্য বিচারিক হাকিম মুস্তাইন বিল্লার আদালতে দ্বিতীয় ময়না তদন্তের প্রতিবেদন জমা দেন। দ্বিতীয় ময়না তদন্তের আড়াই মাস পর পুলিশকে প্রতিবেদন দেয় চিকিত্সক দল। ওই প্রতিবেদনে ‘সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স’ হওয়ার কথা বলা হয়। তবে তা ধর্ষণ কিনা সে বিষয়টি এড়িয়ে যান কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান কামদা প্রসাদ সাহা, যার নেতৃত্বে দ্বিতীয় ময়না তদন্ত হয়।
 
তনু খুন হওয়ার সাড়ে ৯ মাস পরও দৃশ্যত কোনো অগ্রগতি হয়নি। এরই মধ্যে তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক গাজী মোহাম্মদ ইব্রাহীম অসুস্থতার কথা বলে এ মামলার তদন্ত থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন। মামলার নতুন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর আগে গত ১১ জুলাই তদন্ত তদারক কর্মকর্তা সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মো. নাজমুল করিম খানকে রাজশাহী বদলি করা হয়। মামলার নতুন তদন্ত তদারক কর্মকর্তা সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মো. শাহরিয়ার রহমান বলেন, ‘ডিএনএ প্রোফাইল মেলানোর জন্য আলোচনা চলছে। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার জন্য কাজ চলছে।
 
তদন্তের অগ্রগতি বিষয়ে শাহরিয়ার রহমান বলেন, ‘এখনো কিছু কিছু ক্ষেত্রে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। ডিএনএ মেলানোর কাজ চলছে। মামলার বাদী তনুর বাবা কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের অফিস সহকারী ইয়ার হোসেন বলেন, ‘আমি মেয়ে হত্যার বিচার চাই। কোনো গড়িমসি দেখতে চাই না।’ তনুর মা আনোয়ারা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমি তো আমার মেয়েকে পাব না। আমি তার হত্যার সত্যিকার বিচার চাই।’
 
এদিকে গত ৫ জুন ভোরে বন্দর নগরীর ও আর নিজাম রোডে সন্তানের সামনে আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের স্ত্রী মিতুকে গুলি চালিয়ে ও কুপিয়ে হত?্যা করে যায় দুর্বৃত্তরা। ঘটনার পর বাবুল ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে গিয়ে মামলা করেন এবং দুই সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় এসে শ্বশুর বাড়িতে ওঠেন। শুরুতে এই হত্যাকাণ্ডের জন?্য জঙ্গিদের সন্দেহ করা হলেও পরে পুলিশের তদন্তের গতিপথ পাল্টায়। গত ২৪ জুন রাতে বাবুলকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে নিয়েও সন্দেহের গুঞ্জন সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে পদত্যাগ করেন বাবুল।
 
সবশেষ মেয়ে হত?্যাকাণ্ডের তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে চট্টগ্রামে গিয়ে দেখা করেছেন সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের শ্বশুর মোশাররফ হোসেন। মাহমুদা আক্তার মিতু হত?্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মো. কামরুজ্জামানের সঙ্গে প্রায় চার ঘণ্টা বৈঠক করেন তিনি। পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘মামলা সংক্রান্তে ও অগ্রগতি সম্পর্কে কথা বলতে এসেছিলাম।’ মামলার বাদী বাবুলের চট্টগ্রামে গিয়ে তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে আসার এক সপ্তাহের মধে?্য সেখানে গেলেন তার শ্বশুর। কাউকে সন্দেহ করছেন কিনা-এ প্রশ্নের জবাবে মোশারফ বলেন, ‘নাম ধরে কারও কথা বলিও নাই এবং সন্দেহও করি না। খুনের মোটিভটা কী এবং কেন খুন করল একটা মেয়ে মানুষকে, সে তো কোনো চাকরি করে না... কে এ খুনের ব্যাপারে সহায়তা করছে? সে যেই হোক উদঘাটন করার জন্য অনুরোধ করেছি।’
 
মিতু হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ ইতোমধ্যে সাতজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে। দু’জন পুলিশের সঙ্গে ‘কথিত বন্দুকযুদ্ধে’ নিহতও হয়েছেন। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে মোতালেব মিয়া ওরফে ওয়াসিম ও আনোয়ার হোসেন নামে দু’জন নিজেদের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে গত ২৬ জুন আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে কামরুল ইসলাম শিকদার ওরফে মুসার নাম বলে। রাঙ্গুনিয়া উপজেলার ছাত্রলীগ নেতা রাশেদ হত্যাসহ প্রায় ছয় মামলার আসামি মুসা ছিলেন চট্টগ্রামে বাবুল আক্তারের সোর্স। পাশাপাশি অস্ত্রের জোগানদাতা হিসেবে গ্রেপ্তার এহতাশেমুল হক ভোলাও বাবুলের সোর্স বলে পরিচিত। বাবুল আক্তারকে নিয়ে গুঞ্জনের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে তার শ্বশুর বলেন, ‘বাবুল সাহেব কেন, যেই জড়িত তাদের তথ্য উদঘাটন করতে বলেছি।’

ইত্তেফাক/এএন।